তাদের সম্পর্কটা মনোমালিন্যের–ওঠা পড়ার কোঠা থেকে ক্রমশ গিয়ে পড়েছে পরম শত্রুতার পর্যায়ে। তাই মনে মনে চরম পথ বেছে নিয়েছে কাণ্ডজ্ঞানহীন গোঁয়ারগোবিন্দ যতীন সেন। অনেক আশার স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেছে তার।
বড় আশা ছিল ওই গিন্নীটার কাছে মায়া কাড়িয়ে ছলে কৌশলে অবিরত টাকাকড়ি জিনিসপত্র আদায় করে লুকিয়ে লুকিয়ে পাচার করবে সীমা, ঢেলে দিয়ে যাবে তার অভাবগ্রস্ত বাপের সংসারে, নয় একদিন এসে মা বাপকে যাচ্ছেতাই শুনিয়ে দিয়ে গিয়ে নিজে রাজকন্যা হয়ে রাজসুখ করতে লাগলি? মেয়ে না পিশাচী?…অবস্থাটি কেমন? সোনার খাটে গা, রূপোর খাটে পা, রাতদিন হাওয়াগাড়ি চড়ে হাওয়া খাচ্ছেন।…আবার সঙ্গে নাকি সেই বজ্জাত ছোঁড়াটা লেগে থাকে। গিন্নী না হয় জানেন সম্পর্কটা ভাই-বোন। তুই হারামজাদী তো জানিস সব? তার মানে ছোঁড়াটার সঙ্গে ল করছিস তুই।
যত ভেবেছে, আর জ্বলে পুড়ে মরেছে যতীন সেন, অবশেষে একদিন ঘোষণা করলে তীব্র সংকল্প।
–ঠিক আছে, মরি মরব মেরে মরব। আমি ব্যাটা যে ভিখিরি সেই ভিখিরি থাকলাম, কন্যে আমার গিয়ে রাজসুখ করবেন? অসহ্য! প্রকাশ করে দেব সব ষড়যন্ত্র। ফাঁস করে দেব সব জালিয়াতি।
যতীন গিন্নী ভয়ার্ত গলায় বলে–তা ফাস করতে গেলে তো নিজেও ফসবে গো! হাতে দড়ি পড়বে!
পড়ুক! তার সঙ্গে ওই হারামজাদীরও পড়বে। নাবালিকা নয় যে, বলবে বোঝেনি, ভুলিয়ে ওকে দিয়ে করিয়েছে লোকে!
–ভেবে দেখ ভাল করে বাপু,
–দেখেছি ভেবে। অনেক ভেবেছি।
-আমি ভাবছি একে তো দুঃখের দশা, আবার ইচ্ছে করে থানা পুলিসের হাতে পড়তে যাবে? এগুলো যে না খেয়ে মরবে!
–মরবে না! এই আমি হতভাগা বিদেয় হলেই দেখবে পাড়ার লোকেরা এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে সাহায্য করতে
–হ্যাঁ পাড়ার লোক কত মহৎ!
হবে মহৎ!
যতীন সেন কুটিল হাসি হেসে বলে,–গার্জেনহীন বাড়িতে রূপসী তরুণী থাকলে পাড়ার লোক মহৎ হয়। তোমার বড়মেয়ের তো রূপের বালাই নেই, এটা তো সুন্দরী।
কথাটা অবশ্য সুন্দরী মেয়ের মার খুব ভাল লাগে না। বিরক্ত গলায় বলে জানি না, যা বোঝো কর।
কিন্তু বুঝে সুঝে তো কিছু করছে না যতীন সেন, অবুঝ গোঁয়ারের মতই করতে ছুটছে। সর্বনেশে কাজটা।
.
