শান ভেসে যাচ্ছে রক্তে। ওর জিভে সেই রক্তের স্বাদ নোনতা লাগল, সে তাড়াতাড়ি উপুড় হয়ে সেই রক্ত চাটতে থাকল। আহা আহা খাদ্যবস্তু। এমন খাদ্যবস্তু সে যেন কতকাল আহার করেনি। নিজের রক্ত পানে সে উল্লাসে উঠে দাঁড়াল। উঠে দাঁড়াতে পারল। সে অন্ধ হলেও রক্তটুকু সে চেটে চেটে খেয়ে ফেলল। খেয়ে ফেলতেই ওর মনে হল কতকাল পর আহার করেছে। সে কতকাল পর আহার করে উল্লাসে জয়ঢাক বাজাচ্ছে। জয়ঢাক, ঢাক ঢোল বাজাচ্ছে। সে বাজাচ্ছিল না অন্য কেউ বাজাচ্ছে।—কই রে পলা গেলি কই। সে উঠে দাঁড়াতে পারল, সে হেঁটে যেতে পারল। দরজা পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারল। টলতে টলতে সে দরজা পর্যন্ত হেঁটে গেল। খিল খুলে দিয়ে বলল, যা অবলা হরিণ শিশু চলে যা। যদি কোনওকালে বৃষ্টি হয় তবে বলবি—এই সংসারে জনার্দন চক্রবর্তী বলে একটা লোক ছিল, সে তার সব ভালোবাসা দিয়ে, মন্ত্র দিয়ে এই দেশের প্রাণপ্রাচুর্যকে রক্ষা করতে চেয়েছিল—পারেনি।
একি! কীসের এত শব্দ! মনে হয় পৃথিবী দুলে উঠছে। মনে হয় পাহাড় টলছে। মনে হয় আকাশ ভেঙে পড়ছে। মনে হয় ঝড়ে দেবীর মন্দির গাত্রে পাথর ছুটে আসছে। যেন এক প্রলয়। জনার্দন দু’হাত তুলে সেই উলঙ্গ রাত্রির ভিতর ডাকল, পলা, অপলা, অচলা কোথায় গেলি। ঝড়ে মরে যাবি। তোরা মরে গেলে এই অঞ্চলে আমার চেষ্টার সাক্ষী কেউ থাকল না। তোরা মন্দিরের ভিতর চলে আয়। এই ঝড়ে পড়লে তোরা মরে যাবি।
কিন্তু জনার্দন ওদের কোনও সাড়া পেল না। মনে হল অর্জুন গাছটা ঝড়ে ভেঙে পড়েছে। মনে হল ভিতরে যত ফুল বেলপাতা ছিল সব উড়ে যাচ্ছে, মনে হল সেই হরিণ শিশুরা এখন লাফিয়ে চলছে। আর আর আর মনে হল—এটা কী হচ্ছে। বৃষ্টি। বৃষ্টি! মা, মা, বৃষ্টি হচ্ছে। মা মা, মাগো সুবচনি তোর এত কৃপা, তোর এত কৃপা। মা আমি যে আর কিছু ভাবতে পারছি না।
জনার্দন মন্দিরের ভিতর পর্বত প্রমাণ দৈত্যের মতো লুটিয়ে পড়ল।
আট
ডাক্তারবাবু ভিতরে ঢুকে বললেন, তুমি আজ বাড়ি যাবে টুকুন।
—সত্যি!
—সত্যি।
টুকুন বলল, আমি সত্যি বাড়ি যাব। ওর চারপাশে যা কিছু আছে—এই ভেবে একবার দেখল সব। তেমনি জানালা খোলা। মা—বাবা আসবেন। কখন আসবেন এই ভেবে টুকুন অধীর হয়ে উঠল। নার্সিং হোমের এদিকটায় একটা সবুজ মাঠ। এবং জানলা খুললেই চোখে পড়ে হাজার মানুষের মিছিল—এই কলকাতা শহর এত মানুষ কেন? কোথায় যায়—কী করে এরা, টুকুন ভেবে পায় না। কিন্তু টুকুন যেজন্য জানলায় বসে আছে এবং খোলা রেখেছে, নার্স এলে বলেছে, সুবল এসেছিল সিস্টার? সুবল কি আমার ঘুমের ভিতর ঘুরে গেছে?
