সুনন্দা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে–ভালই!
–বলছিস তো ভাল, দেখাতে তো পারছিস না তা? আমার তো এদিকে ছুটি ফুরিয়ে এল, ভাবছি তোকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাই।
–আমাকে? সুনন্দা চমকে উঠে বলে–আমি কোথায় যাব?
–কেন আমাদের কাছে? বাপের বাড়ি যায় না মেয়েরা?
–এখন থাক দাদা!
–কেন এখন থাকবে কেন? এখনই তো দরকার! আমরা চলে যাব, দুলুরও কলেজ খুলে যাবে, আর তুই বসে বসে সেই মেয়েটাকে ভাববি! এই তো!
–দাদা! চমকে ওঠে সুনন্দা।
তীব্রস্বরে বলে–কোন মেয়েটার কথা ভাবব আমি?
দাদা মৃদু হেসে বলেন–যে মেয়েটার জন্যে শয্যা নিয়েছিস! দেহপাত করছিস! তোর ঠাকুর ঘরটাকে পর্যন্ত ভুলে গেছিস।
–কক্ষনো না!
সুনন্দা উত্তেজিত হয়ে উঠে বসে রুদ্ধ কণ্ঠে বলে–কক্ষনো না। কক্ষনো আমি কারুর কথা ভাবছি না! কেন, অসুখ হয় না মানুষের?
–আহা রেগে উঠছিস কেন? শুয়ে পড়, শুয়ে পড়। অসুখ তো হয়ই মানুষের, তবে তার একটা কারণও থাকে।
–সেই পাজী মেয়েটা আমার অসুখের কারণ?
ধপ করে শুয়ে পড়ে সুনন্দা-কক্ষনো না।
দাদা মৃদু হেসে বলেন,–মনকে চোখ ঠেরে লাভ কি বল তো নন্দা? মেয়েটাকে যে তুই বড্ড ভালবেসে ফেলেছিলি সেটা তো আর মিথ্যে নয়?
–আমি বোকা, আমি মুখ, আমি আহাম্মক তাই, তাকে
কথা শেষ করতে পারে না সুনন্দা, বালিশে মুখ গুঁজে শোয়।
দাদা ওকে শান্ত হতে একটু সময় দিয়ে তারপর আস্তে বলেন–মুখ আহাম্মক বোকা আমরা সবাই নন্দা! নিজেকেও আমি কম ধিক্কার দিচ্ছি না। যখন শুনলাম মেয়ে ফিরে পেয়েছিস তুই, তখন অত সহজে সেটা বিশ্বাস না করে সন্দেহ করা উচিত ছিল আমার। আসা উচিত ছিল ছুটি নিয়ে। সে দোষের বিচার করতে হবে বৈ কি। কিন্তু সে তো আলাদা কথা। আসল কথা–তোকে তো বাঁচাতে হবে? তাই ভাবছি কলকাতার এই লোকসমাজ থেকে কিছুদিন সরে পড়া দরকার তোকে নিয়ে। সেই সঙ্গে মেয়েটাকেও নিয়ে যাই।
মেয়েটাকে? মেয়েটাকে নিয়ে যাবে তুমি?
সুনন্দা ক্ষুব্ধকণ্ঠে বলে, আমাকে কি পাগল পেয়ে ঠাট্টা করছ দাদা?
–ছিঃ নন্দা একথা বলছিস কেন? তোর মনের ভেতরটা কি দেখতে পাচ্ছি না আমি?
–দাদা! সুনন্দা ডুকরে কেঁদে উঠে বলে–আর তাকে কোন্ সুবাদে আনতে যাব?
–আহা সে যা হয় একটা সুবাদ তৈরি করে নেওয়া যাবে। মোট কথা, তোর একটু চেঞ্জের দরকার হয়েছে, আর সেই মেয়েটা কাছে না থাকলে তোর কাছে স্বর্গও মিথ্যে!
–দাদা, দাদা গো! সেই পাষাণীকে চেন না তুমি! সে যে কতবড় নিষ্ঠুর, কতবড় কসাই, সে কথা আমি জানি রুদ্ধকণ্ঠে জোর এনে কথা শেষ করে সুনন্দা–আমি মরে গেছি শুনলেও সে দেখতে আসবে না।
দাদা হেসে ফেলে বলেন–মরে গেলে আর মড়াটা দেখতে এসে কী করবে? জ্যান্ত থাকতেই যাতে আসে সেই চেষ্টা দেখি!
