টুকুন বলল, সিস্টার আপনি বলেছিলেন আমি হাঁটতে পারি না।
—আমি দেখেছি টুকুন। তুমি ঠিক হাঁটতে পারো।
—আজ মা—বাবাকে বলবেন কিন্তু আমি জানালা পর্যন্ত হেঁটে গেছি।
—বলব।
—কী সুন্দর লাগে।
—আমি তোমাকে ধরে থাকব।
টুকুন জানলার গরাদে হাত রেখে বেশ শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ওর কষ্ট হচ্ছিল—কষ্ট হোক, পায়ে এভাবে রক্ত সঞ্চালন হচ্ছে, মেয়েটা একদিন ঠিক অশ্বের মতো হয়তো দৌড়ে যাবে। কত জায়গায় না গেছে। এই অসুখ নিরাময়ের জন্য মিঃ মজুমদার হিল্লি—দিল্লি কম করেননি। অথচ মেয়েটা সেই যে কী হয়ে থাকল, চোখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, আর ভালো হতে চাইল না। তারপর সেই খরার দেশের ওপর দিয়ে ট্রেন এসে গেলে, ট্রেন আটকে দিল মানুষেরা। ট্রেনের জল লুটে—পুটে খেয়ে নিল। খেয়ে নিয়ে কেউ নেমে গেল না। ওরা শহরে—গঞ্জে চলে যাবে বলে ট্রেনে বসে থাকল। তারপর অন্য স্টেশনে, পুলিশ। কড়া পাহারায় সব মানুষগুলোকে ধরে নিয়ে যাওয়া হল। টুকুন শুয়ে শুয়ে আশ্চর্য এক মানুষের গল্প করার সময় এমন বলেছে।
—জানেন সিস্টার, সুবলের একটা বাঁশের চোঙ ছিল। কত যে রাজ্যের কীটপতঙ্গ ওর পকেটে।
—ওসব দিয়ে ও কী করত?
—ওর পাখির জন্য ধরে এনেছিল।
—পাখিটার কী নাম?
—কী যে নাম জানি না।
—ট্রেনে উঠে তোমাদের কামরায় সরাসরি?
—আমি দেখলাম, ওরা এসেই বাথরুমে চলে গেল। জলের কল খুলে দিল। অঞ্জলি পেতে কেবল জল খেতে থাকল।
—তারপর?
—তারপর অবাক আমরা, কী করে সুবলের কোল থেকে সব পোকামাকড় উড়ে গেল। এবং সারাটা কামরা ভরে গেল।
—ও মা, তাই বুঝি?
—বাবা ভীষণ বিরক্ত। কিন্তু যতসব ক্ষুধার্ত লোক একটু জলের জন্য যখন এমন করতে পারে তখন ভয়ে বাবা কিছু বললেন না। পোকাগুলো সারাটা কামরায় ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা বসতে পারছি না। আমাদের মুখ—চোখ ঢেকে গেছে।
—সত্যি!
—সত্যি সিস্টার! কিন্তু সুবল নিমেষে সব সাফ করে দিল।
—কী করে?
—কিছু না। সে তার বাঁশের চোঙ থেকে বলল, যা পাখি উড়ে যা! পাখি উড়ে গেল। উড়তে থাকল। সব এক দুই করে খেতে থাকল। বড় বড় পোকামাকড় সব ধরে এনে সুবলের চোঙের ভিতর পুরে দিতে থাকল পাখিটা।
তারপর টুকুন অনেকক্ষণ কোনও কথা বলল না। সে চুপচাপ, চারপাশের মাঠ, রাস্তা, ট্রামগাড়ি, বাসগাড়ি দেখছিল। বেশ চলছে কলকাতা শহর। চলে যাচ্ছে, কেবল চলে যাচ্ছে। কেবল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দালান কোঠাগুলি আর লাইটপোস্ট, ইলেকট্রিক তার এবং নিরবধি কালের এই আকাশ।
এমন দেখতে দেখতে সে তন্ময় হয়ে যায়। তখন মনেই হয় না, এই শহরের কোথাও সুবল বলে একজন বালকের নিবাস রয়েছে। যে এসেছিল তাদের সঙ্গে, যাকে মা ব্যান্ডেলে নামিয়ে দিল। যার কেউ নেই। মা নেই, বাবা নেই। সংসারে সুবল একা এক মানুষ। অথচ আশ্চর্য, তার কোনও ভয় নেই। মা—বাবা না থাকলে সংসারে কী যে ভয়। টুকুনের ভয়ে চোখ বুজে এল।
সে চোখ বুজেই বলল, জানেন সিস্টার, সুবলের কেউ নেই। মা নেই, বাবা নেই, কেউ না থাকলে কী কষ্ট না।
—খুব কষ্ট। এবার এসো তোমাকে শুইয়ে দিচ্ছি। এতক্ষণ একভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে নেই।
—আমার কিন্তু কোনও কষ্ট হচ্ছে না।
—তা না হোক। তবু তোমার এখন শুয়ে থাকা উচিত।
সিস্টার জানে বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা ওর নেই। এবং যদি দাঁড়াতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যায় তবে কেলেঙ্কারি। সে বলল, আমি জানলায় আছি, সুবলকে আসতে দেখলেই বলব সুবল আসছে।
—আপনি ঠিক চিনতে পারবেন না।
—আমি এত দেখলাম, কেন চিনতে পারব না!
