তবু অভিমান দেখান ব্রজনাথ। বলেন রায় কোম্পানীর আসল মালিক তো এসেই গেছে, আর কারোরই কিছু করার দরকার হবে না।
সুনন্দা সে কথাও উড়িয়ে দেয়, বলে ওটা একটা কথাই নয়।
অতঃপর ব্রজনাথ প্রসন্নমনে প্রস্থান করেন।
আর ভাবতে ভাবতে যান। আসল জালের ফাসটাই হাত ছাড়া হয়ে গেছে যেন। লক্ষ্মীছাড়া মেয়েটা যে হঠাৎ এমন বিগড়ে যাবে, কে জানত!
প্রথম সেই অবস্থাটা মনে পড়ল ব্রজনাথের। তখন সীমার কী উৎসাহ! হেসেখেলে কথা
–অভিনয় আমি খুব করতে পারব। দেখবেন ফার্স্ট প্রাইজের যোগ্য অভিনয় করব। এ বরং ভালোই যে, একটা বাড়ির মধ্যে একটি মাত্র মহিলার কাছে মেয়ে সেজে অভিনয়। সংসার চালাবার জন্যে তো পাবলিক স্টেজেই নামতে যাচ্ছিলাম। যা তোক একটা কিছু না করে আর পারছি না, অবস্থা অসহ্য হয়ে উঠেছে।….
আসার সময়ও কত সাহস! তাদের কত সান্ত্বনা দেওয়া! এ বাড়ির ভাত খেয়েই মতি বুদ্ধি বদলে গেল! ছি ছি!…আমায় যেন একেবারে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ভাবে। আচ্ছা কেমন তুমি ঘুঘু দেখছি! ফাঁদটা আগে দেখ তুমি!
.
কিন্তু ব্ৰজ উকিল আর নতুন কি জাল বিস্তার করবেন?
সুনন্দাকে আঘাত থেকে বাঁচাতে, সুনন্দার জাল মেয়েকে যে নিত্য নতুন জালে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। তাকে কে বাঁচাবে সেই জটিল জাল থেকে? জালের ফাস যে হাতে নিয়েছে সে তো শুধু মজা দেখছে।
.
সুনন্দা বলে, যা দুলু, টুলুকে একটা সিনেমা দেখিয়ে নিয়ে আয়। ছেলেমানুষ, কত আর পড়ালেখা করবে?
উদ্দালক বলে,–তুমিও চল না পিসিমা?
–আমি? আমি সিনেমা যাব? না বাবা! তোর পিসেমশাই গিয়ে পর্যন্ত
অতএব দুলু তারস্বরে ডাক দেয়,–এই টুলু, চল তোকে পথ দেখিয়ে সিনেমা দেখিয়ে আনি। মেলা যেন সাজতে বসিস নি আবার। তোদের মেয়েদের তো
কোনদিন সুনন্দা বলে,–দুলু, টুলুকে নিয়ে একটু নিউ মার্কেটে যা না। কতদিন কিছু সখের জিনিস কেনে নি।
দুলু চেঁচিয়ে বলে,–তাহলে অন্তত হাজারখানেক টাকা দাও সঙ্গে। টুলু যে সেই তৃষিত চাতকের মত সমস্ত দোকানের দিকে তাকাতে তাকাতে মার্কেটে ঘুরবে সে অসহ্য। আবার বলে,–এই টুলু, মনে মনে ঠিক করে নে কি কিনবি। নইলে হয়তো বাঁশবনে ডোম কানা হয়ে গোটাকতক সতরঞ্চিই কিনে বসবি।
তারপর পথে বেরিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে বলে,–কেমন বাঁচিয়ে দিচ্ছি?
–বাঁচিয়ে? না মরিয়ে? সীমা বদ্ধগভীর দৃষ্টিতে বলে,–দিনে দিনে তো আরও মরণের পথে এগিয়ে চলেছি।
উদ্দালকও তেমনি দৃষ্টিতে বলে,–শুধু তুমি একা?
–আর পারছি না। এবার মাকে বলে দিই একদিন। বলি মা, তোমার এই জাল মেয়েটাকে এবার বিদায় দাও।
-তারপর?
তারপর আর কি। জবরদখল কলোনীতে তো আজও আছে যতীন সেনের মাটির প্রাসাদ।
–তারা আবার নেবে?
