সুনন্দা চমকে ওঠে।
সুনন্দা কাতর গলায় বলে–কেন মাথা ধরল না কি?
–মাথা তো তোমার কন্যার ধরেই আছে পিসিমা! দামী মাথা! সেই থেকে বলছি টুল বাড়ি চল ঠাণ্ডা লাগছে, তা নয় বাবু গঙ্গার ধারে বসে হাওয়া খাচ্ছেন! খাও হাওয়া!
–এই দেখ কাণ্ড!
সুনন্দা উদ্বিগ্ন হয়ে সীমার ঘরে এসে ঢোকে।
না, সীমা এখন আর আড়ষ্ট হবে না। সীমা উদ্দালকের ওই সামলে নেবার অলৌকিক ক্ষমতা দর্শনে স্তম্ভিত হয়ে গেছে, লজ্জিত হয়ে উঠেছে। নিজেকে সামলে নেবার শক্তি খুঁজে পাচ্ছে।
তাই সহজ ভাবে বলে ওঠে–কেন শোনেন মা ওর কথা? বাজে কথার রাজা! মোটেই মাথা ধরেনি আমার। ভাল শাড়িটা বদলাবো বলে তাড়াতাড়ি
মা! মা!
সীমার মুখে এমন সহজ কথা! সীমার মুখে একসঙ্গে এতগুলো কথা!
সুনন্দা যেন বর্তে যায়, ধন্য হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি চেঁচিয়ে বলে–হ্যাঁরে দুলু, কী ছেলে রে তুই! শুধু-শুধু কি না–আর হারে টুলু, ভাল শাড়ি বলে তাড়াতাড়ি বদলাবার কী দরকার রে? আমি দেখি না একটু ভাল শাড়ি পরা মূর্তিটা! কত ভাল ভাল শাড়ি আলমারিতে পচছে, তুই আবার শাড়ি বাঁচাতে বসছিস! রাতদিন ভাল ভাল পরে বেড়াস তুই, এই আমার ইচ্ছে।
সীমা একটু হেসে বলে–মায়া লাগে! দুটো ভিন্ন তিনটে শাড়ি একসঙ্গে পরিনি কখনো, সহ্য হয় না।
সুনন্দা একটু থতমত খায়।
তারপর সামলে নিয়ে বলে–সেই জন্যেই তো আরও বেশি করে সব পরবি, খাবি, খরচ করবি। এতদিনের শোধ তুলবি। তা হ্যাঁ রে টুলু, মনে কিছু না করিস তো একটা কথা বলি–যাঁরা এতদিন তোকে দেখাশুনা করেছেন, তারা তো তেমন অবস্থাপন্ন নন শুনেছি, তা তুই যদি চুপিচুপি তাদের হাতে কিছু দিস, নেবেন না?
সীমা চমকে ওঠে।
সুনন্দা যে হঠাৎ এমন একটা কথা বলে বসবে সেটা তার ধারণার মধ্যে ছিল না। সহজ ভাবটা তবে আর সহজে বজায় রাখে কি করে বেচারী?
আস্তে বলে–হঠাৎ একথা কেন বলছেন?
-না না, অন্য কিছু ভেবে বলিনি রে–সুনন্দা ব্যস্ত হয়ে ওঠে–মানে এতকাল যাকে মা বলে ডেকেছিস, তার প্রতিও তো একটা কর্তব্য আছে? ওই যে দুটো বৈ তিনটে শাড়ী না থাকার কথা বলছিস, তা তাঁর তো সে অবস্থা রয়েই গেল? তোর এত হল, তুই তাকে
সীমা উত্তর দেয় না, মাথা হেঁট করে।
হেঁট করে, হয়তো উত্তর দেবার ক্ষমতা থাকে না বলেই।
সুনন্দা মৌনং সম্মতি লক্ষণং ধরে নিয়ে মহোৎসাহে বলে–ধর তুই জোড়া দশেক শাড়ী, দু। ডজন সায়া-ব্লাউস, অনেক করে তেল সাবান স্নো পাউডার
সীমা হেসে ফেলে বলে–স্নো পাউডার?
–আহা না হয় তা না হল, আরও যা সব দরকারি জিনিস আছে, অনেক করে কিনে নিয়ে তুই একদিন–মানে তুই উপহার দিলে অবিশ্যিই নেবেন।
সীমার চোখে এবার জল আসে।
কী নির্মল মন! কী পবিত্র দৃষ্টি! আর কী বিশ্বাসী হৃদয়!