—না। আমার মনে হয় আপনি ভুলে গেছেন। সে থাকে জানালার বাইরে। আপনি ভিতরে। আপনি তাকে কতটুকু দেখেছেন!
তা ঠিক। সিস্টার খুব একটা বেশি দ্যাখেনি। ছেলেটা এলেই কেমন বিরক্তিকর ঘটনা। সিস্টার দূরে অন্য কাজে মন দিত। কী যে এত কথা এমন একটা সুন্দর বড় ঘরের মেয়ের সঙ্গে—কোথাকার হাভাতে একটা ছোঁড়া, সে এলেই কেমন টুকুন হাতে পায়ে বল পায়। ডাক্তারবাবু বলে গেছেন, সে এলে তাকে যেন টুকুনের সঙ্গে কথা বলতে অ্যালাউ করা হয়—সুতরাং সিস্টার আর কী করে এবং এখন মনে হল, সুবলকে সে খুব একটা ভালো লক্ষ্য করেনি।
টুকুন এবার ধীরে ধীরে বলল, জানেন সিস্টার কেউ একা, এমন ভাবতে আমার কেন জানি ভারী কষ্ট হয়। আমার তখন কিছু ভালো লাগে না।
টুকুন একা—এটা ভাবতে ওর আরও কষ্ট। কখনো কেউ একা থাকলে—কেউ না থাকলে—টুকুনের মনে হয় সে যদি এমন একা হয়ে যায়। কেউ নেই। বাবা নেই, মা নেই। ওর দেখাশোনার মেয়ে শেফালি নেই—কী যে হবে তখন—ওর কী যে কষ্ট, ঠিক সুবলের মতো সে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে। কেউ কিন্তু জিজ্ঞাসা করবে না। একটা গাছের নীচে বসে থাকলে তার ভেউ ভেউ করে শুধু কান্না পাবে।
এ—জন্যেই ওর ভিতর সুবলের জন্য কেমন মায়া পড়ে গেছে। সে জানে ওর যা বয়েস—এ বয়সে অনেক কিছু হবার কথা। অথচ কী আশ্চর্য, তার শরীরে কোথাও সে সব লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে না। মা—বাবার কথাবার্তা অথবা ডাক্তারের কথাবার্তা থেকে সে ধরতে পারে—জননী হতে গেলে যা যা লাগে এই বয়সে তার কিছুই তার ভিতর স্পষ্ট হয়ে উঠছে না। সে কেমন দুঃখী গলায় এবার বলল, সিস্টার আমাকে ধরুন। আমি পায়ে হেঁটে আর যেতে পারছি না।
মেয়ের এমনই রোগ। হতাশা বুকে। এখন মনে হয় মেয়ের বয়স ষোলোর মতো। ফ্রক কী খালি গায়ে রাখলেও কোনও ক্ষতি নেই। সে যেন ইচ্ছা করলে একটা সিল্কের গেঞ্জি পরে থাকতে পারে। পুরুষমানুষের মতো হেঁটে বেড়াতে পারে। এবং এ—ভাবেই মেয়ের অসুখ বেড়ে গেল। এখন মনে হয় বয়স আরও বেশি টুকুনের, হিসাব করলে ষোলো—সতেরো। ফ্রক গায়ে কচি বালিকা সেজে বসে আছে—এবং ইহজীবনে বুঝি টুকুন আর এ—বয়স পার হবে না। অথচ আশ্চর্য সুন্দর মুখ টুকুনের। মেয়েদের এমন সুন্দর মুখ হয়! আহা আশ্চর্য চোখের তারায় কী যে মায়া। সে সুবলের জন্য এখন বিছানায় শুয়ে কেমন প্রার্থনা করছে। ঈশ্বর, যাদের কেউ নেই, তুমি তাদের আছো। তুমি তাদের দ্যাখো।