–পায়ে পড়লে নেবে।
–পিসিমার একটি ভাইপো বৌয়ের দরকার নেই?
–চুপ! খবরদার! লোভ দেখিও না।
–তাহলে কি চাও যে পিসিমার ভাইপোটা সন্নিসী হয়ে বেরিয়ে যাক?
কথার ফুলঝুরি! কথার আলপনা! পথে ঘাটে বাইরে।
বাড়ি এলে অবলীলাক্রমে টুলুর বেণী ধরে টেনে পিসিমার কাছে ধরে আনে উদ্দালক। বলে, এই দেখ পিসিমা, তোমার আদরের কন্যেটি আমাকে আদৌ মানছে না। বলছি যে আয় একটু অঙ্ক শেখাই, নইলে স্রেফ গাড়ু খাবি! বলে, কি দায় পড়েছে তোমার কাছে পড়তে।
সুনন্দার চোখে নন্দনকাননের ছবি! এই তো চেয়েছিল সে। দুই ভাইবোন মিলে মিশে খাবে খেলবে, খুনসুড়ি করবে। সুনন্দার শূন্য হৃদয় পূর্ণ হয়ে থাকবে। তারপর একটি মনের মত পাত্র খুঁজে
না, ঘরজামাই কথাটা শুনতে খারাপ। রায় কোম্পানীর একজন ডিরেক্টর করে দিলেই, মান মর্যাদা বজায় থাকবে তার।আর সুনন্দার এতবড় বাড়ি খালি পড়ে থাকতে কোথায় আর বাড়ি বানাতে যাবে সুনন্দার জামাই? অনেক স্বপ্ন, অনেক ছবি।
ওদিকে সীমা বলে,–মা-র সঙ্গে আর এই ছলনা চালিয়ে যেতে পারছি না।
ছলনা ভাঙলে মা-র খুব সুখ?
তবে এই ভাবেই ন্যাকামি করে চালিয়ে যাব? কোনও দিক থেকে কোনও আঘাত আসবে না? মা তো আমার জন্যে পাত্র খোঁজবার কথা ভাবতে শুরু করেছেন।
-তাই নাকি? বল কি?
–আহা, আকাশ থেকে পড়লে যেন! বিয়ের বয়েস হয়নি আমার?
–তাহলে তো দ্রুত ভাবতে হয় উপায়!
কিন্তু কি ভাববে? কি ভেবে ঠিক করবে? সত্য প্রকাশ করলেই তো এই মুহূর্তে জালিয়াতির দায়ে ব্রজ উকিল আর কলোনীর যতীন সেনের সঙ্গে হাজতে গিয়ে উঠতে হবে সীমাকে। উঠতেই হবে।
এতবড় মর্মান্তিক অপমান সহ্য করতে পারবে না সুনন্দা। নালিশ ঠুকে দেবেই। হয়তো বা অন্য রকমও হতে পারে। আশা, বিশ্বাস, ভালবাসা, হঠাৎ সবকিছু হারিয়ে হয়তো সুনন্দা হার্টফেল করে বসবে। অনেক দিনের দুর্বল হার্ট। সীমাকে যে বড় ভালবেসেছে সুনন্দা! বড় বেশি বিশ্বাস করেছে।
সীমা এই বিশ্বাসের কাছেই কি পরাজিত হয় নি? সেও তো এসেছিল জেনে বুঝে, জালিয়াতির ধর্ম গ্রহণ করে। কলোনীর সনৎ দাশের মেয়েদের মত ইজ্জত বেচে ডুবে যাওয়া সংসারকে বাঁচাবার চেষ্টা না করে, করতে এসেছিল সতোকে বেচে।
ভেবেছিল খুব সহজ। ভেবেছিল, আমি অভিনয়ে খুব পটু। ব্রজ উকিল থাকবে সহায়। বিষয়-সম্পত্তি সব কিছু আস্তে আস্তে চলে আসবে সীমার হাতে, তারপর সে হাত থেকে কিছু কিছু চলে যাবে হস্তান্তরে। তাই খুব পারব বলে দম্ভ করে কাজে নেমেছিল সীমা, কিন্তু কোথা থেকে কি হয়ে গেল!
