উদ্দালক অনুভব করছে এ সময় সীমার কাছে গিয়ে তাকে কথার জালে নিবৃত্ত করতে যাওয়াটা হবে পাগলামী। সে চেষ্টার ফল হবে সীমার সঙ্গে উদ্দালকের নিবিড় আর গভীর সম্বন্ধটুকু ফঁস হয়ে যাওয়া।
তাই উদ্দালক তাকিয়ে থাকে নিরুপায় দর্শকের দৃষ্টিতে।
তাকিয়ে দেখে আরক্তমুখ সুনন্দা রুদ্ধকণ্ঠে বলছে,
-তবে? তবে যে ব্রজনাথ বাবু
–সবে মিথ্যে কথা, সব গল্প! বানানো কাহিনী!
–সব বানানো কাহিনী?
সুনন্দার কপালের শির ফুলে উঠছে, সুনন্দা তাকিয়েও দেখছে না তার নিমন্ত্রিতদের দিকে, সুনন্দা তীব্রস্বরে বলে চলেছে–বানানো কাহিনী? কেন? কেন? কেন?
সীমা অচঞ্চল–কেন, বুঝতে পারছেন না? আপনার অগাধ টাকা, আপনার উত্তরাধিকারিণী সেজে এসে বসলে, সে টাকা আস্তে আস্তে চলে যাবে এই যতীন সেনের হাতে, ওই আপনার পরম হিতৈষী ব্রজবাবু উকিলের হাতে। তাদের সাজানো পুতুল সিন্দুকের চাবি হস্তগত করে ধরে দেবে তাদের কাছে, ধরে দেবে রায় কোম্পানীর মালিকানা।…বুঝতে পারছেন এবার?…ও কি ব্রজবাবু ওপাশ থেকে সরে পড়ছেন কেন চোরের মত? বসে থেকে নাটকের শেষ দৃশ্যটা দেখুন? অভিনয়টা বেশ জমেছে না?
সুনন্দা উন্মাদ গলায় বলে ওঠেন, রঘু গেটে চাবি দে। কেউ যেন বেরিয়ে যেতে পারে না।….ব্রজবাবু বলুন একথা মিথ্যে? বলুন, বলুন আপনি!
ব্রজনাথ মাথা নীচু করেন।
সুনন্দা হয়তো সত্যিই উন্মাদ হয়ে গেছে, তাই সুনন্দার দাদা কাছে এসে যতই বলতে থাকেন–এই নন্দা বোস! মাথা খারাপ করিসনে, ভাল করে বুঝতে চেষ্টা কর ব্যাপারটা
সুনন্দা ততই উত্তেজিত হয়।
যতীন সেনের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে-আর আপনি? আপনিও বলবেন একথা সত্যি?
যতীন সেনও সুনন্দার মতই উত্তেজিত উন্মাদ।
–সত্যিই তো! ষোলো আনা সত্যি। কেন সত্যি হবে না? আমি গরীব, আমার অভাব, স্বভাব নষ্ট তো হবেই? আজকাল এ নষ্ট কার না হচ্ছে? মেয়ে দিয়ে সংসারের ডুবো নৌকো কে না টেনে তুলছে? কে না তাকে ভাঙিয়ে খাচ্ছে? যে যেমন পারছে।….আমার সামনে প্রলোভনের ছবি ধরেছেন ওই আপনার উকিলবাবু।
–আপনি থামুন, আপনি থামুন-সুনন্দা এবার সীমার দিকে তাকায়। তারপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাত ধরে বলে–কিন্তু তোক যে আমি আমার সেই হারানো টুলু বলেই জেনেছি। ওরে টুলু, তুই একবার বল্ একথা মিথ্যে। বল্ এটাই কোনও নতুন ষড়যন্ত্র। আমার বুক ভেঙে দেবার জন্যে কোনও রাক্ষস এই মতলব ভেঁজেছে বসে বসে। তুই সেই জাল ছিঁড়ে দে। বল্ মা, যা বলেছিস মিথ্যে–
–মিথ্যে নয় মা!
