একটা গিন্নীমত কে যেন বলে উঠেছিল, থাক থাক গায়ের গহনাগুলো আর ফেরৎ দিচ্ছ কেন বাছা! যে মানুষ দিয়েছে ওসব, সে কখনই দেওয়া জিনিস ফেরৎ নেবে না। ও তুমি যেমন পরে আছ থাকো।
পাজী মেয়ে সে কথা না শুনে গলা থেকে হাত থেকে কান থেকে খুলে খুলে তার সামনেই ফেলে দিয়ে চলে এল! কেন, থাকলে তো সেগুলো ভাঙিয়েও কিছুদিন চলতো! মেয়ে তো নয় শত্রু! পরম শত্রু!
সীমার মা দেখল দামী একখানা শাড়ী পরে এসে দাঁড়াল মেয়ে ন্যাড়া হাতে ন্যাড়া গলায়। এসেই বলে উঠল–মা ছেঁড়া খোঁড়া নেই একখানা কিছু তোমার? দাও না, পরে লজ্জা নিবারণ করি।
–শাড়ী! আমার ভেঁড়া শাড়ী পরে লজ্জা নিবারণ করবি তুই?
ডুকরে কেঁদে উঠল সীমার মা।
–ওই হতভাগা সর্বনেশে বুঝি সব ফাস করে ফিরিয়ে নিয়ে এল তোকে? ওরে একী লক্ষ্মীছাড়া বুদ্ধি হল ওর? তবু তো একটা পেটও অন্যত্র ভরছিল। আবার সেই বুড়ীর কুলতলায় এসে জুটল। এখন কিনা মেয়ে আমার পুরনো ছেঁড়া ন্যাকড়া পরে লজ্জা নিবারণ করবে!
সীমা ততক্ষণে ঘরে ঢুকে পরনের সেই ক্রেপ বেনারসীর শাড়ীটা ছেড়ে সত্যিই মায়ের দরুন শতজীর্ণ একখানা শাড়ী পরে এসে দাওয়ায় দাঁড়িয়েছিল। মায়ের কথার শেষাংশে অদ্ভুত একটা তিক্ত করুণ হাসি হেসে বলে ওঠে–আশ্চর্য! আস্ত এতবড় একখানা মেয়ে বেচে কিছুই পাওনি তোমরা? উকিল বুড়ো এতই ঠকিয়েছিল তোমাদের?
যতীন সেন তীব্র স্বরে বলে–ঠকাবে না কেন? বিশ্বসুদ্ধ লোকই ঠকাবে। ভগবান যাকে ঠকিয়েছে, তাকে আবার জেতাবে কে? তুমি মেয়ে হয়ে ঠকালে না বাপকে? এই যদি তুমি এতদিনে একবারও মনে ভাবতে তাইতো বাবা আমায় পাঠিয়েছে কেন, তাহলে আজকের এই কেলেঙ্কারিটা ঘটতো?…ঘটতো না। এখন পাঁচজনের সামনে উদারতা দেখিয়ে ছেড়ে দিল, সত্যি ছাড়বে ভেবেছিস? এই যদি না বাপ বেটিকে সাতটি বছর শ্রীঘর বাস করতে হয় তো কি বলেছি। মানুষ জাল করা অমনি নয়!
সীমা দাওয়ার ধারে পা ঝুলিয়ে বসেছিল, সেই অনেক দিন আগের মত খুঁটিতে মাথা ঠেকিয়ে। এখন মাথাটা সোজা করে বলে–তাই বা মন্দ কি বাবা? দুদুটো লোকের সাত সাতটা বছরের মত অন্নচিন্তা ঘুচবে। আমাদের সদাশয় গভর্মেন্ট হয়তো বা দয়ার পরকাষ্ঠা দেখিয়ে তোমার নাবালক ছেলে মেয়েদের এবং অসহায় স্ত্রীর জন্যে কিছু মাসোহারারও ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। সব দিক দিয়েই লাভ!
