–থামো উদ্দালক–সীমা ক্লান্ত গলায় বলে, এতবড় একটা মিথ্যের ওপর জীবনটাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারব না। তার থেকে ধুলোয় লুটিয়ে যাক অপ্রতিষ্ঠিত অপরাধীর জীবন!
উদ্দালক গভীর কণ্ঠে বলে–তাকাও আমার দিকে! এবার জবাব দাও! বল–অপরাধীর জীবনের জন্যে না হয় ধূলোয় লুটোনোর ব্যবস্থা, কিন্তু নিরপরাধীর জীবনের জন্যে ব্যবস্থাটা কি? বল?
উদ্দালক! সীমা বেঞ্চটায় বসে পড়ে বলে–উদ্দালক, সব জেনেও আমায় ঘৃণা করছ না কেন? কেন তোমার মন ফিরিয়ে নিচ্ছ না?
উদ্দালক তেমনি গভীর স্বরেই বলে–দেখ সীমা, বেশ গুছিয়ে টুছিয়ে কথা আমি বলতে পারি না, কাজেই এলোমেলো করেই বলছি–মন বস্তুটা কি ফিরিয়ে নেবার? ইচ্ছে করলেই ফিরিয়ে নেওয়া যায়? তাছাড়া–সব জেনে ফেলার পরই তো মনটা ছুটে এগিয়ে গেল! ঘৃণা করবার সময় পেল কোথায়? শ্রদ্ধায় বিগলিত হয়েই তো–নাঃ বড্ড নাটুকে নাটুকে হয়ে যাচ্ছে কথাবার্তা!…মোটকথা, আমি তোমার ওসব নীতি দুর্নীতি বুঝি না, আমার প্রথম কথা, শেষ কথা, এবং একটাই মাত্র কথা, তোমাকে হারানো আমার চলবে না! লাভ করতেই হবে। তা সে ছলে বলে কৌশলে যে করেই হোক!…সাপ না মরুক লাঠিটা ভাঙবই–এ গোঁয়ার্তুমিতে দরকার কি? উল্টোটা যদি হয় সেটাই তো ভাল!
–কিন্তু উদ্দালক, মন বলে তো একটা বস্তু আছে আমার?
উদ্দালক এবার হাসে।
মৃদু হাসির সঙ্গেই বলে-উঁহু সেটা আর তোমার নেই, সেটা আমার সম্পত্তি হয়ে গেছে!
আরও খানিকক্ষণ বসে থাকে ওরা, আর শেষ পর্যন্ত উদ্দালকের মতেই মত দিতে হয় সীমাকে। অন্তত সুনন্দার এই উৎসবের আয়োজনটি সার্থক সুন্দর হতে দেবে সীমা।
হতে দেবে যতদূর সম্ভব নিপুণ অভিনয় করে।
তারপর?
মুখ দেখাবার মুখ যদি না থাকে, মুখ তো দেখাবে না সীমা। এই লাঞ্ছিত মুখটা নিয়ে তলিয়ে যাবে অন্ধকারের অতলতায়।
উদ্দালক বলে–যেতে দিলে তো!
এরপর ফিরে আসে দুজনে গাড়িতে। আর তখনই ভাবতে থাকে সীমা…আমি কি শুধু উদ্দালকের অনুরোধ রাখতেই ফিরে এলাম? আমার মধ্যে কি আর কোনও কিছু কাজ করছে না? রায় বাড়ির উঁচু লোহার গেটের মধ্যে ফিরে না যেতে চাইলেই যে আমাকে সেই কলোনীর যতীন সেনের দাওয়ার ধারে গিয়ে দাঁড়াতে হবে, অবচেতনায় কি সেই স্পষ্ট বাস্তবটা দাঁত খিঁচিয়ে বসে নেই?
তারপর সেখানে আর এখানে কত ধূলোর ঝড় উঠবে, কত পঙ্কিল আবর্তের সৃষ্টি হবে সেই সত্যভাষিণী সীমাকে ঘিরে, সে কথাও কি জানছে না সীমার মনের ভিতরের মন!
