মেয়েটা হঠাৎ ঘাড় তুলে বলে ওঠে, বেশ, তাই করব আমি। ঢুকিয়ে দাও আমায় কোনখানে।
–আমি? আমি দেব ঢুকিয়ে?
মা ঠিকরে ঘরে ঢুকে যায়। ঘরের মধ্যে থেকে বলে ওঠে–সে পথ যদি জানা থাকত, সে দরজা যদি চেনা থাকত, তাহলে কি আর তোমার খোসামোদ করতে যেতাম মা? নিজেই যেতাম। ঝিয়ের পার্টেরও তো দরকার হয়!
সীমা দেখছে, সমগ্ৰ সংসারটা যেন প্রবল একটা আক্রোশের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওই মেয়েটার দিকে।
কেন!
হয়তো ভয়ানক একটা আশাভঙ্গের আশঙ্কায়। অনেকদিন ধরে তাকিয়েছিল তারা সংসারের এই বড় হয়ে ওঠা মেয়েটার দিকে। আশা করছিল ও ওর কর্তব্য করবে। দায়িত্বটা নিজের হাতে তুলে নেবে।
কিন্তু যেমন ভাবছিল তেমন হচ্ছে না।
ও একটা কর্পোরেশন স্কুলের মাস্টারী করে, সব কর্তব্য সারা হল ভেবে আত্মপ্রসাদ অনুভব করছে!
অথচ একটা যুবতী মেয়েকে দিয়ে কী না হতে পারে!
.
সীমা দেখতে পাচ্ছে, সেই মেয়েটা মাথা হেঁট করে পাড়ার একজনদের বাড়িতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের বাড়ির আধবুড়ো কর্তাকে বলছে–আপনি তো স্টুডিওতে যাওয়া আসা করেন জগবন্ধু কাকা, আমাকে একবার ইনট্রোডিউস করিয়ে দিতে পারেন না?
জগবন্ধু কাকা হতাশ গলায় উত্তর দেন–আমি! আমি আর কী পদের কাজ করি মা, আমার তো কাজ ড্রেস সাপ্লাই। আমার কি সাধ্য
বেশ আমাকে শুধু একদিন নিয়েই চলুন, যা বলবার আমি নিজেই বলব।
–যেতে চাও সঙ্গে নিয়ে যেতে পারি–জগবন্ধুকাকা আরও নিরুৎসাহের বাণী ঘোষণা করেন গিয়ে দেখবে গাদা গাদা উমেদার বসে আছে। কর্তারা কেউ তাদের দিকে তাকিয়েও দেখছেন না। পায়ে পায়ে ঘুরছে, এখন সময় নেই বলে ভাগাচ্ছেন।….দেখেছি তো চোখের সামনে।
তবু সেই নিরুৎসাহী ব্যক্তির স্কন্ধে চেপেই গিয়েছে মেয়েটা। একদিন নয়, দিনের পর দিন। কেউ কথা বলেনি। কেউ তাকিয়ে দেখেনি।
বাস ভাড়া দেবার ক্ষমতা নেই, পাড়ার কাকা আর কদিন বাস ভাড়া দেবে?
.
এমনি এক ভয়ঙ্কর সময়ে এলো ব্ৰজ উকিলের প্রস্তাব। যতীন সেনের মামার এককালের সহপাঠী।
মেয়েটা হাতে চাঁদ পেল।
ভাবল, তার একান্ত আকুলতায় ঈশ্বর মুখ তুলে চাইলেন। ভাবল, অভিনয়ে নামতেই তো চেয়েছিলাম, তার সুযোগ পাচ্ছি। এর থেকে পবিত্র শুচিস্নিগ্ধ অভিনয় আর কি হতে পারে? প্রেমের অভিনয় নয়, নয় কুটিলা নায়িকার অভিনয়। একটি সন্তানহারা মায়ের কাছে সন্তান হয়ে থাকা!
গ্লানিহীন সুন্দর! তখন তাই ভেবেছিল সীমা।
ভাবেনি, সেই সহজ অভিনয়টা এতখানি মারাত্মক হয়ে উঠবে। সীমার যদি হৃদয় বলে কোনও বস্তু না থাকত, না থাকত বিবেক বলে কোনও জিনিস, তা হলে তার অঙ্কটা নির্ভুল হত।
কিন্তু সাজানো সংখ্যার মধ্যে বাড়তি ওই দুটো সংখ্যা এসে পড়ল, হৃদয় আর বিবেক! এলোমেলো হয়ে গেল সব অঙ্ক!
