অদ্ভুত এক যন্ত্রণার জগতে বাস করছে সীমা। একদিকে একখানি ভালবাসার হাত, অপরদিকে একখানি আকুল অস্থির ভালবাসার হৃদয়। নিশ্চিন্তে সেই হাতে হাত রাখবে এমন উপায় নেই। নির্মল চিত্তে সেই হৃদয়ের কাছে ধরা দেয় সে ক্ষমতা নেই।
তা ছাড়াও-যন্ত্রণার আর কোনও কারণ নেই?
যতীন সেন নেই? নেই তার কটুভাষিণী স্ত্রী? বুভুক্ষু ছেলে মেয়ে?
তাদের সঙ্গে কী ব্যবহার করে এসেছে সীমা?
সেদিনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন ধরে ধরে পেরেক বিধতে থাকে সীমাকে। যেন মরচে ধরা একটা অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে কেটে চলে।
সেই কটু কদর্য মুহূর্তগুলোকে যদি ফিরিয়ে নেওয়া যেত! সীমা তাহলে তার মা বাপ ভাই বোন আর পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে একটু সদ্ব্যবহার করে আসত।
সীমা কি আবার যাবে?
গিয়ে আছড়ে পড়ে বলবে, মা গো তুমি কেবল আমার বাইরেটাই দেখলে, ভিতরটা দেখতে পেলে না? মনে ভাবলে কি হবে, বাস্তবে আর একবার যাওয়ার কথা চিন্তাতেও আনতে পারে না। যতীন সেনের সেই কলোনী। সেই কলোনীর বাসা, তার সমস্ত পারিপার্শ্বিকতা যেন একটা ডেলাপাকানো আতঙ্কের মত জমাট হয়ে বসে আছে।
সর্বদা একা থাকতে ইচ্ছে হয় সীমার। একা একা ভাবতে ইচ্ছে হয়, কেমন ছিল সেই পুরানো জীবনটা। সে জীবনে কষ্ট ছিল, অসুবিধে ছিল, অভাব ছিল, দুঃখ ছিল, কিন্তু গ্লানি ছিল কি?
ভাবতে থাকে সীমা।
তা ছিল বৈ কি।
দারিদ্র বস্তুটাই তো গ্লানিকর। সে দারিদ্র যদি চরম পর্যায়ের হয়, গ্লানিটাও চরমই হয়। সেই চরম গ্লানির মধ্যেই কেটেছে প্রায় জীবনের সব দিনগুলো।
সেই গ্লানির ক্লেদ মাখা একটা মেয়েকে দেখতে পায় সীমা।
জরাজীর্ণ একটা ব্লাউস গায়ে, ততোধিক জীর্ণ একখানা বিবর্ণ রঙিন শাড়ী। হাত দুখানা, ফ্যাসানের জন্যে হয়, শুধু অভাবের জন্যেই খালি।
সেই মেয়েটা একটা টিনের চালের ঘরের কাঠের খুঁটিটা ধরে কঠিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
পাড়ার লোকের কাছে ধার চাইতে যেতে পারবে না। অথচ তার অভাবজীর্ণ কটুভাষী বাপ সমানে তর্জন গর্জন চালিয়ে যাচ্ছে সেই কুৎসিত কাজটা করতে যাবার জন্যেই।
ধার চাই। কিছু একটু ধার না পেলে এই নিয়ে তিন বেলা হাঁড়ি চড়বে না। হয় টাকা, নয় চাল, নিয়ে আসুক চেয়ে।
মেয়েটা এতক্ষণ শুধু একভাবে জানিয়ে এসেছে, আমি পারব না, আমার দ্বারা হবে না। এবার এক সময় চড়ে ওঠে। সীমা দেখতে পায় সেই চড়ে ওঠা মেয়েটা চড়া গলাতেই বলে–তা নাই বা চড়লো হাঁড়ি। এই হতভাগা সংসারে হাঁড়ি যদি আর কোনোদিনই না চড়ে, সবকটাতে মিলে যদি না খেয়ে মরা যায়, কী লোকসান হয় পৃথিবীর?
