ছোঁড়া ছুঁড়ীগুলো অবোধের মত চেয়ে থাকলে কি হবে, হাঁ করে কথা গিলবে। ব্রজনাথ চলে গেলেই হাজার প্রশ্ন করবে।
ওদের মা-টিও তত কম নয়। ওদের তবু ধমকে ঠাণ্ডা করা যায়, তার বেলায় তাও চলবে না। এই পরিস্থিতিতে মানুষ হয়েছে সীমা। এইখান থেকে গিয়ে উঠেছে সুনন্দার অট্টালিকায়।
.
কোন্ কলেজে পড়েছিলে তুমি? জিগ্যেস করে সুনন্দা।
সীমা মুখ তুলে বলে, কোনও কলেজেই নয়, প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়েছিলাম।
প্রাইভেটে! ওঃ। তা আবার বি. এ. পড়। কলেজেই পড়।
আপনার যা ইচ্ছে তাই হবে।
জানলার কাছে বসে আছে সীমা। একধার থেকে মুখে আলো পড়েছে। নিষ্পলকে তাকিয়ে দেখছে সুনন্দা। ওই দৃঢ় কঠিন রেখাঙ্কিত মুখের কোন্ খাঁজটায় টুলু লুকিয়ে আছে। কই! কোথায়! ভগবান
সেই অ্যালবামখানাও যদি থাকত! তাহলে সুনন্দা তার প্রত্যেকখানি ছবি ধরে ধরে মিলিয়ে মিলিয়ে দেখত কোন্ ভঙ্গীটার মধ্যে সাদৃশ্য আবিষ্কার করা যায়।
গান-টান শিখেছ কখনো।
না সুযোগ পাই নি।
শিখতে ইচ্ছে করত না?
প্রশ্ন করে করে সুনন্দা কি ওর অন্তঃস্থল পর্যন্ত দেখে নিতে চায়? না কি বলবার মত কথা খুঁজে পাচ্ছে না বলেই এই সব অপ্রয়োজনীয় কথার চাষ?
কিন্তু মেয়েটা সত্যিই বড় কাঠখোট্টা। সুনন্দার ইচ্ছে করে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। চুলগুলি মনের মত করে আঁচড়ে বেঁধে দেয়। কিন্তু ও তো কাছে ঘেঁষেই না।
তাই ও যখন বলে, যে ইচ্ছে মিটবে না, সে ইচ্ছে করে লাভ? সুনন্দা তখন চুপ করে থাকে। তারপর বলে, এখন তো তোমার অনেক ইচ্ছেই মিটতে পারে, কই কোন ইচ্ছেই তো জানাও না আমার কাছে? কোন আবদারই কর না?
সীমা একটু হাসে। বলে, বিনা আবদারেই এত দিচ্ছেন, ইচ্ছে প্রকাশের আগেই এত পাচ্ছি, ইচ্ছে আবদারের ফাঁক পাচ্ছি কোথায়?
আবার ঢেউ ওঠে। সুনন্দার মনটা আবার গলে পড়ে। ওর ওই হাসিটা তো বড় সুন্দর! হাসলে তো কই মুখের কাঠিন্য ধরা পড়ে না! আহা, সব সময়েই যদি এমনি হেসে থাকত, তাহলে সুনন্দা নিশ্চয় পারত ঘনিষ্ঠ হয়ে বসতে, গায়ে মাথায় হাত বুলোতে, চুল বেঁধে দিতে। আর, আর হয়ত সেই ফাঁকে টুলুকে খুঁজে পেত!
এই বেলা হাসির রেশটা রয়েছে। সুনন্দা সাহস সংগ্রহ করে তাই কাছে সরে এসে বলে, তা হোক, আমার তো সাধ হয়?
আচ্ছা চেষ্টা করব। কিন্তু কি চাইতে হয় তাই তো জানি না। আপনার বাড়িতে এসে তো কত নতুন নতুন জিনিসের নাম শিখলাম, কত কত নতুন জিনিস দেখলাম। আর যে কি আছে জগতে তাই কি জানি?
