টুকুন বলল, ইন্দ্র, আজও সুবল এল না।
—আসবে।
—তুমি ওকে আমার ঠিকানাটা দিয়ে আসবে?
—ও কোথায় থাকে?
—তা জানি না। সে একটা দেবদারু গাছের নীচে শুয়ে থাকে জানি।
ইন্দ্র জানে টুকুনের এমনই কথা বলার ধরন। টুকুনকে আজ শাড়ি পরিয়েছে গীতামাসি। টুকুনকে খুব স্নিগ্ধ দেখাচ্ছিল। কিন্তু টুকুনের ভিতর কোনও লজ্জা নেই। সে তার শাড়ির আঁচল বুক থেকে ফেলে দিয়েছে। ইন্দ্র যে পুরুষ সেটা মনেই হয় না টুকুনের চোখ দেখে। ইন্দ্র বেশি সময় সঙ্গ দিতে পারে না। সে সুন্দর করে সেজে আসে। সে যতটা পারে সরু প্যান্ট জামা পরে এবং ওর ভিতর কিছু কৃত্রিমতা থাকে বলে টুকুনের ভারী হাসি পায়। সে কিছুতেই টুকুনকে ছুঁতে চায় না। টুকুন সে এলে ঠিক বান্ধবীর মতো জড়িয়ে ধরতে চায়—আর ইন্দ্র তখন কেমন করে, টুকুন তো এখনও ভালো করে হাঁটতে পারে না। তখন সব কিছু তার কাছে অর্থহীন হয়ে যায়। সে আর নড়তে পারে না খাট থেকে।
টুকুন ডাকল, ইন্দ্র কাছে এসো।
ইন্দ্র কাছে গেলে বলল, তুমি আমার হাত ধরো।
ইন্দ্র হাত ধরতে সঙ্কোচ করলে বলল, তুমি ইন্দ্র এমন কেন, সুবলকে যদি দেখতে, সে আমার জন্য সব করতে পারে। আমি ভালো হলে সুবলকে ঠিক নিয়ে আসব।
ইন্দ্র বলল, মাসিমা বলেছে আমরা আজ ‘চাঁদমামার সংসার’ দেখতে যাব।
—কোথায়?
—ছোটদের নাট্য—সংসদে।
—আমি যাব না।
—তুমি গেলে খুব আনন্দ পাবে টুকুন।
—আমার ভালো লাগে না।
মা এসে বললেন, খুব ভালো লাগবে। ইন্দ্র আর তুমি যাবে।
—আমার ভালো লাগে না মা। আমাকে কেউ ধরে নিয়ে যাবে, আমার এটা ভালো লাগে না।
—ডাক্তার বলেছে, তুমি ভালো হয়ে গেছ। এখন শুধু তোমাকে নিয়ে ইন্দ্র ঘুরে বেড়াবে।
ইন্দ্র বলল, আমি দেখেছি। খুব ভালো।
টুকুন বলল, ওসব বাচ্চাদের বই।
—না, সবাই দেখতে পারে। সবারই ভালো লাগবে।
—আমার এখন রোদ ভালো লাগে। বৃষ্টি অথবা ঝড়। আমার কখনও সূর্য ওঠা দেখতে ভালো লাগে। পাখিরা তখন আশ্চর্যভাবে উড়ে বেড়ায়। আমার কেন জানি মনে হয় সুবল তার দেশে চলে গেছে। সে রোদে বৃষ্টিতে অথবা ঝড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। কী সুন্দর যে তাকে লাগছে দেখতে! চোখ বুঝলে আমি সব টের পাই।
তবু ইন্দ্র বারবার চেষ্টা করল। এখন ইন্দ্রের কলেজ বন্ধ। সে এখানেই থাকবে। ইন্দ্রের জন্য নীচে একটা বড় ঘর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ইন্দ্রর সকালে একবার বিকেলে একবার আসার কথা। সবই ডাক্তারের পরামর্শ মতো হচ্ছে। যখন পাখিয়ালা সুবলকে মিসেস মজুমদার মাঝে মাঝে আসতে দিতে একেবারেই রাজি হলেন না, তখন আর কী করা। তবু তাঁর ধারণা, জীবনের ভিতরে এই বয়সে যে উদ্দামতা দেখা যায়, ইন্দ্রের শরীর থেকে মেয়েটা তার গন্ধ পেলে হয়তো বাছবিচার না করা এক আশ্চর্য গন্ধে এই পৃথিবীর কোনও এক সকালে সে বড় হয়ে যাবে। এবং পৃথিবীময় তখন সে মনোরম সংগীত শুনতে পাবে—যা সে কোনওদিন টের পায়নি, এত ভালো, এভাবে পৃথিবী ক্রমে তার কাছে আরও বড় হয়ে যাবে। সে তখন ছুঁতে পাবে চারপাশটা।
ইন্দ্র বলল, তুমি না গেলে আমি যাচ্ছি না।
টুকুন বলল, আমাকে শাড়ি পড়লে বড় দেখায়?
