যতীন একবার জ্বলন্ত দৃষ্টিতে ব্রজনাথের দিকে তাকায়, ভাবে ওই বুড়োই নিশ্চয় আমায় ফাঁদে ফেলবার তাল করছে, নিজে এর ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাবে। নইলে এক কথায় টাকা দিতে রাজী হয়? পরীর গল্প না কি! আর কিছু না, বাইরে বার করে নিয়ে গিয়ে দুঘা রদ্দা দিয়ে ছেড়ে দেবে।…তবে গেট বন্ধ, আর ওই মহিলাটি তো উগ্রচণ্ডী হয়ে রয়েছেন। মেজাজ দেখিয়ে লাভ নেই। টাকা দেবে, এ হতেই পারে না। তবু দেখাই যাক! এক মাঘে তো শীত পালায় না।
তাই ব্রজনাথকে ভস্ম করে ফেলবার ইচ্ছে পরিত্যাগ করে ব্যাজার ভাবে বলে,–টাকা যে কত দেবেন বোঝাই গেছে। বেশ চলুন!
.
-না।
সীমা এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল, যেন এই ঘরভর্তি লোকের কাউকে দেখতে পাচ্ছিল না। শুনতে পাচ্ছিল না কারও কথা! এখন শুনতে পেল। তাই এগিয়ে এসে শান্তদৃঢ় গলায় বলল–না!
সুনন্দা সেই ক্লান্ত কণ্ঠে জোর এনে বলে–সব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রায় কোম্পানীর বিরাট সম্পত্তি তিলে তিলে গ্রাস করে আশা মিটছিল না ওঁর, তাই জাল পেতে–থেমে যায়, রুদ্ধকণ্ঠ পরিষ্কার করে নিয়ে আবার বলে–এদের যেতে দে দুলু, ওঁকে আটকা।
.
টাকাটার কথা তাহলে ফাঁকা?–মরিয়া যতীন সেন ব্যঙ্গহাসি হেসে কটু প্রশ্ন করে। এবং সমবেত অভ্যাগতরা এইবার হৈ হৈ করে ওঠে–টাকা! আবার টাকার নাম করতে লজ্জা করছে না? অনেক ভাগ্য যে ছাড়া পাচ্ছ, নইলে দশবছর ঘানি ঘোরাতে হত!…আমাদের কিন্তু মনে হচ্ছে মিসেস রায়, ছেড়ে দেওয়াটা ঠিক হবে না। এই জাল মেয়ে আর তার বাবা দুজনেরই রীতিমত শাস্তি পাওয়া দরকার। মেয়েটি তো শিশু নয় যে, না বুঝে কিছু করেছে। এ সব মেয়ে সমাজ ধ্বংসকারী আগুন! কোনও সেন্টিমেন্টের মুখ চেয়ে একে ক্ষমা করা যায় না। ক্ষমা করা উচিত নয়।….
অনেকের কণ্ঠ হতে ঝরে পড়ে কথাগুলো নানা আকারে।
সুনন্দা সকলের দিকে তাকায়।
তারপর ক্লান্ত গলায় বলে জানি। মানছি তোমাদের যুক্তি, তবু জিগ্যেস করি, যদি তোমরা কখনো ভুল করে শালগ্রাম ভেবে একটা পাথর নুড়িকে পূজোর সিংহাসনে বসিয়ে অনেক দিন ধরে পুজো কর, ভুলটা ধরা পড়লে কি সেই নুড়িকে সিংহাসন থেকে টেনে এনে জুতোর তলায় মাড়াতে পারো? বল পারো কি মা? বল? বল?
.
না, বলতে সেদিন পারেনি কেউ–হ্যাঁ পারি মাড়াতে!
বলতে বলতে আরক্ত-মুখ সুনন্দা বাড়ির মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল, খোলা গেট দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল যতীন সেন আর সীমা, বেরিয়ে গিয়েছিল ব্রজ উকিল।…তবে সুনন্দার দাদা কঁচা কাজ করেননি, খবর দিয়ে রেখেছেন পুলিসের ঘরে, পাশের ঘরে গিয়ে ফোনের রিসিভার তুলে।
আসল আসামী জালে পড়লে, ওদের জন্যে ভাবতে হবে না। ঠিক ধরা পড়বে, সীমা–আর সীমার বাপ। এখন সুনন্দা ভয়ানক একটা সেন্টিমেন্টের বশে ছেড়ে দিচ্ছে, দিক। শাস্তি ওদের পেতেই হবে।
৪. সেই শাস্তি
কিন্তু কতটা সেই শাস্তি?
