তাই এমন অদ্ভুত কথাটা বলে বসেন?
বলেন–তা সেটাও একটা কারণ বৈ কি! ওর অতখানি আনন্দ আর বিশ্বাসের ওপর হাতুড়ি বসাতে বেধেছিল হয়তো।….কিন্তু দুলু, শুধুই কি পিসির জন্যে? আর কারও জন্যে নয়?
চমকে মুখ তোলে উদ্দালক।
বাপের দিকে তাকায়। বাপের সেই স্থির নির্নিমেষ দৃষ্টি সহ্য করতে পারে না, আবার চোখ নামায়।
তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে মায়ের মুখ, তীব্র হয়ে ওঠে দৃষ্টি!
তারপর সহসাই বলে ওঠেন–তা বটে। জানাই যখন হয়ে গেছল পিসির মেয়ে নয়, বাধা কি আর?
উদ্দালক কি আবার চমকে ওঠে?
না কি উদ্দালক মায়ের দিকে অমন অপলকে তাকায় শুধু শুধুই? কয়েকটা সেকেণ্ড!
মায়ের চোখের দিকে বরং তাকানো যায়, যায় না বাপের চোখের দিকে।
.
যায় না বলেই হয়তো পিসির রোগশয্যার পাশে আত্মগোপন করেছে সে আজ কদিন। সদা সন্ত্রস্ত ভঙ্গীতে রোগীর ঘরে থাকলে, কে তাকে প্রশ্নে জর্জরিত করতে আসবে?
হ্যাঁ, সেদিন থেকে একেবারে শয্যা নিয়েছে সুনন্দা। রক্তচাপ, দুর্বলতা, বুক ধড়ফড়, অরুচি, অক্ষুধা, ইত্যাদি বহুবিধ অসুখে শুয়ে পড়েছে সে।
বুক ভেঙে যাওয়া বলে চলতি একটা কথা আছে না? অর্থ কি তার? সুনন্দার কাছে কি সে তার অর্থ নিয়ে এসে হাজির হয়েছে?
সুনন্দার ঘরের সঙ্গেই লাগোয়া ঘরখানা ছিল সীমার, সে ঘরের দরজা আজ কদিন বন্ধ রাখা আছে।
দরজা হাট করা ঘরের শূন্যতাটা বড় বেশি স্পষ্ট আর প্রকট হয়ে ওঠে। সুনন্দা হাহাকার করে বলেছে সে কথা। সেই বন্ধ দরকার দিকে তাকিয়ে উদ্দালক মনে মনে অদ্ভুত একটা ক্ষুব্ধ হাসি হাসল।…বেশ মজার নিয়ম আমাদের সমাজের! শ্রদ্ধা ভক্তি স্নেহ ভালবাসা সবাই আসন পাবে, সবাই মর্যাদা পাবে, তাই নিয়ে যত বাড়াবাড়ি আতিশয্যই কর না কেন, নিন্দনীয় হবে না, কিন্তু প্রেম?
খবরদার! খবরদার! নাম কোরো না–নাম কোরো না। সে কখনোই ওই হৃদয় বৃত্তিদের কাছে বৃত্তি পাবে না। প্রেম অপাঙক্তেয়, প্রেম নিন্দনীয়, প্রেম লজ্জাকর!
অতএব এ বাড়িতে সবচেয়ে সহজ আর সাধারণরূপে থাকতে হবে উদ্দালককে। উদ্দালকের পক্ষে সম্ভব নয় একবার ওই বন্ধ কপাটটার ওধারে গিয়ে বসে! দেখে কোথায় কি জিনিস কেমন করে ছড়িয়ে রেখে চলে গেছে সীমা।
সীমা যখন সাজগোজ করে নীচের তলায় নেমে গিয়েছিল, তখন তো ভাবেনি, আর সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠবে না সে।…ভাবেনি। ভাবেনি, যেসব প্রসাধন বস্তুগুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে গেছে, জীবনে আর কোনদিন সেগুলোয় হাত দেবে না।
সকালবেলাও একসঙ্গে খেয়েছিল সবাই। সুনন্দার আদরের টুলুর ভাত খাবার রূপোর সেই থালাটা বাসনের আলমারির এক পাশে পড়ে আছে বোধহয় ধূলোপড়া হয়ে।…
সীমার আলনায় যে শাড়ীগুলো ঝুলছে, সেগুলো রাখার সময় কি সীমা স্বপ্নেও ভেবেছিল, অনন্তকাল ধরে ঝুলেই থাকবে ওইগুলো? যেখানে যেমন রেখে গেল সে, সেখানে তাই থাকবে চিরকাল? আর সব কিছুর ওপর দরজাটা বন্ধ করে দেওয়া হবে?
