ছেলে বড় জিনিস!
দশটি থাকলেও কারও মনে হয় না–অনেকগুলো আছে একটা বিলিয়ে দিই। অথবা আমার তো অনেক আছে, ওর নেই, ওকে দান করি।
দত্তক যারা দেয়, কোন প্রাণে দেয় কে জানে। তবে দিয়েদিলাম না, অথচ আমার ছেলেটিকে কেউ একটু বিশেষ স্নেহের দৃষ্টিতে দেখে প্রাণ ঢেলে দিচ্ছেগুচ্ছে, সেটা মন্দ নয়।
সুনন্দার ভাজও সেই হিসেব হাতে রেখেছেন। এমনিতে তো এঞ্জিনিয়ার ছেলে তার আঁচলতলায় বসে থাকবে না, দেশ বিদেশে ছুটবেই। কাছছাড়া তো হলই পড়ার শুরু থেকে। তা এই কাছছাড়া বাবদ যদি দুর্ভাগিনী ননদটার একটু শান্তি হয়, সেটা মহৎ লাভ। আবার সে বাবদ যদি ছেলেটার ভবিষ্যৎ জীবন পথ আরও মসৃণ হয়, সেটাও কম লাভ নয়।
তাই ক্রমশই উদ্দালক পিসিমার সম্পত্তিতেই পরিণত হচ্ছে।
ছুটি হলে মা বাপের কাছে যায়।
তাও সব সময় পুরো ছুটিটা কাটিয়ে আসে না। সুনন্দার দাদা লেখেন, বালগোপাল তো মা যশোদাকে ছেড়ে থাকতেই পারে না দেখছি, এসেই যাই যাই করছে।
তা সবটাই যে একেবারে পিসিমার প্রতি বিগলিত স্নেহ তাও নয়। কলকাতার খেলাধূলো বন্ধু আচ্ছা, এ বাড়ির সর্বেসর্বা হয়ে থাকার পরিতৃপ্তিময় স্বাধীনতার সুখ, এগুলোও কম কাজ করে না।
এসবের আকর্ষণ অনেক।
তাছাড়া উদ্দালুকের স্বভাব দরদী মন সুনন্দার নিঃসঙ্গতাকে সূক্ষ্ম তারে অনুভব করতে পারে।
কখনো কখনো বারান্দায় বেতের চেয়ার পেতে কখনো কখনো ছাদে পাটি পেতে চুপচাপ শুয়ে থাকে সুনন্দা। যেন আপনাকে অনন্ত শূন্যতার মাঝখানে হারিয়ে ফেলে।
তখন উদ্দালক এসে কাছে বসে। তখন তোলে সেই মেয়েটার কথা। সেই উনিশ বছর আগের কথা।
ও যেন অনুভব করে এই মুহূর্তে এ আলোচনার প্রয়োজন আছে। তাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই সব প্রশ্নই করে, আচ্ছা পিসিমা ছবি নেই কেন?
একটা নিশ্বাস ছড়িয়ে পড়েছিল বাবা, কত ছিল। পুরো একটা অ্যালবামই ছিল। পুলিস থেকে চাইল, তখন আশায় পড়ে বুক ছিঁড়ে দিয়ে দিলাম। আর ফেরত দিল না। কতদিন ধরে ঘোরালো তারপর বলল হারিয়ে গেছে। মেয়েও গেল, তার চিহ্নটুকুও গেল।
আশ্চর্য! আচ্ছা, যে স্টুডিও থেকে তুলিয়েছিলে? তাদের কাছে তো নেগেটিভ থাকে?
সে খোঁজেও ত্রুটি হয় নি বাবা। তোমার পিসেমশাই শেষকালে খুবই চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু দুর্ভাগ্য প্রবল হলে যা হয়। শুনলাম সে স্টুডিওই উঠে গেছে লোকসানের দায়ে। তার মালিকের কোনও পাত্তা পাওয়া যায় নি।
আচ্ছা পিসিমা, তোমার কি মনে হয়?
আগে কত কি-ই মনে হত বাবা, আবার কিছুই মনে হত না। সব কেমন ঝাপসা হয়ে যেত। মারা গেছে, চাকরটার সুষ্ঠু কোনও অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে, ভাবতে চেষ্টা করতাম। কিন্তু ঝাঝার মত অতটুকু টাউনে ওরকম একটা কিছু ঘটলে সে কি চাপা থাকত?