তাই এই খোলা আকাশের নীচে, এলোমলো বসন্ত হাওয়ার মাঝখানে একান্ত প্রিয়তমের হাতে হাত রাখতেও মন গুটিয়ে আসছে সীমার। কে যেন মুঠোয় চেপে ধরে রয়েছে ওর সমস্ত সত্তাকে!
হাতে হাত রাখে না। উভ্রান্ত গলায় বলে ওঠে–আমি আর পারছি না! আমি আজই বলব। তারপর যা হয় তোক।
উদ্দালক মৃদুস্বরে বলে–কিন্তু জানো বোধহয়, পিসিমা একটা ঘটনার আয়োজনে মেতেছেন। কী অসম্ভব উৎসাহে তার তোড়জোড় করছেন। তুমি লক্ষ্য করোনি হয়তো, কিন্তু আমি তো করেছি!..টাকার পাহাড়ের ওপর বসে আছেন মানুষটা, জীবনে কখনো একটা উৎসব করতে পাননি, বাড়িতে কাউকে একমুঠো খেতে ডাকতে পাননি। সেই রুদ্ধ আবেগকে বাঁধ ছেড়ে দিয়ে খুব একটা আহ্লাদ নিয়ে মেতেছেন, এসময় এতবড় একটা শক্
সীমা ম্লান বিষণ্ণ স্বরে বলে,–শক তো উনি সব সময়ই পাবেন উদ্দালক! এ বরং ভালই হবে যে, অতটা আনন্দের পর হঠাৎ যবনিকা পতনের কষ্টটা সইতে হবে না। তাছাড়া অনেক লোক আসবে বলছ, ধর যদি কেউ চিনে ফেলে? যদি সেই সভার মধ্যে হাটে হাঁড়ি ভেঙে যায়?
এ সম্ভাবনা যে উদ্দালকের মনের মধ্যে আসেনি তা নয়, তবে তার উত্তরটাও ভেবে রেখেছে সে। সেই উত্তরটাই বলে–ভাঙবে না কিছুই। এতদিন যে তুমি কোনও একখানে কারুর একজনের মেয়ের পরিচয়ে ছিলে, সে কথা তো জানেন পিসিমা! কেউ যদি হাঁড়ি ভাঙতে আসে, নতুন কোনও লোকসান ঘটাতে পারবে না!
–অনেক লোকের সামনে দাঁড়াতে হবে ভেবে এখন থেকেই অস্থির হয়ে যাচ্ছি আমি উদ্দালক!
–কিন্তু সীমা, তুমি তো বলেছ, এক সময় সিনেমা থিয়েটারে নামবার জন্যেও মরীয়া হয়ে উঠেছিলে তুমি। মনে কর না এটা তোমার সেই মঞ্চ! হাজার হাজার দর্শকের সামনে পড়েও ঘাবড়াবে না।
–সে অভিনয়ের সঙ্গে কি প্রাণের কোনও যোগ থাকে উদ্দালক?
–জানি,–উদ্দালক বলে–বুঝতে পারছি তোমার অসুবিধে, কিন্তু তবুও তোমায় মিনতি করছি, পিসিমার এই আহ্বাদটায় বাধা দিও না। তারপর একটা প্ল্যান আমার মাথায় এসেছে
–আর প্ল্যানের কথা শুনতে ইচ্ছে নেই উদ্দালক!
–আহা শোনই না মন দিয়ে। এতে হয়তো দুদিক রক্ষে হতে পারে। মানে হবেই।…এই উৎসবে তো আমার মা আসছেন? আমি ঠিক করেছি মার কাছে সব খুলে বলব। আর একথাও বলব–উদ্দালক মোহন একটু হাস্য করে–একথাও বলব–এই মেঘবরণ-কেশ কন্যাটিকে না পেলে আমার চলবেই না। অতএব–অতএবটা কি জানো? মাকে দিয়ে আস্তে আস্তে পিসিমাকে বলাব–ব্যাপারটা একটা ধাপ্পাই, তবে তুমি এর মধ্যে নেই। আসল নায়ক ওই ব্ৰজ উকিল, পার্শ্বনায়ক তোমার বাবা। আর তোমার বাবা যদি বলেন তুমি তার নিজের মেয়ে নও, পালিতা কন্যা, তোমার কি উপায় আছে তার সত্য মিথ্যা যাচাই করবার? তোমার ছোট ভাই বোনেরা ইনোসেন্ট, তুমিও তাই। এরপর আর তোমার আমার মধ্যে ব্যবধান কি?
