এই একটা প্রসঙ্গ, যে প্রসঙ্গ তুললে সুনন্দা গুরু ইষ্ট ভুলে যায়। খিদে পেয়েছে কারও একথা শুনলেই সুনন্দা ষাট ষাট করে ছুটে যায় তার ব্যবস্থায়।
গেল।
টুলু উদ্দালকের দিকে তাকাল।
টুলু আস্তে বলল,–ওই সবের আগেই আমি পালাব!
উদ্দালক গভীর দৃষ্টিতে তাকায়।
— গলা নামিয়ে বলে তাহলে আমাকেও পালাতে হবে।
–তোমাকে?
-হ্যাঁ! না-তো কি? ফিরিয়ে আনবার সাধনা করতে খুঁজে ফিরতে হবে!
সীমা মাথা নীচু করে।
সীমা এই পরম ঐশ্বর্যকে হেলায় ত্যাগ করে চলে যাবে, কলোনীর যতীন সেনের কাছে গিয়ে আশ্রয় চাইবে?
.
এমনি দ্বিধা দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে চলে দিন। এগিয়ে আসে সেই দিন।
ভোরবেলা উদ্দালককে ডেকে তোলে সুনন্দা-ওরে গাড়ি নিয়ে স্টেশনে যেতে হবে যে? উদ্দালক পাশ ফিরে বলে–তার এখনো তিন ঘণ্টা দেরী। সাড়ে আটটায় গাড়ি আসবে।
-দেখো মুশকিল, সাড়ে আটটা কোথা? ব্রজবাবু যে বললেন আটটা সাতাশ মিনিটে এসে ইন করবে।
–আটটা সাতাশ! ব্রজবাবু বলেছেন?
হেসে ওঠে উদ্দালক–মানতেই হবে ব্রজবাবুর থেকে অনেক বেশি গাঁইয়া আমি। সেকেন্ড মিনিট দিয়ে সময়ের হিসেব করতে শিখিনি, শুধু ঘণ্টাই জানি। কিন্তু এখন আমি কিছুতেই উঠব না। কেটে ফেললেও না। আটটা সাতাশে স্টেশনে যেতে হবে বলে, পাঁচটা পঁচিশ থেকে তোড় জোড় করতে পারব না আমি।
–অভদ্র ছেলে! তোর না নিজের মা বাপ!
–তাকে কি! নিজের পরের তফাৎ কিছু নেই আমার! তোমার মা বাবা স্টেশনে এলেও ঠিক একই ব্যবহার করতাম আমি।
–আমার মা বাপ?
সুনন্দা গালে হাত দেয়। বলে–মনেও বা পড়ল তোর। জীবনে দেখিস নি তাদের
–তাতে কি, ছিলেন তো? সেটা তো অস্বীকার করা যায় না?
বলতে বলতে উঠেই বসে। বলেনাঃ মৌজের ঘুমটাই নষ্ট করে দিলে! আর শুয়ে কি হবে?
সুনন্দা হাসতে হাসতে চলে যায়।
উদ্দালক ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়ায়, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই বারান্দার ওপ্রান্তে এসে দাঁড়ায় আর একটা মানুষ।
সদ্য ঘুম ভাঙা চোখে পূবের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে সে। উদ্দলককে দেখতে পায়নি।
উদ্দালক দূরে থেকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ, তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে যায়।
সীমা চমকে ওঠে। সীমা চোখ তুলে তাকায়। মৃদুস্বরে বলে–এক্ষুণি উঠেছ যে?
উদ্দালক আজ আর হেসে উঠে উত্তর দেয় না। গভীর দৃষ্টি মেলে বলে,–সে কথা তো আমিও জিগ্যেস করতে পারি।
–আমি রোজই এ সময় উঠি। আরও আগেই উঠি। বেশি ভোরে ঘর থেকে বেরোতে অস্বস্তি হয় তাই
উদ্দালক তেমনি স্বরেই বলে–খানিকটা ঘুমের আরামের জন্যে রোজ কতটা করে লোকসান ঘটিয়েছি তাই ভেবে আপশোষ হচ্ছে।
–লোকসান? কিসের লোকসান?
–এই দৃশ্যটির! তুমি এসে পূব আকাশের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে, মনে হল যেন-কোন শিল্পীর আঁকা ছবি!
