না, মানে, বলছিলাম সীমা, মানে আপনার গিয়ে কি বলে টুলু, একটু অপ্রতিভ হতে পারে তার সামনে।
কী যে বলেন ব্রজনাথবাবু! নস্যাৎ করে দিয়েছিল সুনন্দা তার আশঙ্কা, বরং একটা কাছাকাছি বয়সের মানুষ পাবে। সেখানেও তো ভাইবোন ছিল না। একটা দাদা পেয়ে বাঁচবে। দুলুও তো আমার ছেলেই।
দুলু। উদ্দালকের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। টুলুর ধ্বনির সঙ্গে মিলিয়ে রাখা।
এ নাম সুনন্দার দেওয়া, আদরের ডাক নাম। বাড়িতে ওকে পুরো নামেই ডাকে সবাই।
সেই তো! সেইটিতো হচ্ছে কথা, বিজ্ঞ হাসি হেসেছিলেন ব্রজনাথ, আপনার প্রায় ছেলে বলেই তো ভাবনা। মানুষের মনস্তত্ত্ব বড় জটিল মিসেস রায়! পরস্পরের প্রতি ঈর্ষান্বিত হওয়াও অসম্ভব নয়।
কী আশ্চর্য! কি বলছেন ব্রজনাথবাবু? ঠিকরে উঠেছিল সুনন্দা। এ কী কথা?
ব্রজনাথ কিন্তু অপ্রতিভ হন নি। বলেছিলেন, আপনার সরলতাই জয়ী হোক এই প্রার্থনা করি মিসেস রায়। তবে কথাটা কি জানেন? মানুষ জীবটা নেহাৎ রক্ত-মাংসেই তৈরী। আর সেটা আমরা উকিলরা বড় বেশি জানি।
তাঁ, সুনন্দাও তা জানে। মানুষ রক্ত-মাংসে তৈরী। কিন্তু সেই রক্ত-মাংসটাই তার শেষ কথা এ কথা সে মানে না। মানুষ শব্দটার অন্য অর্থ আছে।
দুলু এসে টুলুকে হিংসে করবে! এত অনিয়ম সম্ভব? পৃথিবীতে তা হলে চন্দ্র সূর্য ওঠে কেন? বর্ষার পর শরৎ, আর তারপর হেমন্ত আসে কেন?
উদ্দালক ছুটিতে বাড়ি গেছে। সুনন্দা তার জীবনের এই আকস্মিক তোলপাড় কাণ্ডর কথা আর চিঠি লিখে জানায় নি ভাইয়ের বাড়ি। জানানো সম্ভব হয় নি তার পক্ষে।
কাগজ কলম নিয়ে বসেছিল একবার, কিন্তু শ্রীচরণেষু দাদা–বলেই থামাতে হয়েছে। কলম। কোন ভাষাই সুনন্দার মনের স্ট্যাণ্ডার্ডে পৌঁছতে পারে নি। তার জানা বাংলা ভাষাকে নিতান্তই জৈালো, পঙ্গু, দীন মনে হয়েছে।
উদ্দালককে লিখবে তবে? নাঃ, তাও হয় না। তার থেকে সে আসুক। দেখুক। তারপর নিজের মা-বাপকে যেমন করে পারে খবরটা জানাক।
কবে যেন আসবে উদ্দালক? ক্যালেণ্ডারে দাগ দেওয়া আছে না?
তা সে যে ছেলে, কবে কখন কোন গাড়িতে আসছে কিছুই জানাবে না হয়তো। দুম্ করে একদিন এসে পড়বে। মেয়াদ ফুরোবার আগেই।
.
স্নান সারা হয়েছে। সীমা ঘুরে ঘুরে দেখছে। দাসী নিয়ে বেড়াচ্ছে। বাড়িটার সর্বত্র।
শুনেছিল এদের আর কোন ছেলেমেয়ে নেই। গিন্নীও তো বিধবা। তবে পুরুষের ব্যবহারের এত জিনিস কেন সর্বত্র?
ওই সুন্দর সাজানো-গোছানো ঘরটা কার? আর স্ট্যান্ডের ওপর বসানো ওই ছবিখানা? মুখের সঙ্গে সুনন্দার মুখের তো যথেষ্ট আদল আছে। ছেলে আছে না কি মহিলাটির? এটা কি হল তবে? অঙ্কে মিলছে না তো! দেখে ফিরে যাচ্ছিল নীরবে, হঠাৎ বলে উঠল, ছবিটি কার?
