সুবল রাস্তায় কত কিছু ভাবতে ভাবতে হাঁটছে। শহর ধরে হাঁটলেই যেন এমন হয়। অথচ খারাপ দিনগুলোতে সে একটা ভাবনাই ভাবত, জল কোথায় পাবে? জল পেলে কখনও পাহাড়ে যা সব লতা মূল ছিল, যেমন পেস্তা আলোর গাছ, এবং তার মূল অথবা ফল কিছু সিদ্ধ করে খেলে কোনওরকমে তাদের দিন চলে যেত। জল যে কী দুর্লভ ছিল! এখন এই শহরে এটা ভাবতে পর্যন্ত হাসি পায়। জলের জন্য তারা প্রাচীনকালের মানুষদের মতো নদীগর্ভে এক এক করে মাইলের পর মাইল বালি তুলে মানুষ—সমান গর্ত করেও যখন দেখল নদীর চোরাস্রোতে পর্যন্ত জল নেই, তখন যার যেদিকে চোখ যায় সেদিকে চলে যাওয়া যেন।
অথচ এখানে এসে আর জলের কথা মনে হয় না। সে চারপাশে দেখে নানা আকর্ষণ। সকাল হলে গাছে তেমন পাখি ডাকে না, অথচ আকাশ নীল, ট্রামলাইনের তার নীল সুতোর মতো অজানা রহস্য হয়ে যায়। কত দূরে এই সব ট্রামলাইন চলে গেছে সে জানে না। পয়সা হলে সে একদিন সারাদিন ট্রামে চড়ে ঘুরবে। শহরে বড় রাস্তায় কখনও কখনও গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে সে হেঁটে যেত। আশ্চর্য নিস্তব্ধতা। এবং দুটো একটা গাড়ি গেলে মনে হত এক বড় মাঠের ভিতর দিয়ে একা একা সে হেঁটে যাচ্ছে। কেউ তার পাশে নেই। তাকে ঠিক পথ চিনে মাঠ পার হয়ে যেতে হবে।
এত সব ভাবতে ভাবতে সে দেখল এক সময় দূর থেকে টুকুনদিদিমণির জানলাটা দেখা যাচ্ছে। সে এবার প্রায় রাস্তা ধরে ছুটতে চাইল। কারণ সে দেখতে পাচ্ছে, ঠিক স্পষ্ট নয়, এখনও স্পষ্ট নয়, তবু মনে হচ্ছে জানলাটা বন্ধ। এখন শরৎকাল। আকাশে নানা বর্ণের মেঘের খেলা। কখনও বৃষ্টি, কখনও নির্মল আকাশ। অথচ এ—সময় জানালা বন্ধ। টুকুনদিদিমণি কখনও জানালা বন্ধ করে না। ওর মনে হল হয়তো ক’দিন ওকে আসতে না দেখে হতাশায় জানলা বন্ধ করে দিয়েছে।
ওর খুব খারাপ লাগছিল। সে কেন যে এল না, কেন যে সিস্টারের ওপর অভিমান করে এল না! যদি অন্য কিছু হয়, যদি টুকুনদিদিমণির ছোট পাখির মতো আত্মাটা উড়ে চলে যায়! এসব মনে হতেই কেমন ওর বালকের মতো বুকভরে কান্না উঠে আসতে চাইল। সে বলল, দিদিমণি, এবার থেকে ফের আগের মতো রোজ আসব। আমি এসেছি।
কিন্তু সে গিয়ে যা দেখল—সত্যি অবাক, জানলা বন্ধ। সেখানে কেউ আছে বলেও মনে হয় না।
সুবল পাগলের মতো জানলায় শব্দ করতে থাকল।
সহসা জানলা খুলে, প্রায় পাঁচ সাতটা মানুষ ওকে তেড়ে এল। সে ওদের কাউকে চেনে না। ওরা সবাই একসঙ্গে মুখ খিঁচিয়ে আছে।