—খুব বড়।
—মা—র মতো লাগে?
—মাসিমার মতো লাগবে কেন?
—বা রে, শাড়ি পরলে মাসিমার মতো না লাগলে তবে শাড়ি পরা কেন?
—তোমাকে টুকুনই লাগছে। যুবতী টুকুন।
—বাঃ, আমি যুবতী হব কী করে, বলেই সে কেমন হতাশ মুখে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকল। ভীষণ অভিমান সুবলের ওপর। কী দরকার ছিল ট্রেনে দেখা হওয়ার! কী দরকার ছিল পায়ে হেঁটে গিয়ে দরজা খুলে দেবার! আমি বেশ তো মরে যাচ্ছিলাম। মরে যেতে আমার ভীষণ ভালো লাগছিল। সবার আগে মানুষের সব দুঃখ বুঝতে না বুঝতে চলে যেতাম তবে। তুমি কেন যে আমার শরীরে আবার প্রাণের সাড়া এনে দিলে! দিলে তো একেবারে ভালো করে দিলে না কেন। কখনও কখনও এত ভালো লাগে সবকিছু—আবার কখনও কেমন হতাশা। আমার কী আছে বল? ইন্দ্র আমার কাছে আসে দায়ে পড়ে। ও তো আমাকে ভালোবাসে না। আমার কিছু নেই। আমি এখনও বাচ্চা মেয়ে হয়ে আছি। ওর কেন আকর্ষণ থাকবে বল?
এভাবে কত সব ভাবনা এসে মাঝে মাঝে টুকুনকে ভীষণ অভিমানী করে রাখে—পাখিটাকে পাঠিয়ে দিতে পারছ না? সে আমার কত খবর নিয়ে যেত। আমার কত গল্পের বই আছে। সেখানে কতরকমভাবে সব মানুষ সমস্ত সৌরজগতের খবর নিয়ে বেড়াচ্ছে, আর তুমি তোমার পাখিটাকে পাঠিয়ে আমার খবরটুকু নিতে পারছ না!
টুকুন এখন দেখল ইন্দ্র আর নেই। এতবড় একটা সম্পত্তির ওপর ইন্দ্রের লোভটা সে কী করে যে টের পায়। ইন্দ্রের বাবা খুব খুশি। আগে এ বাড়িতে ওদের গলা সে কখনও শুনেছে মনে করতে পারে না এখন এ বাড়িতে ইন্দ্রকে নিয়ে আসায়—ওরা খুব আসে। বাবার মুখ দেখলে টের পায় টুকুন তিনি আর কাজে কোনও উৎসাহ পাচ্ছেন না। চারপাশ থেকে বাবাকে কারা যেন অক্টোপাশের মতো গিলে খাচ্ছে। কখনও কখনও এমন হয়ে যায় যে টুকুন ইন্দ্রকে একদম সহ্য করতে পারে না। কিন্তু স্বভাবে টুকুন ভারী মধুর। সে রাগ করে কেন জানি কথা বলতে পারে না। রাগ করে কথা বলতে পারলে সে কবে ইন্দ্রকে তাড়িয়ে দিত।
টুকুন বুঝতে পারে এভাবে একজন তরুণ বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারে না। সে যখন খুব বিনয় করে বলে, আমি আসি টুকুন, আবার পরে আসব—তখন টুকুনের ভারী হাসি পায়। কেন যে মিথ্যা অভিনয় করছে ইন্দ্র! ওর বলতে ইচ্ছা হয়, তোমাকে আর কখনও আসতে হবে না। তুমি আমার কাছে এসে কোনও উৎসাহ পাও না। উৎসাহ না পেলে কিছুই জমে ওঠে না। যদি সুবলকে দ্যাখো, দেখবে সে যে কোথাকার সব রাজ্যের ফুল ফল পাখির খবর নিয়ে আসছে।