–নয়? নয়? মিথ্যে নয়? তবে কোন মুখে মা বলে ডাকছিস শয়তানী? দূর হয়ে যা, দূর হয়ে যা আমার সামনে থেকে।…না দূরই বা হবি কেন? তোকে আমি পুলিশে দেব। তোদের সব কটাকে জেলে পুরবো। মায়া বাড়িয়ে এখন আবার মা বলতে আসছে!….তাই তাই-তাই তোর মা ডাকতে জিভ আড়ষ্ট হয়ে যেত! তাই আমার স্নেহের সমুদ্র দুহাতে ঠেলে সরিয়ে দিতিস, তাই সব সময় তোর চোরের মত ভাব ছিল!….এখন বুঝতে পারছি। সব বুঝতে পারছি–
চিরদিনের শান্ত মানুষটা যেন ক্ষেপে উঠেছে, তাই এমন শক্ত করে চেপে ধরছে সীমার হাত যে, রক্ত জমে উঠছে তার। সীমা হাতটা ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করে। পারে না।
আস্তে বলে, হাতটা ছেড়ে দিন, লাগছে।
ছেড়ে দেব? ছেড়ে দেব তোকে আমি? জেলে দেব না?
.
–পিসিমা!
উঠে আসে উদ্দালক। জোরালো গলায় বলে কী পাগলামি হচ্ছে? বোসা তো শান্ত হয়ে?
শান্ত হয়ে? শান্ত হব আমি?
সুনন্দা বসে পড়ে।
আর এবার হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠেভগবান! কত মহাপাপ করেছিলাম আমি, তাই এমনি করে হরিষে বিষাদ করলে।
.
হল-এ যে যেখানে ছিল, যেন পাথরের পুতুল হয়ে গিয়েছিল, সুনন্দার দাদা বাদে। তিনি উঠে গিয়ে হল-এর শেষপ্রান্তে পৌঁছে ব্রজ উকিলকে প্রশ্ন করছিলেন কটু কঠিন চাপা গলায়। এবার তিনি যতীন সেনের সামনে দাঁড়িয়ে সরাসরি প্রশ্ন করেন কী চান আপনি? টাকা? কত টাকা? হাত পেতে চাইলে পাবেন সে টাকা; বলুন কত চান? হাজার, দুহাজার? পাঁচ হাজার?….আমার এই বোনটিকে দেখছেন? এঁর কাছে যদি আপনি ওই টাকাটা চান, হাসতে হাসতে দিতে পারেন ইনি, একসময় আপনি এঁর হারানো মেয়েকে পালন করেছেন বলে। কিন্তু যদি প্যাঁচ কসে ব্ল্যাকমেল করে টাকা আদায় করতে চান, ফল ভাল হবে না বলে দিচ্ছি।
হ্যাঁ, এই ভাবেই আপাতত শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চেষ্টা করেন সুনন্দার দাদা। সত্যি মিথ্যে পরে বোঝা যাবে, এখন লোকসমাজে মানটা রাখতে হয়।
কিন্তু তোক কি ঘাসের বীচি খায়?
সুনন্দার এই মেয়ে খুঁজে পাওয়ার পর থেকে আত্মীয় মহলে কি সন্দেহের চাষ চলছিল না? সুনন্দার মত দেখতে নয়, নয় শোভনের মত দেখতে; হঠাৎ কোথা থেকে না কোথা থেকে ধাড়ি একটা মেয়ে এসে রাজ্যপাটে বসল, এটা সহ্য করা সোজা না কি?
যতীন সেন আকস্মিক এহেন প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না, তাই এদিক ওদিক তাকায়, তারপর মেজাজি গলায় বলে ওঠে–তাই দিন। দিয়ে দিন হাজার পাঁচেক টাকা, চলে যাচ্ছি।
–দেব! আপনি বাইরে চলুন। মনে করেছিলেন এই রকম একটা সীন ক্রিয়েট করলেই সবাই আপনার কথা বিশ্বাস করবে। আর ওই বেচারী মেয়েটা–যে না কি এ যাবকাল আপনার কাছে প্রতিপালিত হয়েছে সে, সাধারণ ভদ্রতা এবং কৃতজ্ঞতার বশে নিশ্চয়ই আপনাকে সমর্থন করবে। সে মতলব আপনার কিছুটা হাসিল হয়েছে; তবে চালাকি দিয়ে চিরদিন ঠকানো যায় না, মনে রাখবেন সেটা। একবার দেব টাকা, কিন্তু আপনি যে বারে বারে এসে মোচড় দেবেন; তা চলবে না। চলুন, চলুন আমার সঙ্গে।
