যতীন-গিন্নী এতক্ষণ নীরবে দাওয়ায় চারটি লাল লাল চাল ঢেলে তার কাকর বাছছিল, এবার মুখ তুলে নিশ্বাস ফেলে বলে–সে কথা আমিও অনেকবার বলি। তুমি মাথা পাগল মানুষ, না হয় অভাবের জ্বালায় ক্ষেপে উঠে একটা নিবুদ্ধিতা করে বসেছিলে, সীমা ইচ্ছা করলেই একটু বুদ্ধি খাঁটিয়ে একটু সামলে নিতে পারত! বলতে পারত-বরাবরই ওঁর একটু মাথার দোষ! তাতে সাপও মরত, লাঠিও ভাঙত না। যুধিষ্ঠির হয়ে তো ভারি লাভ হল! সেই মাগীকেও তো যা নয় তাই অপদস্থে পড়তে হল! অতটা না করলে, পাঁচজনের সামনে হেয় না হলে, নির্ঘাত ওই সীমাকে আবার টানতো, হয়তো মাসোহারা দিত! তা সব দিক থেকে সবই ঘুচল!
একথা সত্যি, সীমা ইচ্ছে করলেই এদের দুঃখু ঘোচাতে পারত, কিন্তু সে ইচ্ছে করেনি সীমা। কোন সময় নাতা এতই যদি ধর্মজ্ঞান, তবে আর গিয়েছিল কেন ঢং করে? জাল করছি অন্যায় করছি, এ তো জেনেই গিয়েছিল।
সীমা মৃদু হেসে বলে–তা সত্যি মা! জেনে গিয়েছিলাম। কিন্তু তার বাইরে তো আর কিছু জানতাম না। মানুষ বলতে শুধু তোমাদেরই দেখেছি আজীবন, অন্য আর এক রকমের মানুষ দেখলাম গিয়ে। দেখলাম সেই মানুষের সংস্পর্শে এসে সাপ ব্যাং-ও বদলে যেতে পারে।
–তাই বদলালে!
যতীন সেন ব্যঙ্গতিক্ত স্বরে বলে–চোরের মেয়ে সাধু হলে! অথচ অতটা সাধু না হলে, হাজার দুহাজার ঘরে আসতই সেদিন!
সীমা হঠাৎ হেসে ফেলে বলে–সে আপসোস যে তোমার আর যাচ্ছে না বাবা? মনে কর স্বপ্ন দেখেছ একটা। যেমন ছিলাম আমি তোমার ঘরে, বরাবর তেমনই আছি!
মনে করব!
যতীন সেন ক্ষুব্ধ রুক্ষ গলায় বলে-করতাম মনে, যদি পেটে দুটো ভাত পড়ত ঠিক সময়ে।
–তা তুমি তো কিছু করতেই চাও না বাবা! বললাম কর্পোরেশনে একটা কাজ রয়েছে
কাজ! সেই রাস্তায় রাস্তায় ডি ডি টি ছড়িয়ে বেড়ানোর কাজ? সেই কাজ তো? বাপকে ওই চাকরি করতে বলতে লজ্জা করল না তোর?
-কেন? লজ্জা করবে কেন বাবা? তবু তো সৎপথ। সর্বদা ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকতে হবে না, ওই পুলিস এল বলে–
কথা শেষ হবার আগেই সীমার ছোট ভাই অরুণ হঠাৎ বাইরে থেকে ছুটতে ছুটতে এসে চাপা গলায় বলে বাবা পুলিস!
–অ্যাঁ। তার মানে? পুলিস কি?
–পুলিসই তো! নইলে জিগ্যেস করবে কেন,–খোকা জানো তুমি এখানে যতীন্দ্রনাথ সেন বলে এক ভদ্রলোক কোথায় থাকেন?
–পুলিসের পোশাক?
না তা নয়, এমনি। কিন্তু পুলিস নইলে তোমায় খুঁজবে কেন? অবলীলাক্রমেই কথাটা বলে ছেলেটা।
পুলিস ব্যতীত আর যেন কেউ তার বাবাকে ডাকবে না, ডাকতে পারে না, এই তার ধারণা।
সীমা বিরক্ত স্বরে বলে-পুলিস ছাড়া আর কেউ ডাকতে পারে না? অসভ্য ছেলে!
