কিন্তু ব্রজনাথ তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গকে সামলে নিলেন। বললেন, ওসব তোমার ভাবতে হবে না মা! ওর জন্যে আমি আছি। করতে তো এখন অনেক কিছুই হবে। রায় কোম্পানির এতবড় বিজনেস, এই সব বিষয় সম্পত্তি সব কিছুরই তো মালিক হলে তুমি এখন।
সীমাকে অন্তঃপুরে নিয়ে এল সুনন্দা।
স্নেহটা উথলে উঠতে গিয়ে কেমন যেন পিছিয়ে আসছে। এ যে সম্পূর্ণ আস্ত একটা মানুষ। একে তিল তিল করে গড়ে তোলবার তো কোথাও কোনখানে অবকাশ নেই।
আর, ওর মনের আবরণ? এই কুড়ি বছরের জল হাওয়া পরিবেশ পরিস্থিতিতে গঠিত কঠিন সেই আবরণ ভেদ করে ঢুকতে পারবে সুনন্দা ওর অন্তরে? না কি প্রতিহত হয়ে ফিরে আসবে সুনন্দার হৃদয়? তবু চেষ্টা করতে হবে বৈকি। সে চেষ্টায় জয়ীও হতে হবে সুনন্দাকে।
ছেলের বিয়ে দিয়েও আস্ত একটা মানুষকে তো ঘরে আনে লোকে। তার হৃদয় স্পর্শ করতে চেষ্টা করে।
.
এই তোমার ঘর। কাল সারাদিন ধরে গুছিয়েছি। সুনন্দা ওকে হাত ধরে খাটের ওপর বসাল।
চারিদিকে চোখ ফেলে দেখে সীমা। তার পরিচিত জগতের বাইরের সব বস্তু, বিলাসিতার উপকরণ। এরকম ঘরদোর জানলা মেজে খাট বিছানা আসবাব আয়োজন আর কোথাও দেখেছে সীমা?
দেখেছে। সিনেমার ছবিতে। দৈবাৎ এক আধদিন পরের পয়সায়। তা ছাড়া আর কোথাও না। কি সীমার জীবনটাও তো নাট্যকাহিনীর পর্যায়ে পড়ছে। সিনেমার ছবির মতই আশ্চর্য কাণ্ড ঘটছে।
এই দেখ, এইটে বাথরুম। এর মধ্যে তোমার যা যা দরকার সব জিনিসই পেয়ে যাবে।
সীমা তাকিয়ে দেখে হঠাৎ আড়মোড়া ভেঙে বলে, এসবের কিছুই দরকার হবে না আমার।
দরকার হবে না! দরকার হবে না কেন? সুনন্দা আহত দৃষ্টিতে তাকায়। মেয়েটার এত খটখটে কথা কেন?
সীমা হেসে উঠে বলে, দরকার হবে না কেন জানেন? জীবনেও কখনো ওসব জিনিস চোখে দেখি নি বলে। ব্যবহারই জানি না এত সবের।
ও, এই কথা। সুনন্দার স্নেহের সমুদ্রে জোয়ার ওঠে। আহা বাছা রে! কত কষ্টের মধ্যে মানুষ হয়েছে! কত দুঃখে কাটিয়েছে এতগুলো দিন! কথাবার্তাও ঠিক খটখটে নয়। কৃত্রিমতা বর্জিত, সরল। একেবারে সরল। সুনন্দাও অতএব হাসে।
অভ্যাস হতে আর কতক্ষণ লাগবে? এই তো, এইটা হচ্ছে শাওয়ারের ট্যাপ, এইটা স্নানের টবের
সীমা সেদিকে না তাকিয়েই বলে, আপনার বাড়িতে তো অনেক ঝি-টি থাকবার কথা, নেই? তাদেরই কাউকে পাঠিয়ে দিন না। আপনি কেন এত কষ্ট করছেন?
ঢেউ ফিরে আসে।
সুনন্দা আহত কণ্ঠ গোপন করতে পারে না। বলে, এতে আমার কষ্ট হচ্ছে ভাবছ কেন? আমার কত আনন্দ আজ। আর আমাকে আপনি বলছ কেন? আমি তোমার মা। তুমি বলবে।
নিজেই যে তুই বলতে গিয়েও বলতে পারছে না, তুমি বলছে, সেটা মনে পড়ে না সুনন্দার।
সীমা ওর ওই আহত কণ্ঠে বোধকরি একটু অপ্রতিভ হয়। তাই মাথাটা নীচু করে বলে, সময় লাগবে।
.
