আহা তাই কি সম্ভব! কূলে আসা তরণী নিজের হাতে ডুবিয়ে দেয় মানুষ, তাতে একটা ঢিল এসে পড়েছে বলে? যে দেয় দিক, ব্রজ উকিল অন্তত দেন না।
তিনি বিষমুখে আবার হাসি টেনে এনে এ বাড়িতে এসে হাজির হন।
অবশ্য মনে-মনে প্রস্তুত হয়েই হন।
যদি ওই হাড় বজ্জাত মেয়েটা সব প্রকাশ করে দিয়েই থাকে, তিনি বলবেন–আমি কি করব বলুন? আমি যা শুনেছি, তাই আপনার কাছে এসে বলেছি। আমার সরল মন, পৃথিবীতে যে এত কাপট্য আছে, তা আমার ধারণার বাইরে, জ্ঞানের বাইরে।…তবে হ্যাঁ, সাজা যদি আপনি আমায় দিতে চান, যা দেবেন মাথা পেতে নেব। পুলিশে দিতে চান, তাও দিন। বুঝব এতক্কাল ওকালতি করে খেয়ে এসে যদি এমন ফাঁদে পড়তে পারি, তবে সে আহাম্মকির সেই শাস্তিই আমার হওয়া উচিত।
নিজেকে মজবুত করেই পরদিন এলেন ব্রজ উকিল।
শুধু একটা ভাবনা, ঢুকতে ঢুকতেই যদি সেই লক্ষ্মীছাড়া বদ ছেলেটার সামনে পড়ে যান। ওকে দেখলেই যেন ব্রজনাথের মাথা খারাপ হয়ে যায়। বুদ্ধিসুদ্ধি গুলিয়ে আসে। মেজাজ ঠাণ্ডা রেখে খেলায় চাল দিতে পারেন না। চালে ভুল হয়ে যায়।
ছেলেটার কোনও বিপদ হয় না কেন ভগবান! শহরে এত লোক গাড়িচাপা পড়ে মরে!
ভগবান অবশ্য ব্রজনাথের সব প্রার্থনা পূর্ণ করে উঠতে পারেন না। তবে একটা করেন। বাড়ি ঢুকতে ঢুকতেই দেখা হয় না উদ্দালকের সঙ্গে।
আর দেখেন, অবস্থা যথাযথই আছে। ব্রজনাথকে দেখে কেউ বঁটা বা জুতো নিয়ে তেড়ে আসে না, চাকর যেমন চেয়ার এগিয়ে দেয়, তেমনই দিল, যেমন বাড়ির মধ্যে থেকে চা আসে তেমনই এল।
তার মানে ফাঁস কিছু হয়ে যায়নি।
পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে মনে মনে একটু হাসলেন উকিল।
হুঁ হুঁ বাবা, পথে এসো!
এ জীবনে দেখলাম ঢের! মুখে আস্ফালন করে অন্যকে অপদস্থ করা যত সোজা, স্বার্থহানি করে বসা তত সোজা নয়।….বাছা তখন তো খুব মান দেখালেন, তেজ দেখালেন, বাপকে অপমান করে এলেন, ফিরে এসে তো বুঝলেন, কী রাজ্যিপাটটি ভাগ্যে জুটেছে!….
তেজ দেখিয়ে সব ফাস করে ফেললেই তো এই সোনার খাটে গা আর রূপোর খাটে পা ত্যাগ করে ফের সেই যতীন সেনের ছেঁড়া কাঁথায় ফিরে যেতে হবে!
হুঁ!
বেশ গুছিয়েই বসেন উকিল।
সুনন্দা আসে। বলে আজ আবার কি কাজ? সই?
ব্রজনাথ হাসেন। অমায়িক হাসিনা আজ আর কোনও কাজ নিয়ে আসি নি। আজ শুধু ওই ইয়ে আপনার মেয়েকে দেখতে এসেছিলাম! কাল সেই পুরনো ইয়েদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাতের পর মনটা কেমন থাকল–মানে, হঠাৎ একা একা চলে এসেছিল তো? তাই ভাবলাম–
সুনন্দা অবাক হয়ে বলে–সে কি? একা চলে এসেছে কি? আপনি?
ব্রজ উকিল প্রমাদ গোনেন। এ যে তিনি নিজেই খাল কেটে কুমীর আনলেন! এ আলোচনা না ফাঁদলেই হত! হারামজাদা মেয়েটা এখানে এসে কিছুই বোস কাণ্ড করে নি তাহলে?
