টুকুন যেন সেই ছোট্ট রাজপুত্রের সঙ্গে সুবলের একটা আশ্চর্য মিল খুঁজে পায়। এখন অপেক্ষায় আছে, তার জন্য কেউ একটা সুন্দর ছবি এঁকে দেবে। টুকুন আজকাল বরং ঘর থেকে খেলনাগুলো সরিয়ে দিতে পারলে বাঁচে। পরিবর্তে ওর ঘরে এখন আলমারি—ভর্তি বই। এবং সুন্দর সুন্দর সব ভালোবাসার কথা সেখানে লেখা আছে।
আবার টুকুন আজকাল নানারকম গ্রহ—নক্ষত্রের বই পড়তে ভালোবাসে। বিশাল সৌরমণ্ডলের কথা ভেবে সে কেমন মুহ্যমান হয়ে থাকে। সেখানে সামান্য টুকুন অথবা তার অসুখ, সে বড় হচ্ছে না, তার শরীরের সব লক্ষণগুলো কোথায় যেন আটকে আছে—এসব বড় তুচ্ছ। তখন তার কেন জানি বাবা—মা—র ওপর ভীষণ করুণা হয়। মা—বাবা কেন যে মুখ করুণ করে রাখে! মা কিছুতেই কেন যে সুবল এ—বাড়িতে আসুক চায় না! বাবার সঙ্গে ওই নিয়ে মা—র ভীষণ মন—কষাকষি! বাবা শেষ পর্যন্ত মা—র কথাতেই রাজি—তাই বলে একটা রাস্তার ছেলে কখনও টুকুনের সঙ্গী হতে পারে না। আমি বরং রণবীরকে বলব ওর ছেলে ইন্দ্রকে যেন পাঠিয়ে দেয় এখানে থাকবে। কী সুন্দর সুপুরুষ রণবীর। ওর ছেলে বাপকেও ছাড়িয়ে গেছে। এমন কথার পর বাবা আর সিস্টারকে ঠিকানা দিতে পারেননি! সুবল এলে পাঠিয়ে দিতে বলেননি।
তবু টুকুনের ধারণা, সুবল আসবে। কারণ সে কেন জানি সুবলকে এ—গ্রহের বাসিন্দা বলে ভাবতেই পরে না। সেই ছোট রাজপুত্রের মতো তার বাড়ি অন্য কোনও গ্রহে হবে। সে কোনও অলৌকিক যানে চড়ে এখানে নেমে এসেছে। সুবল নিজের সঠিক ঠিকানা জানে না। তার গ্রহটা খুব ছোট। একটা বাড়ির মতো গ্রহটা। সে সেখানে এতদিন থাকত বোধহয়।
সেই ছোট্ট রাজপুত্রের গল্পের মতো মনে হয় সত্যি এই সৌরজগতে কত তো গ্রহ আছে। সংখ্যায় তারা কত কেউ বলতে পারে না। কত সব ছোট্ট গ্রহ আছে যা দূরবিনে পর্যন্ত ধরা পড়ে না। অথবা কখনও কখনও বিন্দুর মতো ধরা পড়লে জ্যোতির্বিদরা সংখ্যা দিয়ে তার অবস্থান অথবা নাম প্রকাশ করে থাকে। বড়দের তবু নাম আছে একটা—পৃথিবী, বৃহস্পতি, মঙ্গল, শুক্র। কিন্তু ছোটদের জন্য কেউ নাম দেয় না। কোনও জ্যোতির্বিদ কোনও একটা গ্রহ আবিষ্কার করে বসলে একটা সংখ্যা দিয়ে দেন। গ্রহাণু ৩০৪০৮৩, একটা সংখ্যা দিয়ে হয়তো ঠিক নির্ণয় করা যায়। সেই রাজপুত্র তেমন একটা ছোট্ট গ্রহের বাসিন্দা। ছোট্ট রাজপুত্রের কথা ভাবলেই সুবলের আশ্চর্য সুন্দর মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠে।