সুনন্দার বুকের ফল্গুধারায় কি বন্যার বেগ এল? সুনন্দা কি ভাবছে ওকে আমি ভুল বুঝছি? ও মোটেই কাঠখোট্টা নয়। শুধু, বড্ড বেশি সরল। গোড়া থেকেই ভুল করছি আমি। আমি কেন ভাবছি না ও কত অন্যরকম পরিবেশে মানুষ হয়েছে, কেন ভাবছি না এক বছর বয়সের পর ও আর আমাকে দেখে নি। আমি ওর ত্রুটি আবিষ্কার করছি, কই আমি তো ওকে স্নেহের বন্যায় ভাসিয়ে দিতে পারছি না? তাই খুব কাছে, আরও কাছে, সরে এসে বলে, বেশ তো, গাড়ি করে দোকানে নিয়ে যাই চল। যা দেখবে, যা ইচ্ছে হবে
শুধু শুধু এত টাকা নষ্ট করবেন কেন? শুকনো স্বর, শ্রীহীন বাক্য।
সুনন্দা চমকে ওঠে। এ কী কথা! ও কি এক্ষুনি ওর বিষয় সম্পত্তি আঁট করতে চায়, তাই প্রথমেই সুনন্দার অপচয় নিবারণে হাত বাড়াচ্ছে?
একে তবে স্নেহের বন্যায় ভাসাবে কি করে সুনন্দা?
তা সেই পাপিষ্ঠ মেয়ে মানুষটার শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েই তো বেড়ে উঠেছে ও! হয়ত আবুহোসেনের মেজাজ নিয়ে অধিকারের দাবিতে সুনন্দার সঙ্গে লড়াই করতে আসবে।
ও যে শোভন রায়ের মেয়ে, এ অধিকার কিনা না, ছি ছি! বড় সন্দিগ্ধ মন সুনন্দার। এখন যে ও বড় সুন্দর কথা বলছে। বড় পবিত্র, বড় মহৎ। আমি তো কত পাচ্ছি, আবার কেন মিথ্যে খরচ করবেন। কত গরীব লোক আছে জগতে, খেতে পায় না পরতে পায় না, অসুখ করলে ওষুধ পায় না
সুনন্দার লজ্জা করে। তাই তাড়াতাড়ি বলে, সে তো বুঝি। তবু ভেবে দেখ আমি এই উনিশ বছর ধরে হাহাকার করে বেড়িয়েছি। আমার তো ইচ্ছে হয় কেউ মা বলে ডেকে বলুক মা আমায় এটা দাও চোখটা সজল হয়ে আসে সুনন্দার।–তখন শুধু বলতে শিখেছিল, দুদ থাবো না। তকোলেত দাও—
শিখেছিলই বলে সুনন্দা–শিখেছিলি নয়। কি করবে দুটোয় যে মিলছে না। মেলানো যাচ্ছে না।
এতদিন পরেও সে কথা মনে আছে আপনার?
মনে থাকবে না? সুনন্দা চোখ মোছে। আর কি কেউ মা বলে ডাকল আমায়? আর কি কেউ দাও বলে চাইল? এতদিন পরে যদি বা ভগবান তোমায় এনে দিলেন, সুনন্দা উথলে ওঠে–তুমি এখনো আমায় আপনি বলছ। পর ভাবছ। আবদার করতে লজ্জা পাচ্ছ।
সুনন্দার চোখের জল দেখে কি সুনন্দার টুলুর চিত্ত বিগলিত হয়? তাই নরম গলায় বলে, আপনিও তো আমায় তুই বলছেন না, বকছেন না, শাসন করছেন না।
বকব? শাসন করব? তোকে?
সহসা এক উত্তাল ঢেউ সুনন্দার যত্নে বাঁধা বাঁধ ভেঙে দেয়। ভেসে যায় মান-মর্যাদা। সুনন্দা দুই হাতে জড়িয়ে ধরে তার টুলুকে। তোকে আমি শাসন করব?
কথা শেষ হয় না। দরজার কাছে শব্দ ওঠে, কী ব্যাপার পিসিমা! শুনছি নাকি লোমহর্ষণ কাণ্ড! অলৌকিক ঘটনা! বাড়ি ঢুকতে না ঢুকতে রিপোর্টাররা
ঘরে আর ঢুকতে হয় না উদ্দালকের। ভিতরের দৃশ্য দেখে চুপ হয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
