সীমা ভাবে ভালবাসাটাকে অঙ্কের মধ্যে রাখি নি আমি। বিশ্বাসটাকে হিসেবের মধ্যে ধরি নি। আর বিবেককে? বিবেকের যন্ত্রণাকে? ওকে তো ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু সবাই আজ অসুবিধে ঘটাচ্ছে।
সুনন্দার মনে কষ্ট না দিয়ে আরও কিছুদিন এইভাবে চালিয়ে যাওয়া যেত হয়তো, যদি না উদ্দালক এসে সামনে দাঁড়াত। সুনন্দাকে বাঁচাতে হলে উদ্দালককে ছাড়তে হয়। ছাড়তে হয়। জীবন, জীবনের স্বপ্ন, মন, চৈতন্য, আত্মা।
না না, উদ্দালককে ছেড়ে আমি বাঁচতে পারব না–মনে মনে বলে সীমা–যা হয় তোক।
কিন্তু যা হোকের স্বরূপ তো দেখিয়ে দিয়েছে উদ্দালক, বুঝিয়ে দিয়েছে। হাজত, জেল, বিচার, বিচারশালা! কুশ্রীতা, গ্লানি, লাঞ্ছনা, অপমান!
তবে কি হবে? সুনন্দা কি তার মেয়েকে, মামাতো ভাইকে বিয়ে করতে দেবে? সে মেয়ে অনেকদিন অন্যত্র ছিল বলে? তাই কি সম্ভব?
এদিকে সুনন্দা তখন অন্য জগতে আছে। ও তলে তলে ভাই ভাজকে চিঠি লিখে লিখে এবার আনাচ্ছে। সে চিঠিতে অভিমান আছে, অভিযোগ আছে। সুনন্দার এতদিনের হারানিধি ফিরে পাওয়া গেল, আর সুনন্দার সবচেয়ে যারা নিজের লোক, তারাই রইল উদাসীন হয়ে?
একবার দেখতে এল না?
দাদা লেখে–আরে বাবা, উদাসীন-টুদাসীন কিছু না। মিলিটারিতে চাকরি তো করলি না কখনো? বুঝবি কি? যাই হোক, এবার তারা আসছেন। উদ্দালককে জানাতে বারণ করেছে। সুনন্দা। হঠাৎ অবাক করে দিতে চায় তাকে।
আর দাদা বৌদির উপস্থিতিতে উদ্দালকের পাশ করাকে উপলক্ষ করে দিতে চায় বিরাট একটি ভোজ।
গোপন উদ্দেশ্য আরও গভীর। সীমাকে পরিচিত করাতে হবে আরও ব্যাপকভাবে। বন্ধু আত্মীয় দূর কুটুম্ব সকলের কাছে।
কৌতূহলপরবশ হয়ে যারা এসেছে, তারাই শুধু দেখে গেছে, নেমন্তন্ন করে ডেকে এনে সুনন্দা তো এতবড় আনন্দের ভাগ দেয়নি কাউকে? সেই ত্রুটি পূরণ করবে সুনন্দা।
৩. বাড়ির মধ্যে নয়
বাড়ির মধ্যে নয় বাইরে।
চার দেয়ালের মধ্যে নয়, খোলা আকাশের নীচে।
গাড়ি করে কোনও একখানে বেড়াতে যাওয়াটা তো হাতের মধ্যে।
চির-অবোধ সুনন্দা দের টুকরো ছেলেটার ওপর আস্থা রেখে নিশ্চিন্ত আছে। নিশ্চিন্ত আছে ভাই-বোন সম্পর্কের রক্ষাকবচে। বরং এতেই ওর সায়। মেয়েটার মন বসাবার এটাই মুখ্য উপায় বলে মনে করে। এতদিন অন্যত্র থাকা, অন্য পরিবেশে বেড়ে ওঠা মনটা যে সীমার সুনন্দার এই সোনার খাঁচার মধ্যে প্রকৃত স্বস্তি পাচ্ছে না, তা সুনন্দা বুঝতে পারে। বুঝতে পারে, এ ঘরকে এখনো নিজের ঘর বলে ভাবতে পেরে উঠছে না সীমা। সেই না পারার যন্ত্রণা সীমার মুখে চোখে, আচারে আচরণে, প্রত্যেকটি ভঙ্গীতে।