সময় লাগবে। সময় লাগবে! কিন্তু সময় লাগলে কি চলে? অনেক সময় যে বয়ে গেছে।
দাসদাসী আশ্রিত অনুগত আত্মীয় প্রতিবেশী সবাই এসে দাঁড়াচ্ছে, দেখছে, প্রশ্ন করছে। অধিক প্রশ্ন করা অবশ্য সুনন্দার নিষেধ। ছোট ছোট প্রশ্ন। নাম কি, কোন্ পাড়ায় থাকতে এতদিন, কতদূর পড়েছ, এই সব।
নাম?–তা নাম তো শুনেইছ সবাই, সীমা।
কোন্ পাড়ায় থাকত? একটা পাড়ায় তো আর আজীবন নয়। পূর্ববঙ্গ থেকে যখন চলে এসেছিল, কত ঘাটের জল খেতে হয়েছিল তখন ওর পালক পিতামাতাকে।
ও মা, কী সর্বনাশ! পাকিস্তানে টেনে নিয়ে গিয়েছিল মাগী?
পাকিস্তানে নয়, পূর্ব বাঙলায়। উনিশ বছর আগে পাকিস্তান কথাটার সৃষ্টি হয় নি।
পড়া? দুটো পাস করেছিল। পয়সার অভাবে আর পড়া হয়ে ওঠে নি।
পয়সার অভাবে? আহা হা! তোরই বাপের পয়সায় কত গরীবের ছেলে লেখাপড়া শিখে, তরে গেল।
না, এর আর উত্তর দেয় না সুনন্দার হারানো মেয়ে, খুঁজে পাওয়া মেয়ে।
আশ্চর্য, যখন খুঁজে খুঁজে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল, তখন পাওয়া গেল না। আর যখন সমস্ত খোঁজার শেষ হয়েছে, তখন–অপ্রত্যাশিত এই পাওয়া।
সীমাকে ওর ঘরে প্রতিষ্ঠিত করে স্বামীর জন্যে বড় কান্না কাঁদল সুনন্দা। সেই যদি পাওয়াই গেল, কটা বছর আগে কেন গেল না? শোভনকে কেন হাহাকার করা প্রাণটা নিয়েই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হল?
কিন্তু না, সুনন্দার আর সে দিন নেই। ইচ্ছেমত পড়ে কদবার।
সুনন্দার জীবনে কর্তব্যের ডাক এসেছে। অপরিচিতাকে আপন করে নিতে হবে। দূরকে নিকট। সুনন্দাকেই ভাঙতে হবে আড়ষ্টতার বাধা। নিজের এবং ওর। নইলে শাস্ত্রে কেন বলেছে স্নেহ নিম্নগামী। সুনন্দাকেই অপর্যাপ্ত স্নেহ ঢেলে ভরিয়ে তুলতে হবে ওর শূন্যতা, ভিজিয়ে তুলতে হবে ওর শুষ্কতা। ওর দিক থেকেই দেখতে হবে সবটা। মায়ের প্রতি অগাধ ভালবাসা এখুনি কোথায় পাবে ও?
.
ব্রজনাথ পরামর্শ দিয়ে গেছেন এখুনি চট করে ওর গত জীবন নিয়ে প্রশ্ন করে কাজ নেই। মনটা কঠিন হয়ে যাবে, বিমুখ হয়ে যাবে। তাছাড়া এত ঐশ্বর্য এত আড়ম্বর জীবনে তো কখনো চোখে দেখে নি, ভিতরে ভিতরে একটা হীনমন্যতা-বোধ আসাই স্বাভাবিক। আস্তে আস্তে সহজ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ওকে ওর বিচ্ছিন্ন শিকড়ের সঙ্গে জুড়তে হবে।
আর একটা কথা। বলেছিলেন ব্রজনাথ, আপনার ভাইপোটি তো এখন ছুটিতে বাড়ি গেছে। তা বলছিলাম কি, প্রথমটা তার হোস্টেলে এসে উঠলেই ভাল হত না?
সুনন্দা অবাক হয়ে বলেছিল, কেন?