অন্তত সীমার জন্যে কতটা শাস্তি ধার্য করতে পারবে আদালতের আইন আর বিচার?
আবার যতীন সেনের কলোনীর বাড়িতে ফিরে এসে নিঃশব্দে বাসন মাজা, রান্না করা, সাবান কাঁচার চাইতেও বেশি? তাই করছে এখন সীমা, সব কাজ করছে মাকে ছুটি দিয়ে।
বলছে–আমি তো অনেকদিন আরাম খেয়ে এলাম, ভাল ভাল খেয়ে গায়ে জোর করে এলাম, এইবার খাটি।
এ খাটুনির সঙ্গে কর্পোরেশনের স্কুলের সেই চাকরিটাও যোগ হল। বাইরে গিয়েছিল সীমা মাস কতকের জন্যে, তাই বলে চাকরিটা আর ফিরে পাবে না?
না, স্কুলের ওরা জানে না কোথায় গিয়েছিল সীমা। কলোনীর এরা জানে।
পদ্ম রাধা নীলা স্বপ্ন, আর তাদের বাড়ির সকলে। জানে পাড়ার সবাই।
কোন এক বড়লোকের গিন্নী নাকি হঠাৎ কোথায় সীমাকে দেখে ভালবেসে ফেলেছিলেন, তাই বলে কয়ে বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন পুষবেন বলে। বিধবা গিন্নী, পুরুষশূন্য বাড়ি, তাই আপত্তি করেনি সীমার মা বাপ। ভেবেছিল থাক, একটা মেয়েই খেয়ে পরে ভালভাবে থাক।
অবিশ্যি এ আশাও ছিল, মেয়েটা চালাকি করে গিন্নীর কাছ থেকে কিছু কিছু হাতিয়ে এনে ভাই বোন মা বাপকে দেবে থোবে। কিন্তু সে আশায় ছাই দিয়েছে মেয়ে।
নিজের মান বজায় রাখতে কিছু চায়নি কিছু নেয়নি। অতএব কিছু দেয়ওনি। সেই যা। একদিন
সে তো এরা সবাই দেখে গেছে, শুনে গেছে, গালে হাত দিয়েছে। ছি ছি করেছে।
তারপর?
তারপর যা স্বাভাবিক তাই হয়েছে।
শখ মিটে গেছে গিন্নীর। কি বুঝি একটু রাগ হয়েছিল, একবস্ত্রে বিদেয় দিয়েছে।
দেবেই তো। কথাতেই তো আছে বড়র পীরিতি বালির বাঁধ, ক্ষণে হাতে দড়ি, ক্ষণেক চাঁদ! শখ হয়েছিল হাতে চাঁদ দিয়েছিল। এখন যে হাতে দড়ি না দিয়ে শুধু বিদেয় দিয়েছে এই ঢের বলতে হবে।
ঘুচে গেল রাজকন্যেগিরি!
নাও এখন হাভাতে যতীন সেনের ঘরে এসে মোটা চালের ভাত রাঁধো, আর রাস্তার কলে গিয়ে কানা-ভাঙা চটা-ওঠা কলাই-করা বাসন মাজো!
.
–অহঙ্কারের ফল ফলে বুঝলি দিদি!
বলেছিল সীমার পিঠোপিঠি বোনটা! যেদিন ফিরে এসেছিল সীমা বাপের হাত ধরে।
সেদিন মরিয়া যতীনের তেজ করে বেরিয়ে যাবার পর থেকে দুর্গানাম জপ করছিল বসে বসে যতীনের বৌ। আর ভাবছিল, হে ভগবান ওর যেন পথে থেকে মতি ফেরে। যেন গিয়ে রাগারাগি করে সত্যি সব প্রকাশ করে না দেয়।
কিন্তু ভগবান যথারীতি তার কথা শুনলেন না।
মেয়ে নিয়ে ফিরে এল যতীন রাগে ফুলতে ফুলতে। লক্ষ্মীছাড়া মেয়েটা কিনা গায়ের গহনাগুলো পর্যন্ত খুলে খুলে ফেলে দিয়ে এল!