এবাড়িতে তখন বসেছে সেই উৎসবের আসর। বাড়িটা গমগম করছে লোকে, ঝকঝক করছে আলোয়, মুছিত হচ্ছে সঙ্গীতের সুরে।….ভিতর থেকে ভেসে আসছে লোভনীয় খাদ্যের সুঘ্রাণ। যা নিমন্ত্রিতের ক্ষুধা আর আগ্রহ বাড়াচ্ছে।….মরীয়া যতীন সেন সেইখানে এসে দাঁড়াল কুৎসিত এক ছন্দ পতনের মত।
কেমন করে যেন গেটে দাঁড়ান দ্বাররক্ষীর চোখ এড়িয়ে কাদের পিছনে পিছনে এসে ঢুকে পড়েছে একেবারে ভিতরের হ-এ।
উদ্ভ্রান্ত চোখ উদ্ভ্রান্ত ভাব।
হয়ত এই উদভ্রান্ত ভাবটা এতটা হত না, যদি না ঘরে ঢুকে দেখত মুক্তামালার মধ্যমণি হীরক খণ্ডের মত আসরের ঠিক মাঝখানটিতে সীমা বসে আছে বেশে ভূষায় ঝকমকে হয়ে।
ওই রাজদুলালীটি এই হতভাগ্য যতীন সেনেরই মেয়ে! যাকে না কি যতীন সেনই কৌশল করে ওইখানে পৌঁছে দিয়েছে।
আর অকৃতজ্ঞ পাজী মেয়ে কি না সেই বাপকে আর পুঁছছে না?
ওকে ফাঁসিয়ে নিজে ফঁসবে যতীন সেন।
আর তবে কিসের বাধা?
চড়া কুৎসিত গলায় অতএব চেঁচিয়ে ওঠে যতীন সেন–এই যে কন্যে আমার! মহারাণীর বাড়ির পুষ্যি হয়ে খুব লঞ্চপানি দেখাচ্ছিস যে দেখছি! হতভাগা বাপ মা ভাই বোন খেতে পাচ্ছে কি পাচ্ছে না, তার খোঁজও করছিস না। একটা দিন মাত্তর মস্ত গাড়ি হাঁকিয়ে গিয়ে মুষ্টিভিক্ষে দিয়ে এলি, তারপর? পেট কি একদিন খেয়ে চুপ করে থাকবে?
এক ঘর লোক স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে থাকে। এ দৃশ্যের অর্থ দুর্বোধ্য। কয়েকটা মুহূর্ত স্তব্ধতা, তারপরই বিরাট একটা রোল ওঠে–পাগল! পাগল! গোলমালে একটা পাগল ঢুকে পড়েছে। গেটে কেউ নেই না কি? দাড়োয়ান কি করছে?
কেউ ধরতে যায়, কেউ মারতে যায়, একজন ঘাড়ে হাত দেয়।
–বেরিয়ে যা! বেরিয়ে যা ব্যাটা!
কী মুশকিল! এই আহ্বাদের মাঝখানে হঠাৎ পাগলটা এসে
ওদের কথা শেষ হতে পায় না।
ভীড় সরিয়ে এগিয়ে আসে বসন ভূষণে উজ্জ্বল এক মেয়ে।
আজকের উৎসবের যে মধ্যমণি!
এসে দাঁড়ায় পাগলবেশী লোকটার কাছে! সকলের দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে স্থিরগলায় বলে–পাগল নয়।
-পাগল নয়?
–না পাগল নয়।
–কে তবে? জানো তুমি, কে ও?
আমার বাবা!
–তোমার বাবা!
–হ্যাঁ আমার বাবা!
ভীড় পাতলা হয়ে যায়, এদিক ওদিকে সরে যায় সবাই। যারা উঠে দাঁড়িয়েছিল, বসে পড়ে।
সুনন্দা এগিয়ে আসে।
সুনন্দা বুঝতে পারে এতদিন কেন ওর সেই–বাবা সুনন্দার সঙ্গে দেখা করেনি। আসল কথা দেখা করতে দেওয়া হয়নি। ক্ষ্যাপা ক্ষ্যাপা মতন আর কি!
কিন্তু সুনন্দার স্নেহ সবাইয়ের জন্যে।
তাই সুনন্দা কোমল স্বরে বলে-ও, তোমার সেই পালক বাবা?
–না, আমার নিজের বাবা! সত্যিকার বাবা, যার ঘরে জন্মেছি, যার অন্ন খেয়ে বড় হয়েছি।
সীমার কণ্ঠে দৃঢ়তা। সীমার চোখে বেপরোয়া দুঃসাহসিক সংকল্পের ছাপ!
উদ্দালক এখন এই ভয়াবহ মুহূর্তে কী করতে পারে?
উদ্দালক কি এগিয়ে গিয়ে বলবে–এই টুলু কী হচ্ছে? বুঝলাম ওঁর প্রতি তোর কৃতজ্ঞতা আছে, তাই বলে ওঁকে প্লীজ করবার জন্যে এতটা ইয়ে করা উচিত নয়।
নাঃ উদ্দালকের পক্ষে সম্ভব নয়, এখন কোনও কিছু বলা।
