নিজের পেটের সন্তান! ভাবতে গিয়েও যেন কিছুতেই অনুভবে আনা যাচ্ছে না। অত সব প্রমাণ দেখালেন ব্রজনাথবাবু, দ্বিধা করবার কিছুই তো নেই, নেই সন্দেহের। তবু যেন সেই অনুভূতির জায়গাটা থেকে থেকে অসাড় হয়ে যাচ্ছে।
একেবারে অজানা ঘর থেকে মেয়ে নিয়ে এসে ছেলের বৌ করলে যেমন মনটা হয়ে থাকে, সুনন্দার মানসিক অবস্থাও অনেকটা তেমনি।
হৃদয় উজাড় করে ভালবাসা দিতে ইচ্ছে করছে, ভাড়ার উজাড় করে উপহার, অথচ সন্দেহ জাগছে, যোগ্য পাত্রে পড়বে তো?
তবু সুনন্দা জিতবেই। ওই মেয়েকে, তার টুলুকে, ভুলিয়ে দেবে সেই পিশাচীর শিক্ষা দীক্ষা স্মৃতি। আস্তে আস্তে ওর মধ্যে চেতনা জাগাবে, ও কোন্ ঘরের মেয়ে, ওর সামাজিক মান মর্যাদা কতখানি?
স্নেহ ভালবাসা, অর্থ প্রতিষ্ঠা, স্বাচ্ছন্দ্য স্বাধীনতা, আড়ম্বর উপকরণ,–এতগুলো মন্ত্র দিয়ে বশ করে ফেলা যাবে না একটা তরুণী মেয়েকে?
দারিদ্র্য আর অসুবিধের মধ্যে জীবন কেটেছে যার! কেটেছে প্রতিষ্ঠা পরিচয়হীন অতি সাধারণ এক গৃহকোণে।
.
না, অতিসাধারণ বললে তো কিছুই বলা হয় না। নির্লজ্জ কুৎসিত এক নগ্ন দারিদ্র। সেই দারিদ্র্যের দরজায় এসে নামলেন ব্রজনাথ।
টিনের চাল, হঁট বার করা দেওয়াল, হ্যাঁচাবেড়ার রান্নাঘর, মাটির দাওয়া। সবই প্রায় নিজের হাতেই গড়া যতীন সেনের। জবরদখল কলোনির একাংশে তার এই বাড়ি। দু-একটা ঘরামীর সাহায্যে এই আস্তানাটি গড়ে তুলেছিল সে শেয়ালদা স্টেশন থেকে উঠে এসে।
একটা চটা-ওঠা এনামেলের কাসিতে চারটি তেল-নুন মাখা মুড়ি নিয়ে খেতে বসেছিল যতীন সেন। কিন্তু একা ভোগের অধিকার জোটে নি। গোটা তিন চার ছেলে-মেয়ে হুমড়ি খেয়ে বসেছিল গুটিকয়েক প্রসাদ কণিকার আশায়।
যতীনের যে ভাগ দেবার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তা নয়, সারাদিনের পর জলখাবার বলতে তো এইটুকু জুটেছে। কিন্তু ছেলেগুলো তো পাড়ার ছেলে নয় যে দূর দূর করে খেদিয়ে দেবে? তাই দু-চারটে দিতেই হচ্ছে। একান্ত নিজের বলতে ফাটা কাঁচের গ্লাসটায় আধ গ্লাস কালো ঝুল চা।
যতীনের পরনে একটা ময়লা চিরকুট খাটো লুঙ্গি, গা খালি, গলায় গোল করে পরা কালো দড়ির মত পৈতে।
ছেলে-মেয়েগুলোর পরন-পরিচ্ছদ বাপের সাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যবর্জিত নয়। ছোট ছেলেটা বলে উঠল, বাবা, চা খাব।
আবার চা-ও চাই? ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি ছোঁড়ায় গিঠবাঁধা শাড়িপরা আধবয়সী স্ত্রীলোক। বলে উঠল, এক্ষুনি রুটি গিলিয়ে রেখেছি, তবু দেহি দেহি? পেটে কি রাক্ষস এসেছে নাকি? খবরদার বলছি, আহ্লাদ দিয়ে চাটুকু ওর গলায় ঢালবে না। উঃ, কবে যে এ দুর্গতির অবসান হবে!