ভালই হল! সীমার মা তেতো হাকুচ গলায় বলে লাভের মধ্যে এই হল, দুদিন বড় মানুষের ভাত খেয়ে এসে আরও চ্যাটাং চ্যাটাং কথা শিখল মেয়ে। এখন ওই বাক্যি বুলি শোনো বসে বসে। এত মেয়ে মানুষের মরণ হয়, আমার কেন মরণ হয় না তাই ভাবি।
সীমার পিঠোপিঠি বোনটা বলে উঠেছিল–হবে কেন? ভগবানের দয়া হাড়ে হাড়ে টের পাবে কে তাহলে? এখনো কত বাকী!
বড় মানুষের ভাত না খেয়েও বাক্যি বুলিতে যে সেও কিছু কম যায় না, সে কথা মনে পড়ে না তার মার।
.
এই।
এই হল প্রথম দিনের অভ্যর্থনার নমুনা। তারপর গেছে কয়েকটা দিন। কাটা হয়ে থেকেছে যতীন সেন কখন পুলিস আসে। তারপর ক্রমশ ভয়টা ঝাপসা হয়ে গেছে।….চলছে দিন।
সীমাকে কলোনীর সকলের কাছে জনে জনে বলতে হয়েছে তার যাওয়া আসার ইতিহাস। কিন্তু ওর কথা বিশ্বাস করবে কে? ও যদি বলে নিজের ইচ্ছেয় চলে এসেছে সে, আর ভাল লাগছিল না বলে, সেটা কি বিশ্বাসযোগ্য কথা?
তবু সবাই এখনো দেখা হলেই সকৌতূহলে প্রশ্ন করে–আচ্ছা তারা আর খোঁজ খবর করেনি?…আশ্চয্যি বাবা! একটা মায়া মমতাও তো পড়ে মানুষের? একটা জীব জন্তু পুষলেও পড়ে। বড়লোকদের প্রাণই আলাদা!
বলছে। বলে বড় সুখ পাচ্ছে।
সীমা নির্বিকার!
সীমা কলতলার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে কল খালি হওয়ার অপেক্ষায়। এ যেন কোন এক পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছে সীমা তিলে তিলে। মা কাড়াকাড়ি করে বাসন নিয়ে, সাবান সেদ্ধ কাপড় নিয়ে, সীমা ছাড়ে না। চিরদিনের জেদী মেয়ে সীমা!
মা বলে–মরবি নাকি খেটে খেটে?
মেয়ে হেসে উঠে বলে–পাগল হয়েছ? এক্ষুণি মরব মানে?
***
–আমি জানতাম।
উচ্চারণ করেছিল উদ্দালক যেন নির্লিপ্ত নির্মমের মত।
জানতাম! অনেকদিন থেকেই জানতাম! সব বলেছিল আমায় সীমা। পুলিসে দিতে হলে আমাকেই আগে দিতে হবে।
উদ্দালকের মা রুদ্ধ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে প্রশ্ন করেছিলেন–তুই জেনেছিলি? তবু প্রকাশ করিসনি?
–নাঃ!
–কেন? কেন এমন অন্যায় হতে দিয়েছিলি দুলু? বিষগাছের শেকড় আরও গম্ভীর হতে দিয়েছিলি কেন?
–পারিনি, বলতে পারিনি মা! হতভাগা মেয়েটা প্রতিদিন বলেছে প্রকাশ করে দেবে, বিদায় নেছে! আমিই ঠেকিয়ে রেখেছিলাম।
–কিন্তু আমি তো এর অর্থ বুঝতে পারছি না দুলু? কী উদ্দেশ্য ছিল তোর? রাস্তার একটা লোক এসে তোর পিসিকে ওই রকম সর্বনেশে ঠকানো ঠকাচ্ছিল, আর তুই তাতে সাহায্য করছিলি?
–পিসির জন্যেই।
–পিসির জন্যেই?
উদ্দালকের মা উদ্দালকের মুখের থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়েছিলেন– শুনছ কথা? পিসির জন্যেই পিসিকে ঠকাতে সাহায্য করছিল ও। তার মানে, একটা মাটির ঢেলা নিয়েই যদি শালগ্রাম ভেবে মত্ত থাকে তো থাকুক, এই তত?
সুনন্দার সেই তুলনাটাই সুনন্দার ভাজ ব্যবহার করেন।
সুনন্দার দাদা ছেলের মুখের দিকে তাকান। তার অন্যদিকে ফেরানো মুখের দিকে।
কী দেখেন তিনি ছেলের মুখে?
