চোখ জ্বলে উঠল উন্মাদিনীর। হাতছানি দিয়ে ডাকল চাকরটাকে।
তারপর ধীরে ধীরে সেই হাতছানি দেওয়া হাত এগিয়ে এল টাকার তোড়া নিয়ে। চাকরটাকে হাত করতে দেরি হল না অতএব।
যে সন্ধ্যায় সেই হিতাহিত জ্ঞানহীনা ধর্মাধর্ম জ্ঞানহীনা নারী ওই ছোট্ট টাউনটা থেকে পালাবে, পালিয়ে গিয়ে মিলিয়ে যাবে একটা বিরাট শহরের অগাধ জনসমুদ্রের মধ্যে, সেইদিন বিকেলে লাল শাটিনের ফ্রক পরে বেড়াতে বেরিয়েছিল টুলু চাকরের সঙ্গে।
অনেক টাকা নিয়ে দেশে চলে যেতে পারলে, বিবেককে দাবানো যায় বৈকি। মহা মহা শিক্ষিত লোক দাবাচ্ছে, ভাল ভাল ন্যায়-নীতিজ্ঞরা দাবাচ্ছে, বড় বড় আইনের ধ্বজাধারীরা দাবাচ্ছে, আর এ তো সামান্য একটা চাষার ঘরের ছেলে।
টাকাটা নিয়ে গিয়ে দেশে বিঘেকয়েক জমি আর দুটো মোষ কিনতে পারলেই তো একজন গৃহস্থ হয়ে বসা যায়। ছেড়ে আসতে হয় না নবপরিণীতা বধূকে, দারিদ্রগ্রস্ত মা-বাপ ভাই বোনকে।
আর? আর জীবনভোর মনিবের জুতো ঝাড়তে হয় না। হয় না সে জুতোর ঠোক্কর খেতে।
সামান্য একটু বিবেকের কামড়। তার বেশি আর কিছু না। মেয়েটাকে মেরেও ফেলছে না, কেটেও ফেলছে না। পথেও ফেলে দিয়ে যাচ্ছে না।
একটা মা-র কাছ থেকে আর একটা মা-র কাছে গচ্ছিত রাখছে।
চাকরটা মনে মনে কী ভেবেছিল, তার ব্যাখ্যা ব্রজনাথই করেন এইভাবে। আরও বলেন, –ব্যাটা বোধহয় ভেবেছিল আপনার তো তবু আবার হবার সম্ভাবনা আছে। এই মানুষটার সে দিনও নেই আর। বয়সে মেয়েমানুষটা নাকি আপনার মায়ের বয়সী।
তারপর কী হল বলুন আগে।
তারপর?
তারপরের কথা তো আর পরপর জানেন না ব্রজনাথ। ব্রজনাথের এক ডাক্তার বন্ধু তার এক রোগিণীর মৃত্যুকালের স্বীকারোক্তির সূত্রে এই নাটকীয় কাহিনী শুনিয়েছিলেন ব্রজনাথকে।
ব্রজনাথকে সব বলে বলেছিলেন, আমার তো মনে হচ্ছে এই মেয়েই আপনার সেই শোভন রায়ের মেয়ে। স্থান-কাল-পাত্র সবই তো মিলে যাচ্ছে হুবহু।
এমন কি মৃত্যুপথযাত্রী নাকি এ কথাও বলেছে–লাল টুকটুকে জামা পরা সেই মেয়েটাকে বুকে চেপে ধরা মাত্র মনে হল, এ যেন আমারই জন্মজন্মান্তরের। লাল টুকটুকে জামাটাও কি মিলে যাবে অন্যের সঙ্গে?
এই সেই মেয়ে। আবার বলেছিলেন ব্রজনাথ।
একবছরের অস্ফুটবাক্ শিশুটি আজ কুড়ি বছরের ভরন্ত যুবতী।
রং? তা সেই দুধে শিশুর গোলাপী রং কি আর বজায় থাকে চিরকাল? তাছাড়া অনেক ঐশ্বর্যে ভরিয়ে রাখবার সংকল্প নিয়ে মেয়ে চুরি করেছিল যে, সহসা নিজেই সে হয়ে গেল গরীব। স্বামী মারা গেল। গেল আরও অনেক কিছু–দুঃখের সাগরে ভাসল মেয়েটাকে নিয়ে।
কিন্তু তার পরিচয়? ডাক্তার জানে না?