যতীন সেন বলে, ঘণ্টা মিনিট গুনছি। দেখি–
বৌ বলে, ভগবানই জানেন। ভাবলে তো হাত পা কাঁপে!
এই পরিস্থিতির সামনে ব্রজনাথ এসে দাঁড়ালেন। গাড়ি থেকে নামবার প্রশ্ন নেই। গাড়ি রাখতে হয় তিনবাঁকা গলির সেই শেষ প্রান্তের মোড়ে। কেঁচার আগা হাতে ধরে সন্তর্পণে কাদাজল বাঁচিয়ে এসেছেন।
ব্রজনাথকে দেখেই যতীনগিন্নী ঝট করে ঘরের মধ্যে ঢুকে যায়, এবং ছেলে-মেয়ে কটা একটু সভ্য ভঙ্গী করে বসে।
যতীনও মুড়ির কাসিটা একটু ঠেলে দিয়ে লুঙ্গিটা টেনে পায়ের ওপর নামিয়ে দিয়ে আসুন আসুন করে ওঠে।
থাক, থাক, খাচ্ছ খাও, ব্রজনাথ বলেন, একটু বসলে হত।
ওরে, এই শীগগির টুলটা–যতীন নিজেই ব্যস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ওঠে। কোল থেকে গোটাকয়েক মুড়ি ঝরে পড়ে, এবং চোখে পড়ে লুঙ্গিটায় এমন একটা গর্ত যে লজ্জা নিবারণ দুরূহ।
ব্রজনাথের মত মাননীয় অতিথিকে দেখেও আসামাত্রই কেন যে যতীন তখন তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায় নি সেটা বোঝা গেল।
তা নড়াচড়া করতে হল না যতীনকে। বৌ ঘর থেকে একটা পায়া নড়বড়ে টুল এনে বসিয়ে দিয়ে গেল।
যতীন নীচু গলায় বলল, তারপর?
তারপর আর কি। হয়ে গেল সবই। তবে আড়ালে তো পেলাম না যে, আর একটু বুঝিয়ে পড়িয়ে দেব। যেমনটা আশা করেছিলাম, ঠিক তেমনটা হল না!
তাই নাকি? যতীনের মুখটা শুকিয়ে যায়, গিন্নী কোন রকম ইয়ে করল নাকি?
না, ইয়ে করবার কোনও স্কোপ রাখি নি। ব্রজনাথ বলেন, ব্রজ উকিল এমন কাঁচা কাজ করে না। তবে মেয়েকে তোমার নির্জনে আর একটু বোঝাতে হবে। মানে বিশ বছর আগের শুকিয়ে যাওয়া স্নেহধারা, তাকে আবার বালি খুঁড়ে বার করে নিয়ে গাছে সিঞ্চন! তা ইয়ে আপাতত কিছু রাখ খরচা বলে–
যতীনের চোখ দুটো জ্বলে ওঠে। যেমন জ্বলে ওঠে ক্ষুধার্ত জানোয়ারের চোখের সামনে খাবার দেখলে। মনে হয় বুঝি ব্রজনাথের হাত থেকে কেড়েই নেবে টাকাটা।
তবে নেয় না। শুধু ঠোঁটটা একটু চেটে নিয়ে বলে, কত আছে?
যা আছে দেখে নাও। আবার দেখা করব তোমার সঙ্গে।
এই সময় যতীনের বৌ আবার ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। চাপা গলায় বলে–সীমাকে আর দেখা করতে দেবে না?
দেবে। দেবে না কেন? তা এক্ষুনি কেন? এই তো দু দিন হল গেছে। মনটা একটু বসুক, একটু হতু হোক। আনব, আমিই আনব সঙ্গে করে। তবে বাসাটা তোমাদের বদলাতেই হবে।
বদলাবার জন্যে তো হাঁ করে আছি। যতীন বলে, এই নরকের মধ্যে জানোয়ারের মত থাকতে থাকতে জানোয়ারই বনে গেছি। নইলে আর
ব্রজনাথ ওঠেন। যতীন লুঙ্গির ভেঁড়াটার সঙ্গে নোটের গোছাটা মুঠো করে চেপে ধরে মোড় পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যায়। আস্তে আস্তে কথা হয় তখন।