সীমার ঘরের আলমারি, দেরাজ, ওয়ার্ডরোবের চাবির রিং সীমাকে দিয়ে রেখেছে সুনন্দা। তবু সীমা নিজে হাতে করে একটা জিনিসের চাবি খোলে না। শাড়ী বার করে বদলে বদলে পরে না। যা শাড়ী জামা সুনন্দা বার করে আলনায় গুছিয়ে রাখে, তাই পরে চলে। সুনন্দা দেখে, সীমা পর পর তিন দিন একই শাড়ী পরছে। সুনন্দাই অগত্যা আবার শাড়ী জামা বার করে রেখে দেয়, অনুযোগ করে।
অনুযোগ তো সর্বদাই করে।
সীমার সঙ্গে যা কিছু কথা সুনন্দার, সবই তো অনুযোগের কথা।
–টুলু, টয়লেটের জিনিসগুলোর প্যাকই খুলিসনি এখনো? কি মেয়েরে তুই? টুলু, দুধ না কি খাসনি, ফেরৎ দিয়েছিস! দুবেলা একটু একটু করে দুধ না খেলে কী করে চলে বল তো বাছা! শরীরটা একটু না সারলে
..টুলু নিজে নাকি ব্লাউসে সাবান দিয়েছিস? কোথায় আমি যাব রে! এতগুলো লোক থাকতে
টুলুই যদি বলতে হয় তো বলিটুলু এসব কথার উত্তর বড় দেয় না, চুপ করেই থাকে। এক আধ বার হয়তো আস্তে বলে, বরাবর নিজের কাজ নিজে হাতে করার অভ্যাস ছিল, অন্যকে বলতে মনে থাকে না।…হয়তো বলে–জীবনে কখনো দুধ খেয়েছি কি না সন্দেহ, তবু তো দিব্যিই বেঁচে আছি। শরীর আর বেশী সেরে কী হবে?…হয়তো বা বলে–ওসব কৌটো শিশি তুলি বুরুশের ব্যবহারই জানি না মা, খুলে কি করব!
সুনন্দা বলে ওঠে, ও আমার সোনা, শিখে নাও মাণিক!
সুনন্দা আড়ালে চোখ মোছে। সুনন্দার মেয়ে জীবনে দুধ খেয়েছে কিনা সন্দেহ শুনে চোখের জল মুছে শেষ করতে পারে না।
শুধু সুনন্দা যখন বলে–ও টুলু, সারাক্ষণ কেন ঘরের মধ্যে বন্দী হয়ে পড়ে আছিস মা, যা দাদার সঙ্গে একটু বেড়িয়ে আয়–তখন টুলু প্রস্তুত হয়।
যদিও টুলুর দাদা বলে–আচ্ছা পিসিমা, নির্জন কারাগারে বন্দী হয়ে পড়ে থাকারই বা কী দরকার? ঘরে যে অমন চমৎকার রেকর্ড চেঞ্জার রয়েছে, সেটাকে খানিক খাটানো যায় না? ….শুয়ে শুয়ে দুটো গান শুনতেও এত কষ্ট! বলে–তোমার ওই নিধিটিকে নিয়ে বেড়াতে গিয়েই কি সুখ আছে? হয়তো এমন হাঁড়ি মুখ করে বসে থাকবে, মনে হবে এই মাত্র ব্যাঙ্কফেলের খবর পেয়েছে।
এই সব বলে হাঁক দেয়–নিধি, চলে এসো গাড়ী প্রস্তুত।
এই। এই অবস্থা।
সন্দেহই বা করবে কি করে সুনন্দা?
কি করে ভাববে তারই বাড়িতে তার অলক্ষ্যে এক নতুন নাটক রচিত হচ্ছে। ভাবে না, ভাবতে পারে না।
শুধু নতুন সেই নাটকের নায়ক নায়িকা দুটি ভাবনায় জর্জরিত হতে থাকে।
উদ্দালক আগে বেশি ভাবত না। বলত–নিয়তির হাতে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়ে বসে থেকে দেখো না।….কিন্তু ইদানীং সীমার যন্ত্রণা তাকেও চিন্তিত করে তুলেছে।