সিস্টার বলল না।
—সে কেন এল না। আমি বাড়ি চলে যাব—সে না এলে কী করে আমি বাড়ি যাব?
সিস্টার বলল, তোমার মা—বাবা এসে নিয়ে যাবে।
—মা—বাবা তো সব সময়ই আসছে, ওরা আমাকে যখন খুশি নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সুবলকে যে আমার বলা হয়নি, আজ আমি চলে যাব। সে এখানে এলে আমার ঠিকানা পাবে কী করে?
—আমি দেব। তোমার বাড়ির ঠিকানায় চলে যাবে। তোমাদের কত বড় বাড়ি, চিনতে ওর অসুবিধা হবে না।
—সে তো বলেছে, টুকুনদিদিমণি, আমি কলকাতার পথ—ঘাট চিনি না। তুমি যখন বাড়ি যাবে আমাকে সঙ্গে নিয়ে নিয়ো।
—সে ঠিক চলে যাবে।
—কিন্তু মা কী ওকে নিতে চাইবে?
—নেবে না কেন? এত বড় একটা অসুখ তোমার সে সারিয়ে দিল। আমরা সবাই যা করতে পারিনি, কোথাকার এক পাখিয়ালা এসে সব করে দিল, ভাবা যায় না।
—কোথাকার বলতে নেই সিস্টার। সুবল খুব ভালো ছেলে। সে আমাকে চন্দনের বীচি, কুঁচফল দিয়েছিল।
—খুব ভালো। ঐ যা একটা পাখি রেখেছে বাঁশের চোঙে আর লম্বা আলখাল্লার মতো পোশাক। মনে হয় আমরা তিন চারজন ওর ভিতর ঢুকে যাব।
—সিস্টার আমি একটু জানালার দাঁড়িয়ে থাকতে চাই এখন।
—আমি ধরছি।
—না আমি নিজে হেঁটে যাব। সুবল যে কখন আসবে।
সুবল এলেই যেন টুকুনের সব হয়ে যায়। সে কখনও জানালা পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না। সে ক’দিন আগে মাত্র উঠে বসতে পেরেছে। গতকাল তাকে ধরে ধরে হাঁটা শেখানো হচ্ছিল। বারবার হাঁটতে গিয়ে টুকুন পড়ে যাচ্ছিল। পারছিল না। নার্স এবং আয়া মিলে দু’পা হাঁটতে সাহায্য করেছে। একে ঠিক হাঁটা বলে না, কিছুটা সান্ত্বনা দেবার মতো ব্যাপারটা ছিল—তুমি হাঁটতে পার টুকুন, আর কী, এবারে তোমাকে আমরা অনেক দূরে নিয়ে যাব। কোনও বড় পাহাড়ে। সেখানে পাইন গাছ থাকবে, শীত থাকবে, বরফের পাহাড় জমবে। তুমি ফারের কোট গায়ে দিয়ে লম্বা সরু দুটো লাঠি হাতে নিয়ে দু’পায়ে স্কেটিং করবে। এ—পাহাড় থেকে সে—পাহাড়। এ—উপত্যকা থেকে সেই অন্য উপত্যকায়—অনেকটা পাখিয়ালা সুবলের মতো ভাষা, সুবল যে জানালায় এসে বলত, টুকুন দিদিমণি, দ্যাখো কেমন পাখি উড়ে যায়, দ্যাখো কেমন ঘোড়া ছোটে, দ্যাখো কেমন নিরিবিলি আকাশে মেঘেরা উড়ে বেড়ায়—তুমি টুকুনদিদিমণি, রাজার মেয়ের মতো ঘোড়ায় চড়ে স্ফটিক জলের নীচে রুপোর কৌটা খুঁজতে যাবে না? আমি তোমায় নিয়ে যাব। তখন টুকুন কেমন ছেলেমানুষের মতো বড় বড় চোখে তাকায়। হাতের ইশারাতে সুবল যা কিছু দেখায়—টুকুনের মনে হয় সব সত্যি। সে সব পারে। সে রাজার মেয়ের মতো রাজ্যের সব দুঃখী রাজপুত্রদের স্বয়ংবর সভা ডাকতে পারে সেই সুবল কেন যে এখনও এল না!