তবু এরই ভিতর সে যা দেখল, একজন খুব মোটামতো মানুষ বিছানায় বসে আছে। ওর পাশে একটা নলের মতো কী যেন। মাঝে মাঝে দুটো সরু হলুদ রংয়ের নল সে টেনে নিয়ে দরকার হলে নাকে দিচ্ছে আবার খুলে রাখছে। মোটা গোঁফ লোকটার। সুবল ওদের তবু বলল, আমার টুকুন দিদিমণি এ—ঘরে ছিল। আমি ওকে দেখতে এসেছি।
লোকগুলো কোনও কথা বলল না। মুখের ওপর জানলা বন্ধ করে দিল।
এগার
এটা একটা বড় বাড়ি। খুব বড়। কলকাতার ওপর এতবড় বাড়ি সচরাচর দেখা যায় না। বাড়িটা অনেকটা জায়গা জুড়ে। খুব ছিমছাম, পরিপাটি নরম ঘাসের চাদর বিছানো চারপাশে। সামনে একটা ছোট্ট পাহাড়। দু’দিকে দুটো পথ চলে গেছে। পাঁচিল লম্বা, দু’মানুষ—সমান উঁচু পাঁচিল বাড়িটার চারপাশে। পাঁচিলের পাশে সব ছোট ছোট আউটহাউস। এবং নানা বর্ণের করবীফুলের গাছ। গাছের নীচ দিয়ে হেঁটে গেলে বোঝাই যায় না এ—বাড়িতে কোনও দুঃখ জেগে আছে।
অথচ একটা মেয়ে, ছোট্ট জানলায় বসে রয়েছে। সে এখন জানলা আর বন্ধই করে না। সে আসবে। ঠিক আসবে। কারণ সুবল না এসে পারে না। ওর পাখিটা যখন সম্বল আছে, সে আজ হোক কাল হোক, জানলায় পাখিটাকে পাঠিয়ে দেবে। টুকুন আছে দোতলার দক্ষিণ দিকের বারান্দায়। নীচে মালীরা বড় একটা বাগান করছে। কত সব ফুলের সমারোহ এখন। শেফালীগাছে কত অজস্র ফুল। এবং সকাল হতেই গীতামাসি যখন জানলা খুলে দেয়, সে দেখতে পায় কত সব পাখি এসেছে গাছটায়। সে সুবলের পাখিটাকে তার ভিতর খোঁজার চেষ্টা করে। যদি ওদের সঙ্গে ছদ্মবেশে মিশে থাকে পাখিটা।
আর কী সুন্দর মনে হয় পৃথিবী। ওই যে সকাল হল, কিছুক্ষণ পরই রোদ এসে নামবে, এবং সামান্য শিশিরের টুপটাপ শব্দের মতো পাখিরা এসে বসেছে গাছগাছালির ভিতর—তার যে কী ভালো লাগছে!
এই দক্ষিণের বারান্দায় কাচের জানলা সব। ভিতরে টুকুনের মনোরঞ্জনের জন্য নানারকমের খেলনা। এখন এই ক’মাসেই বোঝা যায় টুকুনের বয়স আর খেলনার জগতে নেই। সে সুবলের সঙ্গে দেখা হবার পর থেকেই শারীরিক কীসব অনুভূতি যেন তাকে ক্রমে গ্রাস করছে। সে এখন সুন্দর সুন্দর বই পড়তে ভালোবাসে। দি প্রিন্স অ্যান্ড দি পপার গল্পটি বড় ভালো লাগে। কখনও সে আতোয়ান দ্য স্যাঁত—একজুপেরির ল্য পতি প্র্যাঁস পড়তে পড়তে মুগ্ধ হয়ে যায়। সেই সাহারা মরুভূমির বুকে নায়ক, সে বিমান বিকল হয়ে যাওয়ায় ওখানে পড়ে গেছে, সাত—আট দিনের মতো মাত্র পানীয় জল আছে—আর আশ্চর্য সেই মানুষটা যখন একাকী, নিঃসঙ্গ মানুষের বসতি থেকে প্রায় হাজার মাইল দূরে এবং শুধু আকাশ সীমাহীন দেখা যাচ্ছে, কিছু নক্ষত্র, আর কাঁটাগাছ মরুভূমির, তখন কিনা সকাল হলে, সুন্দর এক ছোট্ট রাজপুত্রের কণ্ঠ সে শুনতে পায়—আমাকে একটা ভেড়ার বাচ্চার ছবি এঁকে দাও না!