সুনন্দা কেঁদে কেঁদে শয্যা নিয়েছে, সেটা দুঃখবহ, উদ্দালকের চোখটা ভিজে এলে তা হাস্যকর।
আর একবার ভাবল উদ্দালক। অদ্ভুত সমাজ আমাদের! জগতের মধ্যে যে বস্তু সবচেয়ে পবিত্র, সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে শুভ্র, সেই বস্তুই লজ্জার। একান্ত লজ্জার।
উদ্দালকের শরীরে লজ্জার বালাই ছিল না, এখন উদ্দালককে লজ্জা শিখতে হয়েছে।
নইলে সমাজে নিন্দনীয় হতে হবে উদ্দালককে। লোকে বলবে বেহায়া! বলবে অসভ্য!
আর উদ্দালকের মা বাপ উদ্দালকের দিকে অন্তর্ভেদী দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন
কিন্তু উদ্দালক তো শিশু নয়?
সে কি একবার সীমার কাছে গিয়ে দাঁড়াতে পারে না? বলতে পারে না, সমস্ত সংসার তোমায় ত্যাগ করে করুক, আমি আছি তোমার পাশে!
বলতে পারে না–সীমা, তোমার জালের জাল ভেদ করে সত্য মূর্তিতে এসে দাঁড়াও সকলের সামনে, সেদিনের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে দাও আমায়!
পারত হয়তো।
কিন্তু বাদ সেধেছে সুনন্দা। প্রতি মুহূর্তে যায় যায় অবস্থা ঘটিয়ে! সারাক্ষণ বাড়িতে আটকে রেখেছে!
তবে সন্ধান সে জানে সীমার। জানে কোন্ কলোনীতে থাকে যতীন সেন।
ইচ্ছে করলেই যেতে পারে। কিন্তু এখন সে ইচ্ছে করছে না উদ্দালকের।
মা বাবা ফিরে যান, তারপর দেখা যাবে।
তাছাড়া সীমা একটু স্থির হোক, একটু শান্ত হোক!
নিজেকে তাই কদিন আটকে রেখেছে উদ্দালক এই রোগশয্যার পাশে! আর অবিরত মনে মনে মহলা দিচ্ছে সেই কথাটির, যে কথাটি প্রথমেই গিয়ে দাঁড়িয়ে বলবে সীমাকে।
সীমা, অনেক তো হল, এবার চলো!
সীমা কি উত্তর দেবে সেটাও মনে মনে আন্দাজ করে। অভিমানী সীমা অবশ্যই কঠিন মুখে। বলবে, কোথায় যাব?
তার উত্তরে উদ্দালক বলবে, আমার কাছে, আমার ঘরে।
হ্যাঁ, এই কথাটিই ভেবে ঠিক করে রেখেছে উদ্দালক।
আর সেই ঘরটিও ঠিক করছে মনে মনে।
মা বাবার চলে যাবার আগের দিন সব কথা খুলে তাদের কাছে বলবে উদ্দালক। নিজের সব। তারপর প্রশ্ন করবে, এখন বল, এই জালিয়াত মেয়েকে ঘরে নেবে কি না! যদি না পারো, যদি তোমাদের মন ঘৃণায় বিদ্বেষে কঠিন হয়ে ওঠে, জোর করব না তোমাদের ওপর, কিন্তু আমাকে ছেড়ে দিতে হবে মা! উপায় নেই আমার। আমি আমার হৃদয়ের কাছে বদ্ধ, বিবেকের কাছে বদ্ধ।
.
উদ্দালকের মা-বাপও কিছু ভাবছিলেন বৈকি। ছেলের দিকে তীক্ষ্ণ লক্ষ্য রেখে অনেক কিছুই ভাবছেন তারা। সেই ভাবনার শেষে একদিন বোনের কাছে এসে বসলেন সুনন্দার দাদা। সস্নেহ কণ্ঠে বললেন–আজ কেমন আছিস রে নন্দা?