ঝি তারুর মা বলল, ওই যে বললাম, দাদাবাবুর ঘর এটা। কান কর নি বুঝি?
দাদাবাবু? ছেলে আছেন?
আহা, তা ছেলে বললেই ছেলে। ভাইপো আর ছেলে কি ভেন্ন? এই তুমি তো কথায় শোওয়া বয়সেই কোল ছাড়া, মানুষটার কী হাহা করা মন তা বল? তবু বাবু য্যাখন ছিল একরকম। বাবু যেতেই পাগল হয়ে ওই ভাইপোটিকে এনে কাছে রাখল। তবু তো বুক ঠাণ্ডা। তা তুমি সে বিষয়ে মনে কিছু কোরো নি। সে তোমার ছেলে একদিকে, দেবতা একদিকে। তোমায় যে হিংসে করবে তা ভেব না।
হিংসে! সীমা ভুরু কুঁচকে বলে, আমায় হিংসে করতে যাবেন কেন?
বলে ফেলেই বুঝেছিল তারুর মা, কথাটা বলা ভাল হয় নি। তাই সামলে নিয়ে বলে, না, সে কিছু না। ও এমনি কথার কথা বললাম। দাদাবাবু কি আর হিংসে করবার ছেলে?
তা কোথায় তিনি? কলেজে গেছেন বুঝি?
না, কলেজে নয়। ছুটি হয়েছে তাই মা-বাপের কাছে গেছে। এই বছর শেষ পড়ার পরীক্ষা দেবে।
কৌতূহল সন্দেহজনক কি না, সেটা না ভেবেই প্রশ্ন করে সীমা, সেটা কোথায়? ওই মা বাবার বাড়ি?
সেই যে গো ডেরাডুন না কোথায়। মায়ের দাদা তো মিলিটারি। তা মায়ের দাদাই বা বলছি কেন? তোমার তো মামা হন গো। সবই জানতে পারবে ক্রমশ। ঘরের ছেলে পরের হয়ে ছিলে এতদিন, চেনা-পরিচয় তো কিছুই নেই।
আড়ালে গিয়ে ঝিমহলে কিন্তু এই হৃদ্যতার সুর বজায় রাখে না তারুর মা। বলে, কোথায় কাদের কাছে মানুষ হয়ে এসেছে এতকাল, দিব্যি পাকাচোকাটি হয়ে উঠেছে। এল বটে, ধাড়ি শালিখ পোষ মানলে হয়। বলব কি দাদাবাবুর ছবিখানা যেই চোখে পড়েছে, যেন কাঠ। তারপর নানা জেরা, এ ছবি কার? ছেলে নাকি? ভাইপো, তবু ভাল। তা থাকে কোথায়? …মানে মনের মধ্যে তো খেলছে আমিই সর্বেসর্বা।
রজনী বলে, যাই বল বাপু, সত্যি কথা বলছি, মায়ের আহ্বাদ হয় হোক, আমার কেমন প্রাণের মধ্যে সুর বাজছে না। সেই ছোটকালে আসত তো আসত। এ যেন উড়ে এসে জুড়ে বসা। দাদাবাবুকে কি আর স্থলকূল দেবে?
মানুষ রক্তমাংসের জীব। এ তথ্য সবাইয়ের জানা। শিক্ষিত-অশিক্ষিত আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই বোঝে–এই পরম সত্যকে চোখ বুজে অস্বীকার করা যায় না।
অথচ সুনন্দা সেই চোখটাই বুজে বসে আছে। তাই থাকবে এই পণ।
.
পুজোর শেষে পুজোর ঘর থেকে কুশী ভরে ঠাকুরের চরণামৃত নিয়ে এঘরে আসে সুনন্দা। একটু পেটে পড়ক মেয়েটার, কে জানে কিভাবে মানুষ হয়েছে, কী না কি অখাদ্য খেয়েছে। পদবী তো বলল সেন। জাতটা বোধহয় খারাপ নয়, কিন্তু আচার-আচরণ?
যে মেয়েমানুষ অতবড় পিশাচী, তার আবার আচার-আচরণের কোনও ঠিকঠাক আছে? শিক্ষা-দীক্ষা নিশ্চয়ই ভাল দেয় নি, নইলে অমন মুখখানি, কিন্তু কোমলত্ব নেই। কেমন যেন কাঠ কাঠ ভাব। যাক, সুনন্দা ঠিক করে নেবে। ভালবাসায় বনের পশু বশ হয়, এ তো নিজের পেটের সন্তান।
