টুকুন বলল, কী সুন্দর দিন!
সিস্টার বলল, ভারী সুন্দর।
—সুবল আমাদের ট্রেনে উঠে এলে পুলিশ এসেছিল সিস্টার।
—পুলিশ।
—হ্যাঁ পুলিশ। ওরা তো জল খাবে বলে মাঝ—রাস্তায় ট্রেন আটকে দিয়েছিল।
—ও মা, কী বলে টুকুন।
—হ্যাঁ সত্যি সিস্টার। ওদের দেশে খুব খরা। জল নেই। লঙ্গরখানা বন্ধ। জলের অভাবে চাষবাস হয় না। গাছপালা পুড়ে গেছে। সারা মাঠ খাঁ খাঁ করছে।
—সত্যি?
—সত্যি সিস্টার। আমাদের ট্রেনটা থামিয়ে দিলে বাবা তো ভয়ে কাঠ। ওদের কী চেহারা! সুবলকে এখন দেখে চেনাই যায় না। ওর শরীরে মাংস ছিল না। লিকলিকে। কাঠির মতো হাত—পা। অথচ কী সুন্দর হাসিমুখ সুবলের, কী সুন্দর সরল চোখ!
সিস্টার বলল, গ্রামের মানুষদের এমনই মুখ চোখ হয় টুকুন।
টুকুন বলল, না দিদিমণি, হয় না। আমাদের কামরায় কেবল তো সুবল ওঠেনি, আরও অনেকে। ওদের দেখলে সিস্টার আপনিও ভয় পেতেন। আমি তো ভয়ে চোখ বুজে ফেলেছিলাম, কিন্তু সুবল এসে শিয়রের কাছে দাঁড়াতেই আমার মনে হয়েছিল সিস্টার, একজন বালক সন্ন্যাসী এসে দাঁড়িয়েছে।
সিস্টার না বলে যেন পারল না, টুকুন তুমি খুব সুন্দর সুন্দর কথা বলতে পারছ দেখছি।
—সিস্টার আমি জানি না, কী করে এমন সুন্দর কথা বলতে শিখে গেছি। আগে মা বলত, আমি একটাও কথা বলতাম না। সব তাতেই আমি বিরক্ত হতাম। শুধু চুপচাপ শুয়ে থাকা ছিল আমার কাজ। আমি এখন কেমন উঠে বসতে পারি, হাঁটতে পারি।
সিস্টার জানেন—টুকুন ঠিক হাঁটতে জানে না। টুকুনের বয়স কত—এই বারো—চোদ্দো হবে, টুকুনের অসুখ কবে থেকে, সেই কবে থেকে যেন, সাল—তারিখ সবাই ভুলে গেছে—এত লম্বা অসুখ মানুষের কী করে হয়—কী যে লম্বা অসুখ, ঠিক ঘোড়দৌড়ের মাঠের মতো, রেসের মাঠে যেমন একটা ঘোড়া অনন্তকাল ছুটেও শেষ করতে পারে না, তেমনি মনে হয় টুকুন এক অনন্তকালের ঘরে অসুখের দরজায় বারবার দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এমন অনেকবার হয়েছে। সে বেশ ভালো হয়ে গেছে। হেসে খেলে বেড়িয়েছে—আবার কী করে যে একটা অসুখের ভিতর পড়ে যায়—সে জানে না কী করে সে রুগণ হয়ে যায়, ফ্যাকাশে হয়ে যায়, চোখের নীচটা ফুলে যায়। তখন শরীরের যাবতীয় কিছুতে কড়া পাহারা এবং এই করে কতকাল থেকে মা—বাবা বেশ একটা প্রতিযোগিতার ভিতর পড়ে গেল টুকুনের। প্রতিযোগিতা ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের।
টুকুন বলল, এখনও সুবল আসছে না।
—এসে যাবে।