ওইটি প্রশ্ন করা চলবে না। সেই ডাক্তার বন্ধু বলেছিল ঘাড় নেড়ে, তা হয় না। সে বলা যায় না। তুমি তো জানো ভাই আমাদের ব্যবসার মূলমন্ত্র। ডাক্তার আর উকিল, এদের পেট আলগা হলে চলে না। রোগীর আর মক্কেলের লুকোনো কথা সযত্নে গোপন করতে হয়।
তা বলে এত বড় একটা অপরাধের কথাও?
তাতে কি। তুমি উকিল, তুমি আবার ধর্মকথা কইছ কোন্ মুখে? খুনীকে সাধু আর সাধুকে খুনী সাজানোই যাদের পেশা।
কিন্তু
ওর আর কিন্তু নেই। বুঝলাম জঘন্য অপরাধ। গর্হিত অপরাধ। কিন্তু আর কি সেই অপরাধিনীকে এনে তোমাদের ধর্মাধিকরণের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারবে? সুপ্রীম কোর্টের অনেক ঊর্ধ্বে আর এক মহাবিচারকের যে বিচারশালা, সেখানের কাঠগড়া আছে তার জন্যে।
সুনিপুণ ভঙ্গিমায় আলঙ্কারিক ভাষায় সমস্ত ঘটনা উদঘাটিত করলেন ব্রজনাথ। জানালেন এখন সম্প্রতি মেয়েটি আছে সেই মৃতা মহিলাটির পরিচিত একটি দরিদ্র পরিবারে। ডাইনে আনতে বাঁয়ে কুলোয় না তাদের, এর উপর আবার একটা পরের মেয়েকে পোষা! যতই মোটা ব্যবস্থায় থাক, তবু
শিউরে উঠেছিল সুনন্দা। তার টুলুর সম্পর্কে এই অবহেলাকর উক্তিতে প্রাণটা করকর করে উঠেছিল তার।
যে সুনন্দার বাড়িতে পাঁচ ছটা ঝি-চাকর রাজার হালে খাচ্ছে মাখছে, সেই তার টুলু রেশনের মোটা চালের ভাত খাচ্ছে, মোটা ক্যাটকেটে শাড়ি পরছে!
তবে হাঁ। সেই পালিকা মা এইটুকু করে গেছেন টুলুর। একটু লেখাপড়া শিখিয়ে গেছেন। নেহাৎ মুখ করে রেখে যাননি। ইন্টারমিডিয়েট অবধি পড়িয়েছিলেন তিনি। তারপর তো হয়েই গেল তার। এখন ওই উদ্বাস্তু কলোনিতে
উথলে উঠেছিল সুনন্দা।
আপনি এখনি নিয়ে আসুন।
ব্রজনাথ বললেন, না মিসেস রায়, সেটা ঠিক হবে না। এতদিনই যখন গেল, একটা দিনে আর–
আপনি কেন এতদিন পরে বললেন?
কী মুশকিল! শোনামাত্রই তো আপনাকে শুনিয়ে একটা এলোমেলো কাণ্ড করতে পারি না। যদি বাজে খবর হয়? যদি অন্য মেয়ে হয়? আপনাকে বৃথা আশায় কম্পিত করেনা মিসেস রায়, সেটা আমি যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করি নি। সব খোঁজ নিয়ে, জেনে বুঝে নিঃসংশয় হয়ে তবে। হ্যাঁ তবেই বলেছেন ব্রজনাথ, এবং একটা দিন প্রস্তুত হতে সময়ও. দিলেন মা মেয়েকে।
.
আজ নিয়ে এসেছেন।
আজ সুনন্দার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলছেন, এই সেই মেয়ে।
এখন কি নাম তোমার?
মেয়েটি এবার মুখ তুলে স্পষ্ট গলায় বলল, সীমা সেন।
না না, সেন নয়। আজ থেকে তুমি রায়।
তাহলে আমার ম্যাট্রিকের সার্টিফিকেট বদলাতে হবে!
সীমার এই স্পষ্ট ধরনের বাস্তব কথায় সুনন্দা কি একটু চমকালো? ভাবল কি, এর মধ্যে টুলু কোথায়?