উনি সেই অবধি ধরেই থেকেছেন সীমার পূর্বজীবনের মা বাপ গরীব বলেই বড় বেশি আত্মসম্মান জ্ঞান তাদের। অথচ তাদের সাহায্য করতে ইচ্ছে এঁর হৃদয় উজাড় করে!
এই মানুষকে ঠকাতে এসেছে সীমা। ঠকাচ্ছে, ঠকিয়ে চলেছে।
শুধু কি হারানো মেয়ে সেজেই ঠকাচ্ছে? উদ্দালকের সঙ্গে গোপন এক সম্পর্ক গড়ে, চাতুরীর জোরে চাপা দিয়ে রাখছে না? প্রতিনিয়ত ঠকিয়েই চলেছে এঁকে সীমা!
.
সুনন্দা দেখে সীমার চোখে জল।
ভাবে, তাদের জন্যে মনটা এখনো পুড়ছে মেয়েটার। তাহলে বলতেই হবে মায়ার প্রাণ!
হবে বৈ কি। হবে না? কেমন মানুষের মেয়ে! কী মায়ার প্রাণই ছিল তার! স্বামীর কথা স্মরণ করে বুকটা ব্যথায় টনটনিয়ে ওঠে সুনন্দার। দেখতে পেলেন না। শূন্যপুরী পূর্ণ হয়ে ওঠা দেখতে পেলেন না।
তারপর ভাবে, আমার মত হয়নি, তার মত হয়েছে মেয়েটা, মায়া মমতায়-ভরা বুক, কিন্তু চাপা।
যেখানে যে পরিবারেই মানুষ হোক, মূল কাঠামোর গুণ যাবে কোথায়? আচ্ছা, এই সব জিনিসপত্র কিনে গোছ করে একদিন পাঠিয়ে দেব সীমাকে, দিয়ে আসবে। আগে ভেবেছিলাম ওদের সঙ্গে আদৌ আর মেলামেশা না করা, এখন মনে হচ্ছে সেটা ভুল হবে। জোর করে কিছু সুফল হয় না। কোনও ক্ষেত্রেই না। নিজে থেকেই হবে। আস্তে আস্তেসহজে। যেমন করে বাপের বাড়ির মেয়ের মন বসে শ্বশুরবাড়িতে।
সে ক্ষেত্রেও তো বড় হয়ে যাওয়া মেয়েই। তবু প্রথমটা তারা শ্বশুরবাড়ি আসতে কাঁদে, পরে বাপেরবাড়ি যাবার সময় পায় না।
সুনন্দা হাসে একটু মনে মনে–তবে তারা একটা বাড়তি পায়, বর। একেও বর দিতে হবে একটা তাড়াতাড়ি। তারপর সুনন্দা সেই নবীন যুগলকে নিয়ে….ভগবান এত দুঃখের পর এত সুখও লিখেছিলে সুনন্দার জন্যে!
মেয়েটা মুখটা শুকিয়ে বসে আছে।
এবার অন্য প্রসঙ্গে আসে সুনন্দা। ….দুলু, আমার ধূপ চন্দন কাঠ?
দুলু সাড়া দেয়।
ধূপ চন্দন কাঠ? জিগ্যেস কর তোমার আদরের মেয়েকে। রাত নটা বাজিয়ে দিলেন গঙ্গার ধারে বসে। দোকানদাররা যেন দরজা খুলে বসে থাকবে ওর জন্যে!
সুনন্দা ব্যস্ত হয়ে বলে-থাক বাপু, আমার কিছু আর অচল হচ্ছে না ওর জন্যে। কাল আনলেই হবে!
তারপর বোধকরি সীমাকে উৎসাহ দিতেই সুরু করে সুনন্দা, আগামী উৎসবের আলোচনা।
–তোকে এবার মামা মামী দেখাব, বুঝলি টুলু। দেখিস কী মানুষ! বৌদি তো ভালই, তবে দাদার তুলনাই হয় না। আমার যে যেখানে আছে সবাইকে আমি নেমন্তন্ন করব দুলুর পাশকরা উপলক্ষে।
উদ্দালক কটাক্ষপাত করে সীমার দিকে, বলা বাহুল্য উৎসাহের লেশ দেখে না সেখানে। তাড়াতাড়ি আবহাওয়া সরস করে নেবার চেষ্টা করে,–উপলক্ষ! শুনে রাখ টুলু, নট লক্ষ্য। লক্ষ্যটি কে বুঝতেই পারা যাচ্ছে। ভাল ভাল! কিন্তু পিসিমা, খাওয়া দাওয়ার দিকে একটু লক্ষ্য করলে ভাল হত না এবার?