পুকুর-টুকুর ছিল না?
নাঃ, পুকুর কোথা?
শুকনো কুয়ো-টুয়ো
সব দেখা হয়েছিল। লোক লাগিয়ে কাঁটা নামিয়ে।
ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই একই কথা।
আবার একসময় সুনন্দাই বলত, ভাবি সে আমার জিনিস ছিল না। থাকলে থাকত। এখন ভগবান তোকে বাঁচিয়ে রাখুন, সুস্থ রাখুন।
দুধের সাধ কি আর ঘোলে মেটে পিসিমা? হেসে উঠত উদ্দালক।
সুনন্দা বলে–তুই আমার ক্ষীর। আবার একটু পরে হয়ত বলত যাকগে ওসব কথা থাক। তুই বরং একটা গান গা।
গান! আমার আবার গান?
তা হোক। বেশ তো গাস তুই।
তা গায় উদ্দালক। শুধু গলায়। গলা ভাল সেইটুকুই কাজে লাগে।
এইভাবেই চলছিল। হয়ত এইভাবেই চলত। হঠাৎ নিস্তরঙ্গ জলে এসে পড়ল প্রকাণ্ড এক পাথরের চাই।
সে পাথর ফেললেন ব্রজনাথ।
ব্রজনাথ এসে সুনন্দাকে নিভৃতে ডেকে বললেন, অদ্ভুত একটা খবর আছে মিসেস রায়!
কী সেই খবর? যা একা সুনন্দাকে নিভৃতে ডেকে শোনাতে হয়? কারও কোনও ভয়ঙ্কর বিশ্বাসঘাতকতায় কি রায় কোম্পানি দেউলে মেরে যেতে বসল?
প্রথম মুহূর্তে সেই কথাই ভেবেছিল সুনন্দা। সঙ্গে সঙ্গে মনকে প্রস্তুত করে নিচ্ছিল সেই বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনী শোনবার জন্যে! কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনীর পরিবর্তে এতবড় একটা অবিশ্বাস্য কাহিনী শোনাবেন ব্রজনাথ একথা কে ভেবেছিল। উনিশ বছর আগের সেই রহস্যের যবনিকা উত্তোলিত হয়েছে। সেই অন্তহীন অন্ধ প্রশ্নের উত্তর মিলেছে।
একটা অসাড় চিত্তের পৃষ্ঠপটে কে যেন চকিত বিদ্যুতের ঝিলিক হানছে।… আলোর বুদ্বুদ উঠছে মিলিয়ে যাচ্ছে। আলোর কমলের ওপর এসে এসে পড়ছে কুয়াশার আস্তরণ।
বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের আলোছায়া। আশা-নিরাশার আলোছায়া। সুনন্দা ব্যাকুল হচ্ছে।
তারপর কী হল আগে বলুন–বলে বলে চিৎকার করে উঠছে সুনন্দা।
কিন্তু ব্রজনাথ দ্রুতছন্দে আসছেন না। ব্রজনাথ থেমে থেমে রয়ে রয়ে সেই অবিশ্বাস্য কাহিনী ব্যক্ত করছেন।
.
ব্রজনাথ বলছেন, উনিশ বছর আগে ছোট সেই টাউনটায় আরও একজন গিয়েছিল। এক সন্তানক্ষুধাতুরা বন্ধ্যানারী।
কিন্তু কেন গিয়েছিল? হাওয়া বদলাতে? নাকি সুনন্দার সঙ্গে পূর্বজন্মের শত্রুতা সাধতে? ঈশ্বর জানেন গত জন্মে কে কার কাছে অপরাধী ছিল। কে কার নিমিত্ত হল।
বন্ধ্যা নারী। একটি শিশুর বাসনায় উন্মাদ। সেই অতৃপ্ত হাহাকারের উপর আর এক শূন্যতার হাহাকার, স্বামী বিমুখচিত্ত। স্বামী উম্মুঙ্খল।
সেই মন নিয়ে ঈশ্বরের সাধনা করতে পারত সে। পারত লোকসেবায় মন দিতে। কিন্তু তা পারে নি সে। একটি কচি কোমল শিশুদেহের কল্পনা তাকে উন্মাদ করে দিত। সেই উন্মাদনার মুখে, দেখতে পেল টুলুকে। কেমন করে যেন একদিন সুনন্দার চাকর গিয়ে পড়েছিল তাদের বাড়ির সামনের বাগানে।