মেয়েটার মা এবার আসরে নামে।
পতির সুয়ো সতী হয়ে বলে,–ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও তুমি ওই আপ্তসারা স্বার্থপর মেয়েকে। তোমার সংসারের মুখ চাইতে ওর দায় পড়েছে। ওর মান মর্যাদাটা বজায় থাকলেই হল।
আবার বাপ কথা বলে ক্ষোভের গলায়–তা বটে! মান মর্যাদা! আর ওই সনৎ বাবুর মেয়েরা! সতীলক্ষ্মী জগদ্ধাত্রীর মত মেয়েরা! বাপের কষ্ট চোখে না দেখতে পেরে নারীধর্মের সারধর্ম ইজ্জৎ বেচে ঘরে পয়সা আনছে।….দশে ধর্মে সবাই জানছে, তবু বলুক দিকি কেউ কিছু? রে রে করে পড়বে সনৎ। বলবে–ভাত দিতে পারো? তাই জাত নিতে এসেছ? বেশ করছে। আমার মেয়েরা। তবু তো সংসারের মুখে দুটো অল্প তুলে দিচ্ছে!
সীমা দেখতে পাচ্ছে, বলতে বলতে লোকটার শীর্ণ মুখটা যেন কেমন একরকম পাশবিক হয়ে উঠছে। কী ভয়ানক একটা লোকসানের আক্ষেপে যেন বিকৃত হয়ে উঠছে। আর সেই মুখে আরও গলা চড়াচ্ছে সে, আমিও বলব সেই কথা। বেশ করছে সনতের মেয়েরা। চাকরী করতে গেলেও তো খাটতে হয়, মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়। এও ধরে নাও চাকরী।….ভালভাবে ধরলেই ভাল। চোখের সামনে মা ভাই উপোস করে মরছে দেখে মান ইজ্জত নিয়ে গাট হয়ে বসে থাকার চেয়ে অনেক ভাল।…..কিন্তু আমার ললাটটি? চমৎকার! আমার মেয়ে মাথা হেঁট করে কারো বাড়ি গিয়ে দুটো টাকা কর্জ চাইতে পারেন না।
সীমার চোখের সামনে দিয়ে ঘটে যাচ্ছে ঘটনাটা, সীমা দেখছে মেয়েটা মুখ তুলে লাল লাল চোখ মেলে বলছে,–আনি নি কোনও দিন?
–এনেছ! ঘাড় হেট করে স্বীকার করছি এনেছ? বাপের মাথা কিনে এনেছ দু একবার! তা তাতেই চিরদিন চলবে?
মেয়েটা রুদ্ধ গলায় বলে ধার করে চিরদিন চলে?
–চলে না জানি। তাই তো নিজের গালে রাত দিন সাত জুতো মারছি। আঁকার ওজনে টাকা আনবার ক্ষমতা যদি নিজের থাকত, কোন্ হারামজাদা শালা তোমার মত মেয়ের এতটুকু অনুগ্রহ ভিক্ষে করত!
মেয়েটা এবার কেঁদে ফেলেছে।
কেঁদে ফেলে বলছে, ধার কি কেউ দিতে চায় আর? সক্কলের কাছে নিয়ে নিয়ে রেখেছ, শোধ দাওনা, কে দেবে? এত বড়লোকই বা কে আছে? আমরা কারও বাড়ি গেলেই ভয় খায়, ভাবে ধার চাইতে গেছি।
লোকটার ভঙ্গীটা এবার একটু দুর্বল দুর্বল দেখায়। বলে–তা অভাবের সময় পাড়াপড়শীতে এমন দেখেই থাকে। নইলে আর মানুষ বলেছে কেন? মানুষ বলেই মানুষকে দেখে! আরধার। কি আমি শোধ দেব না বলেছি? দিন এলেই শোধ দেব!
দিন!
মেয়েটা হেসে ওঠে–দিন ফিরে আসবে এ ভরসা তা হলে আছে তোমার বাবা?
বাবা বোধকরি এ প্রশ্নে একটু থতমত খেয়ে যায়। বাবা একটু চুপ করে যায়। হাল ধরে মা। বলে ওঠে,তুমি ইচ্ছে করলেই ফেরে মা! সনৎবাবুর মেয়েদের মত হতে আমি বলছি না! কিন্তু আজকাল তো তাবড় তাবড় নামকরা ঘরের সব মেয়েরা সিনেমায় নামছে, থিয়েটারে নামছে। নিন্দে তো দূরের কথা–মুখোজ্জ্বল হচ্ছে বরং তাদের। তাতে তো কোনও দোষের, দেখি না আমি! দুদিনে সংসারের চেহারা ফিরে যাচ্ছে তাদের।