সীমার মা বিরক্ত কণ্ঠে বলেন–তা ওকে বলে কি হবে? কর্তা পুরুষ নিজেই রাতদিন পুলিসের ভূত দেখছেন, ওরা তাই শুনছে তো?
সীমা আরও বিরক্ত গলায় বলে–ভূতই তো হয়েছি মা আমরা! নতুন ভূত আর কি দেখব? যা অরুণ, বলগে যা, দেখিয়ে দিচ্ছি–
–এই সীমা খবরদার!
যতীন বলে–যেতে হবে না কারুর। ঘুরে মরুক সে! আমার হুকুম, কেউ যাবে না।
সীমা চুপ করে যায়।
বাবার এই হুকুমের ওপর আর কি বলা চলে? আর বলার দরকারই বা কি?
সীমা ভাবে, অচেনা একজন ভদ্রলোক যদি যতীন সেন নামক লোকটার সন্ধান জানতেই চেয়ে থাকে, সীমার কি?
সীমার বুকটা কেঁপে উঠেছিল বলেই তো আর কপার কোনও কারণ ঘটেনি!
অতএব সীমা চুপ করে যাবে। চুপ করে থাকবে। চুপ করিয়েই রেখেছে নিজেকে।
ভিতরটা যখন উত্তাল হয়ে ওঠে, অকারণ খানিকটা কাজ করতে বসে। মোটা রূঢ় কাজ। হয়তো কয়লা ভাঙা, হয়তো সাবান কাঁচা, হয়তো বা উঠোনের মাটি খুঁড়ে গাছ লাগানো।
.
জবর দখল কলোনীতে এই সুখটুকু আছে। মাটির উঠোন! মা বসুমতীর স্পর্শ! গরীবের কাছে এ স্পর্শটুকু পরম মূল্যবান। গরীবের নিত্য আহার্যের তালিকায় যারা আসর জমায়, সেই লাউ কুমড়ো পুঁই শিম, ঢ্যাঁড়স, উচ্ছে, ইত্যাদি আনাজের রাজ্যের সেই সিডিউল কাস্টেরা সহজেই ওই সামান্য, মাটির স্নেহেই জন্মলাভ করতে পারে, বাড়বাড়ন্ত ফসলে মাটির ঋণ শোধ করতে পারে।
মন উত্তাল হয়ে উঠলেই সীমা উঠোনের ওই গাছগুলোর পরিচর্যা করে। ঘোট ভাইটা একদিন বলেছিল–দিদি এত গাছ করিস, রজনীগন্ধা গাছ করবি? আমার একটা বন্ধু বলেছে নিস তো দেব।
সেদিন সীমা হেসে উঠেছিল।
বলেছিল, রজনীগন্ধা? আরে দূর! ওর ডাঁটায় কি চচ্চড়ি রাঁধা যায়?
ছোট ভাই সতেজে বলেছিল, সব জিনিসই কি খেতে হবে? দেখতে ভাল নয় রজনীগন্ধা?
সীমা ওর রাগে হেসেছিল। বলেছিল, দেখতে ভাল জিনিস গরীবের জন্যে নয় রে! গরীবের সব জিনিসই খেতে হয়! সব সব!
.
সে যাক, আপাতত বাইরে কোথাও কেউ একজন যতীন সেন নামক ভদ্রলোকের ঠিকানা খুঁজে বেড়াচ্ছে এবং যতীন সেনের হুকুম হয়েছে কেউ তাকে সে ঠিকানা দেখিয়ে দেবে না।
তা হুকুম আর কার উপর হয়েছে?
মাত্র যতীন সেনের নিজের এক্তারের লোকগুলোর ওপরই তো? কিন্তু কলোনীতে কি আর কোনও লোক নেই? তারা জানে না যতীন সেন কোন্ কুঁড়েটায় থাকে?
অতএব সেই একজন একটু পরেই এই কুঁড়ের উঠোনে এসে দাঁড়ান।
–কে? না বলে কয়ে ভদ্রলোকের বাড়িতে-বলে তেড়ে এগিয়ে এসেই থতমত খেয়ে যায় যতীন সেন।
ভদ্রলোক হাত তুলে নমষ্কার করে হাস্যবদনে বলেন, কী মশাই, কী রাগ আপনার? সেই চলে এলেন আর গেলেন না? আমি এদিকে টাকাটা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি।