-ঠাট্টা করা হচ্ছে?
–ঠাট্টা নয় সীমা সত্যিই!
–ছবির মত দেখতে বলে কোনও অহঙ্কার তো কোনদিন ছিল না,সীমা মৃদু হেসে বলে–হঠাৎ কি করে ভাবি ঠাট্টা নয়, সত্যি?
তুমি ছবির মত দেখতে, একথা তো বলিনি। বলেছি–দৃশ্যটা যেন শিল্পীর আঁকা ছবি! ভুল নয় সেটা। মহাশিল্পীর হাতের ছাপ পড়েছে এখানে। ওই পূব আকাশ, এই ভোরের রং। এই স্নিগ্ধ শান্তিবহা বাতাস
–ওমা আবার এখন গল্প করতে বসলি?
পিছন থেকে সুনন্দার স্বর শোনা যায়। স্নান সেরে এসে পূজো করতে যাচ্ছে। শাদা গরদের থান, হাতে ফুলে ভর্তি সাজি।
না, সন্দেহের গলায় অভিযোগ করে ওঠেনি সুনন্দা, সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায় নি। শুধু ব্যস্ততার ছাপ তার চোখে মুখে।
উদ্দালক একটু হেসে বলে–পিসিমা, একটা কথা বোধ হয় ভুলেই গেছ?
–কি ভুলে গেছি?
–তোমার দাদাটির শৈশব পার হয়ে গেছে, এবং হাওড়া স্টেশনে এসে ট্রেন থেমে পড়ে, ছুটে পালায় না?
–শোনো কথা আমি যেন তাই বলছি। মুখ ধুবি, চা খাবি, কাজ নেই বুঝি? টুলু সাজবে টাজবে
উদ্দালক এবার জোর হেসে উঠে বলে–সাজবে? বিয়ে না কি?
–আহা সাজবে মানে, ইয়ে একটু পরিষ্কার টরিষ্কার হবে তো? মামা মামী এই প্রথম দেখবে।…টুলু তুই তোর সেই হালকা নীল রঙের নাইলন শাড়িটা পরে নিস কেমন? আর সেই সোনালী বুটি-ব্লাউসটা
–আর তোর সেই হীরের মুকুটটাউদ্দালক বলে–মুক্তোর মালাটা, পান্নার দুলটা
-থাম বাছা, সকাল বেলা খালি কাজ পণ্ড! ঠিক সময় স্টেশনে যাবি, এই বলে দিয়ে চললাম পূজোর ঘরে।
সেই দিকে তাকিয়ে সীমা নিশ্বাস ফেলে বলে–উনি যদি এত ভাল না হতেন, হয়তো আমার কাজ অনেক সোজা হত।
.
খানিক পরে বেরিয়ে যায় উদ্দালক গাড়ি নিয়ে।
খানিক পরে এসে পড়েন উদ্দালকের মা মামা। এসে পড়ে তাদের ছোট তিনটি ছেলে মেয়ে।
দাদা দাদা করে অস্থির করে তারা উদ্দালককে।
সুনন্দা বলে,–চল এবার দিদি দেখবি। দাদা তো দেখা, দিদি নতুন।
.
এতদিন ধরে মনের মধ্যে এমনি কত চিন্তাই চলছিল সুনন্দার।
কেমন করে পরিচয় করাবে টুলুর সঙ্গে সকলের, কেমন করে সবাইকে দেখাবে তার ফিরে পাওয়া হারানো নিধিকে। তারপর উৎসবের স্রোত ববে।
তলায় তলায় আয়োজন করিয়েছে গানের, বাজনার, ম্যাজিকের।
সন্ধ্যার দিকে আসবে তারা।
খাওয়া দাওয়ার আয়োজনের অবসরে চলবে এই চিত্ত বিনোদনের পালা।
দীর্ঘকালের শোকভারাক্রান্ত মন, যেন সেই ভার ফেলে দিয়ে পুতুল খেলায় মেতে উঠেছে।
কিন্তু অন্য আর এক জায়গায় চলছিল না কি আর এক খেলা? হ্যাঁ চলছিল যতীন সেন আর ব্রজ উকিলের মধ্যে।