ভাবতে ভাবতেই বাড়িতে এসে পৌঁছে যায়।
আর সেই উঁচু লোহার গেটটা পার হয়ে বারান্দার মার্বেল পাথরের সিঁড়িতে পা রাখতেই অজান্তে একটা স্বস্তির নিশ্বাস পড়ে সীমার।
এ বাড়িতে এসে পর্যন্ত একদিনের জন্যও তো স্বস্তি পায়নি সীমা, একবারের জন্যেও যথার্থ আশ্রয় বলে ভাবতে পারেনি, তবু আজ এই ছেড়ে চলে যাবার দৃঢ়সংকল্পের মুখে হঠাৎ যেন ভারী একটা স্বস্তির আশ্রয়ে এস পড়ার শাস্তি অনুভব করে সীমা!
যেন বাঁচল!
যেন বহু দুর্গতির ঝড় থেকে সরে জানলা দরজা লাগানো ঘরের মধ্যে এসে বসল।
.
বেরোবার মুখে সুনন্দা দুএকটা জিনিসের ফরমাস করেছিলেন। বলেছিলেন–ফেরার সময় কিনে আনিস তোরা।
সেই ফরমাসটা মনে পড়ল বাড়ি ফিরে।
উদ্দালক বলল–ওই যাঃ পিসিমার ঠাকুরের অগুরু আর চন্দন কাঠ আনা হল না!
সীমা দাঁড়িয়ে পড়ে বলে–এখন মনে পড়ল? যাকগে আবার বেরিয়ে পড়, গ্যারেজ তো বন্ধ হয়নি এখনও।
গ্যারেজ বন্ধ হয়নি, দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে–উদ্দালক হাতের ঘড়িটা দেখে নিয়ে বলে–রাত নটা তো বাজে প্রায়।
সীতা হতাশ গলায় বলে–এত দেরী করলে তুমি! এখন ওঁকে কি করে যে মুখ দেখাব।
ওঁকে না বলে মাকে বললেও পায়রা সীমা–উদ্দালক বলে–মা বলাটা আর এত কি শক্ত? সকলকেই তো বলা যায়!
উদ্দালকের গলায় দুঃখের সুর।
সীমা লজ্জিত হয়। আর বোধকরি লজ্জা ঢাকতেই হঠাৎ এক বেস কথা বলে বসে।
বলে–এরপর আবার তো মা বদলে পিসিমা ডাকবার হুকুম হবে! বলেই মরমে মরে যায়।
ছি ছি, বেহায়ার মত এ কী বলে বসল সে! এতক্ষণ ধরে সকলের সঙ্গে সম্পর্কছেদ করে চলে যাবার সংকল্প ঘোষণা করছিল বসে বসে উদ্দালকের কাছে?
উদ্দালক আর সীমা করিডোেরটার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
একটু দাঁড়িয়ে পড়ে উদ্দালক। সীমার বিপর্যস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে। মৃদু হেসে বলে–হুঁকুম আরও কতরকম হবে। সহজে পার পাবে না কি?
.
দুজনে একসঙ্গে সুনন্দার সামনে দাঁড়াবে এ সাহস হয় না সীমার, তাই পাশ কাটিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে। উদ্দালক প্রমাদ গণে।
এই দৃশ্যটা শোভন হল না।
যতই সরল আর নির্মলচিত্ত হোন সুনন্দা, সীমার ওই চোরের মত ঝপ করে ঘরে ঢুকে যাওয়াটা নিশ্চয় তারও চোখে কটু ঠেকবে। ভাইবোন সম্পর্কটাকে যতই বড় করে তুলে ধরুন সুনন্দা, সত্যিই তো এক্ষেত্রে তত বড় নয়। একে তো মামাতো পিসতুতো ভাইবোনের স্নেহ প্রীতির বাড়াবাড়িটা তত উদারচক্ষে দেখতে পারে না লোকে, তার ওপর এ আবার সাতজন্মের অজানা অচেনা।
বেশি উদার দৃষ্টিতে কে দেখবে?
হারানো মেয়ে খুঁজে পেয়ে সুনন্দা তাকে বুকে ধরবেন বলে যে, সুনন্দার ভাইপোকেও তাই। ধরতে দেবেন, এ তো আর হতে পারে না!
সন্দেহের চোখে দেখতে পারেন সুনন্দা।
অতএব উদ্দালককেই চেষ্টা করতে হয়–আবহাওয়াকে সহজ রাখবার। চেঁচিয়ে বলতে হয়, তাড়াতাড়ি বদ্ধ ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়বার দরকার নেই টুলু, বাইরে এসে হাওয়ায় বোস। বরং একটা সারিডন খা।