—আমি জানলায় যাচ্ছি। বলে টুকুন নিজেই উঠে বসার চেষ্টা বলল। ওর হাত—পা লম্বা। গায়ে মাংস সামান্য লাগায় মুখটা বেশ ভরা দেখাচ্ছে। সব কিছুর ভিতর আছে কেবল ওর দুটো সুন্দর চোখ। মনে হয় আশ্চর্য নীল চোখ। চোখের মণিতে এখনও ছায়া দেখা যায়। কেউ এসে পাশে দাঁড়ালেই ছায়াটা নড়ে ওঠে। সিস্টার টুকুনকে পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য করতে চাইলে হাতটা ঠেলে দিল।—না সিস্টার, আপনি দেখুন আমি ঠিক ঠিক উঠে যাচ্ছি। আমার এতটুকু কষ্ট হচ্ছে না। বলে সে অনায়াসে উঠে বসে, বলল, কেমন ঠিক আমি উঠতে পেরেছি।
টুকুনকে আজ সকালেই হলুদ রংয়ের একটা ফ্রক পরানো হয়েছে। নরম সিল্কের। রংটা ভারী উজ্জ্বল। লতাপাতা আঁকা ফ্রক। কোথাও দুটো প্রজাপতি মুখোমুখি বসে—এবং নানা রংয়ের ছবি ফ্রকে। ওর সেই খেলনাগুলোর মতো। এই বয়সেও টুকুন খেলার জগতে থাকতে ভালোবাসে। এই খেলনার জগতে সে কখনও রানি হতে ভালোবাসে, অথবা রাজকন্যা। ওর কুদুমাসি বেড়ালটা ভারী বজ্জাত। যখন টুকুন এমন ভাবে, তখন বেড়ালটার গোঁফ নড়ে ওঠে। টুকুনের তখন ইচ্ছে হয় আছাড় মেরে ভেঙে ফেলতে। সে পারে না। কারণ সে উঠতে পারে না, হাঁটতে পারে না। ক’দিন কোনও হুঁশ ছিল না। সুবল এসে খুঁজে পেতে ঠিক জানলায় আবিষ্কার করে ফেলে, আবার ওকে উৎসাহ দিল। বাঁচার উৎসাহ। কী এক জাদুকরের মতো সুবল হাত—পা নেড়ে কেবল নেচে নেচে গ্রাম্য সংগীত সুর করে বলে যেত।
এখনও সুবল আসছে না। সিস্টার অবাক—আজ এমন প্রতীক্ষা একজন মানুষের জন্য টুকুনের, যে এলেই বলবে তুমি যাবে আমাদের বাড়িতে। এই আমাদের ঠিকানা। দেখবে খুব বড় বাড়ি। সামনে বড় জলাশয়। চারপাশে অনেক দিনের পুরনো পাঁচিল। ভিতরে অজস্র গাছপালা। এবং জলাশয়ের পাশে সুন্দর এক অট্টালিকা। অট্টালিকার ছায়া যখন সেই জলাশয়ে ভাসতে থাকে তখন মনে হবে সুন্দর এক রাজকন্যার সন্ধানে কোনও রাজপ্রাসাদে ঢুকে গেছ।
সিস্টার অবাক, ভারী সুন্দর পা ফেলে ঠিক ওর মনে আছে, সে এমন পা ফেলে হেঁটে গেছে—সেই কবে, এখন ভারী স্বপ্নের মতো মনে হয়—সে একজন মানুষের উদ্দেশ্যে এমন পা ফেলে হেঁটে গেছে, বাড়িতে কীসব আলো জ্বালানো হয়েছিল সেদিন, সকাল থেকে শানাই বেজে চলেছে, সে সকাল থেকে হলুদ রংয়ের শাড়ি পরেছিল, এবং পায়ে পায়ে হাঁটা, প্রতীক্ষা, আশ্চর্য প্রতীক্ষা থাকে মানুষের। সে কখনও জানে না কীভাবে সেইসব প্রতীক্ষার দিনগুলি মরে যায়। এখন টুকুন জানলায় যেভাবে হেঁটে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে গুণে গুণে পা ফেলে, কেউ যেন দুপাশ থেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, যেমন তাকে কেউ ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, পীড়িতে বসিয়ে দেবার জন্য, লাল বেনারসি, চুমকি—বসানো ওড়না, মুখে কপালে ঘাম, পা গুণে গুণে হাঁটা, টুকুন ঠিক সেইভাবে জানলায় হেঁটে যাচ্ছে।