সুনন্দা বালিশে মাথা ঘষতে ঘষতে বলে–পারবে না দাদা, পারবে না। মান রাখবে না তোমার। ফিরিয়ে দেবে, আসবে না। বলবে, তোমার বাড়ি যাব কেন? আর সেই পাজী বাপটা নিশ্চয় তাকে আসতে দেবে না! শুধু শুধু তুমি
কথা আর শেষ করতে পারে না সুনন্দা, আরও কেঁদে ওঠে।
আর ভাবতে থাকে, দাদা ছেলেমানুষ! দাদা সরল! দাদা চিরদিন মফস্বলে কাটিয়ে, কলকাতা শহর আর সেই শহরের মানুষরা যে কী বস্তু তা জানে না! তাই দাদা ভাবছে আমার মন ভাল রাখতে আবার তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিয়ে আসবে। অসম্ভব! অসম্ভব! আমি তো জেনেছি সে মেয়েকে।
সুনন্দার বৌদিও বলেছিল–অসম্ভব! হতেই পারে না, অসম্ভব।
কিন্তু সুনন্দার দাদা–নিজ সঙ্কল্পে অটল। সুনন্দাকে একবার নিজের কাছে নিয়ে যাবেন তিনি। আর তার ঔষধার্থে সেই সীমাকে। হয়তো–অনেক প্রতিকূলতার সঙ্গে যুঝতে হবে, তা হোক! কঠিন কাজেই তো রোম্যান্স!
তবে সে রোম্যান্সে সাহায্য নিতে হবে ছেলের। উদ্দালকের!
.
টাকা! টাকা দেখাতে এসেছিল।
ছেঁড়া চটের থলিতে আনা অকিঞ্চিৎকর বাজারটা নামিয়ে দিয়ে যতীন বিকৃত গলায় বলে–কী লম্বাই চওড়াই! কী চান? টাকা? কত টাকা? হাজার? দুহাজার? পাঁচ হাজার? চলুন দিয়ে দিচ্ছি।…দিচ্ছেন টাকা! কি আর বলব, ভগবান মেরেছে, নইলে একটি ঘুষিতে ওই সব বড়মানুষদের লম্বাই চওড়াই ঘুচিয়ে দিতাম।
এই টাকার কথা বহুবার শুনিয়েছে যতীন, তার স্ত্রী কন্যা সকলেরই জানা। স্ত্রী কখনো চুপ করে থাকে, কখনো বলে–জেলে দেয়নি এই ঢের, আবার টাকা দেবে!
সীমা সবসময়ই চুপ করে থাকে।
আজ হঠাৎ সীমা কথা কয়ে ওঠে।
বলে–তুমি যদি ওদের কনডিশান মানতে, দিতই নিশ্চয় টাকা। তা না হলে দেবে কেন?
কনডিশান? কনডিশান আবার কি ছিল?
ক্রুদ্ধ গলা যতীনের। অশান্ত অস্থির যতীন সেন!
সীমা শান্ত! সীমা সেই শান্ত গলায় বলে–যিনি টাকার কথা বলেছিলেন, তিনি পাঁচজনের সামনে দেখাতে চাইছিলেন, তুমি ব্ল্যাকমেল করে টাকা চাইতে এসেছ! তুমি সেটাই স্বীকার করে নিলে দিতেন টাকা।
যতীন গর্জন করে বলে ওঠে–তা সেটা তো স্বীকার করে নিতামই। যাচ্ছিলাম তো তাই বলতে, এই তুমি! তুমি আমার ধর্মের ধ্বজা মেয়ে বলতে দিলে তা? কেন তুমি বলতে পারলে না, ওই আমার পালক পিতা, লোকটার মাথার একটু দোষ আছে! সেইটুকু বললেই মিটে যেত! তা নয় ধর্মিষ্ঠি হলেন মেয়ে। একঘর লোকের সামনে কবুল করে বসলেন–ওগো ওই আমার নিজের বাবা! আমার জন্মদাতা পিতা! বাঁধলেন পুণ্যের ছালা সত্যবাদী যুধিষ্ঠির!