সুতরাং সকাল হলেই টুকুন বুঝতে পারে—এই পৃথিবী কত সব ভারী মজার ব্যাপার নিয়ে বেঁচে আছে। এই পৃথিবীর মাটিতেই সাহারা মরুভূমিতে এক ছোট্ট রাজপুত্রের সঙ্গে লেখকের দেখা হয়ে গেছিল। বড়রা এ—সব বিশ্বাস করবে না। যেমন বড়রা বিশ্বাস করবে না, ছোটরা যদি ছবি এঁকে দিয়ে বলে, এই ছবিতে একটা বাঘ এঁকেছি, বাঘের মুখে হরিণ—ওরা বলবে, ধ্যৎ, তা হয় নাকি, এটা তো রহমৎ মিঞার গোঁফ হয়ে গেল। তা হয় কী করে! এই নিয়ে কথা কাটাকাটি করেও বড়দের বিশ্বাস করানো যাবে না—কখনও কখনও কোনও ছোট রাজপুত্র অন্য গ্রহাণু থেকে চলে আসতে পারে। টুকুন ভাবল, এসব কথা শুধু একজনকেই বলা যাবে—সে সুবল, সুবল শুনলে বলবে, হ্যাঁ দিদিমণি আমাদের ছিল একটা নদী, বড় নদী শুকিয়ে গেল—সে যেমন বলেছিল, দিদিমণি স্বপ্নে দেখেছি, আমরা চলে আসার পর জনার্দন চক্রবর্তী ফিরে গেছে নদীতে। যেখানে দিনমানে আমরা গর্ত করেছিলাম—সেখানে কী নির্মল জল। জলের ভিতর একটা হরিণ শিশু পড়ে গেছে।
সুবল যখন এমন বলে, তখন মনে হয় সব কিছু সত্যি হতে পারে। সে এলে গল্পটা বলা যাবে। বলা যাবে ছোট্ট রাজপুত্র বারবার একটা কথা কেবল বলেছিল, আমাকে একটা ভেড়ার বাচ্চা এঁকে দাও। মানুষটা কী করে তখন, সে বলেছিল, আমি ছবি আঁকতে জানি না।
ছোট্ট রাজপুত্রের এক কথা, দাও না আমাকে একটা ভেড়ার বাচ্চা এঁকে।
মানুষটা ভাবল ভারী বিড়ম্বনা। এমনিতে উড়োজাহাজটা বিকল হয়ে গেছে। সাত—আট দিনের মাত্র জল আছে এর মধ্যে, কিছু না করতে পারলে মরে যেতে হবে। তখন এমন ছোট্ট রাজপুত্র কী করে যে এখানে! সে বলল, ছোট রাজপুত্র আমি ছেলেবেলাতে একটা ছবি এঁকেছিলাম।
রাজপুত্র বলেছিল, তাই বুঝি?
—কিন্তু কী জান, আমি যা ভেবে আঁকলাম, তা সত্যি হল না।
—মানে?
—আমি একটা অজগরের মুখে হাতির ছবি এঁকেছিলাম।
—বাবা! বেশ তো!
—না, বেশ নয়?
—কেন নয়?
—কেউ বিশ্বাসই করল না ওটা অজগরের হাতি গেলার ছবি।
—ওরা কী বলল?
—ওরা বলল, ওটা একটা টুপি।
ছোট্ট রাজপুত্র হা হা করে হেসে উঠল। —বড়রা খুব অঙ্ক ভালোবাসে। অঙ্কের হিসাবে না মিললে ওরা বিশ্বাস করতে চায় না। যেমন দ্যাখো, বিশ্বাস করতে চায় না কেউ আমার বাড়ি একটা গ্রহাণুতে। কিন্তু লামারতিন নামে এক জ্যোতির্বিদ আবিষ্কার করেছিল—সেটা সতেরোশো বাইশের জানুয়ারির আটাশ তারিখ হবে, আমার গ্রহের নম্বর পর্যন্ত ঠিক করে দিয়েছিল…..
—কত?
ছোট্ট রাজপুত্র বলল, তিন আট সাত পাঁচ…ছোট রাজপুত্র বলতে থাকলে আর শেষ হয় না।
টুকুনের মনে হত সে নিজেই সাহারা মরুভূমিতে একটা ছোট্ট এরোপ্লেন নিয়ে নেমে গেছে এবং যা কিছু কথা সব তার সঙ্গে হচ্ছে।
এমন একটা সকালে যখন সে এসব ভাবছিল, এবং জানালা দিয়ে সুন্দর ফুলের সৌরভ ভেসে আসছিল, তখন ইন্দ্র এসে হাজির।