উঃ কত বড় শয়তান!
বাপকে অপমান করে আসার অর্থ তাহলে অহঙ্কার। সেই ছেঁড়া মাদুর আর ঘেঁড়া লুঙ্গি দেখে নাক সেঁটকানি! বুঝেছি!
তা এসব চিন্তা ক্ষণ মুহূর্তের।
নিজেকে তার মধ্যেই সামলে নেন ব্রজনাথ। হেসে বলেন–হ্যাঁ তা সে একরকম তাই বৈ কি, মিসেস রায়! আমি ওকে পৌঁছে দিয়ে ভাবলাম ওদের ওখানে বসে থেকে কি করব, যতই হোক আমি একটা বাইরের লোক, কথাবার্তা কইতে অসুবিধে বোধ করবে, একটু ঘুরে আসি। আধঘণ্টা–জাস্ট আধঘণ্টা, তার বেশি দেরী করিনি। গিয়ে শুনি–সেখান থেকে নাকি কেঁদে কেটে চলে এসেছে
দুরুদুরু বক্ষে অপেক্ষা করেন ব্রজনাথ সুনন্দার অভিব্যক্তির।
সুনন্দা ঈষৎ ভুরু কুঁচকে বলে, হ্যাঁ আমিও তাই বুঝলাম। মাথা ধরেছে বলে শুয়ে ছিল। দুলু অনেক ডেকেডুকে কথা বলে তবে–আচ্ছা সেই বাড়িটা কোথায়?
উকিল হাত জোড় করে বলেন, ওইটি মাপ করতে হবে। তাদের কাছে আমি বাক্যদত্ত আছি। প্রকাশ করব না। জানে তো–আপনি অবস্থাপন্ন, আপনি মহৎ। নিশ্চয়ই তাদের ডাকবেন, দয়া প্রকাশ করবেন, তাই আগে থেকে সাবধান হয়েছে। এই তো দেখুন না, মেয়ে চলে আসার পর যখন গেলাম, বলল, দেখুন মায়ায় পড়ে দেখতে চেয়ে ছিলাম, এখন বুঝছি চাওয়াটা উচিত হয়নি। ওর মনে আর পুরনো স্মৃতি না জাগানোই ভাল।…আর চাইব না!
সুনন্দা সেই অদেখা, অজানা ভদ্রলোকের মহৎ বিবেচনায় মুগ্ধ হয়। অতএব সেও কিছুটা মহৎ বিবেচনায় আসে, না না সে কি কথা! যাবে বৈ কি! যাবে। তাঁরা ওর কত করেছেন। তবে আরও কিছুদিন যাক। মনটা বসুক।
–এরপর ব্রজনাথ প্যাঁচের কথায় আসেন।
–তা আমায় এবার ছুটি দিন মিসেস রায়।
–আপনাকে ছুটি? সে কী? কেন?
সুনন্দা একসঙ্গে তিন চারটে প্রশ্ন করে বসে। এ ছুটি যে দু-চার দিনের নয়, চিরদিনের ছুটি, তা যেন ব্রজনাথের কথার সুরেই ধরে ফেলে সুনন্দা।
ব্রজ উকিল মৃদু হেসে বলেন, কেন? অনেকদিন তো আপনার কাছে খাটলাম, এবার ক্লান্তি এসেছে। তাছাড়া আপনার ভাইপো বড় হয়েছে, সব বুঝতে শিখেছে, তাকেই দিন ভার।
সুনন্দা হেসে ওঠে,–তাকে ভার দেব? হঠাৎ এ কী কথা?
না না হঠাৎ নয়। এ আমার চিন্তার ফল মিসেস রায়। সে বুদ্ধিমান বিচক্ষণ, শিক্ষিত ছেলে, তার পিসির বিষয় সম্পত্তি নষ্ট হচ্ছে কি না সে বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক দৃষ্টি, কাজেই
সুনন্দা বোঝে এ হচ্ছে অভিমান।
উদ্দালকটা নির্ঘাৎ কোনও কড়া পরিহাস করে বসেছে। অতএব সুনন্দা উদ্দালককেই স্রেফ ওড়ায়। তার কথা যে ধর্তব্যের বস্তু নয়, সে কথা বলে বারবার। এবং এ কথাও বলে, উকিল সাহেব ছিলেন তাই এখনো রায় কোম্পানী টিকে আছে, ইত্যাদি ইত্যাদি…
