হ্যাঁ, হাসছিল টুলু। ক্ষুব্ধ ব্যঙ্গের হাসি।
ঠিক সেই সময় আর একবার হেসে উঠল, সশব্দ সতেজ।
হেসে উঠে বলছিল, হা, ওই আপনাদের রায় কোম্পানীর সর্বেসর্বা ব্রজনাথ উকিল! যেহেতু উনি দেখলেন, দীর্ঘকাল ধরে সিঁধ কেটে কেটে উনি যখন সবে সেই সিধের গর্তের মধ্যে দিয়ে ঘরে ঢুকতে যাচ্ছেন, তখনই হঠাৎ রায় কোম্পানীর মালিক, তার এক ভাইপো পুষতে শুরু করলেন, আর ধূর্ত ভাইপোটার চোখে উকিলের স্বরূপ ধরা পড়ে গেল, সেই হেতু সেই ভাইপোটাকে সরিয়ে ফেলবার একটা উপায় আবিষ্কার করতে বসলেন তিনি।….ছলে বলে কৌশলে যে করেই হোক ওই ভাইপোটাকে গদিচ্যুত করতে হবে, সেই চিন্তা থেকেই আমার উদ্ভব।….
উদ্দালক প্রায় চেঁচিয়ে উঠে বলে,কী? বলছ কী?
–যা সত্য ঘটনা সবই বলছি। বলতে যখন বসেছি, সবটাই বলতে দিন। এই ছদ্মবেশ অসহ্য হচ্ছে। নিজেকে নরকের কীট মনে হচ্ছে। আর প্রতিনিয়ত আপনার ভোলা মনের স্নেহের ডাককে ফিরিয়ে দিতে দিতে–যাক কী বলছিলাম? হ্যাঁ, বুদ্ধিমান উকিলটি ভাবলেন, এই পরিস্থিতির মাঝখানে আসল কোনও মালিককে যদি খাড়া করা যায়, যে ওই ব্রজ উকিলের কথায় উঠবে বসবে নাচবে গাইবে, নাটক অভিনয় করবে, তাহলে তার সব দিক বজায় থাকে।…অতএব রচিত হল একটি গল্প। অনবদ্য গল্প! এক অলীক ডাক্তার, আর অলীক মহিলাকে নায়ক নায়িকা করে! নায়িকাটি মৃত্যুকালে ডাক্তারের কাছে স্বীকার করছেন
টুলু!
খাটের বাজুতে বসে থাকা উদ্দালক হঠাৎ বিছানায় বসে থাকা সীমার কাধটা চেপে ধরে রুদ্ধকণ্ঠে প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে–টুলু!
সীমা মুখ তুলে তাকায়।
আস্তে নিজের কাঁধটা সরিয়ে নেয়।
আর এবার ঈষৎ আস্তেই বলে,–খুব ভয় পাচ্ছেন, না? আর ঘৃণায় শিউরে উঠছেন? …ভাবছেন এতবড় পাপও সম্ভব? কিন্তু সীমা একটু হাসে, ব্রজ উকিল বললেন, ধর্মকাজ করলাম। একটি সন্তানহারা নারীর শূন্যকোলে তার হারানো সন্তানকে ফিরিয়ে এনে দিলাম, আর একটি বাস্তুহারা অন্নহারা দুঃখী পরিবারকে অন্ন জোগানোর প্রতিশ্রুতি দিলাম।…ভারি সুন্দর করে কথা বলতে পারেন উকিলবাবু। তবে ভদ্রলোক এত দেখে আর এত জেনেও এটা জানেন না যে, মানুষ যখন কিছু খেতে পায় না, তখন মুখ বুজে বসে থাকে। কিন্তু খেতে পেলেই তার হাঁ খোলে। সেই খোলা হাঁ তখন আরও চাওয়ার দাবি তোলে। অন্ন পেলে বস্ত্র চায়, বস্ত্র পেলে বাড়ি গাড়ি চায়, আর তাও যদি পেয়ে যায় তো কুবেরের ভাণ্ডারটাকেই চেয়ে বসে।…তাই জবর-দখল কলোনীর যতীন সেন এই রায় বাড়ির লোহার সিন্ধুকের চাবিটাই দাবি করে বসতে দ্বিধা করে না তার সেই বিক্রীকরা মেয়ের কাছে।
কথার শেষে ঝুপ করে আবার শুয়ে পড়ে সীমা, আবেগে উদ্বেল হয়ে ওঠে তার দেহ।
উদ্দালক এতক্ষণ অবাক অপলক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে তাকিয়ে শুনছিল এই অসম্ভব অভাবনীয় কাহিনী। ভাবছিল–এ কী সত্যি! না এই মেয়েটা এতদিনের পরিবেশ থেকে চলে এসে বেদনায় আর পিসিমার বুভুক্ষু মাতৃস্নেহের প্রবল ধারায় হাঁপিয়ে উঠে শিকল কাটতে চায়। তাই এই গল্প। কে বানাচ্ছে এক অসম্ভব অনবদ্য গল্প? উকিল ব্রজনাথ, না সীমা নিজেই?
কিন্তু সেই বানানো কাহিনী বলতে কি এমন আবেগ আসে?
তবু উদ্দালক ধীর স্থির বিবেচনাশীল।
উদ্দালক বোঝে, যদি সত্যিই সীমার গল্প সত্যি হয়, যদি সত্যিই সীমাকে নিয়ে এই ভয়ানক একটা ষড়যন্ত্র রচিত হয়ে থাকে, কিছুতেই চলবে না সে ষড়যন্ত্র সহসা উদঘাটিত করে বসা।
তাহলে সুনন্দা পাগল হয়ে যাবে! সুনন্দা হার্টফেল করবে!
সুনন্দাকে সেই শোচনীয় পরিণতি থেকে বাঁচাতেই মিথ্যার জাল বজায় রাখতে হবে যথাযথ। বজায় রাখতে হবে সুন্দর সুনিপুণ ভাবে।
অতএব উদ্দালককেও নিতে হবে সেই ষড়যন্ত্রের অংশ। সেই মিথ্যার জাল বোনার কাজে তাকেও লাগাতে হবে হাত। পিসিমাকে সুখী করবার চেষ্টায় আনতে হবে নতুন উৎসাহ, ভাবতে হবে নতুন চিন্তায়।
তাই উদ্দালক আস্তে ওর কেঁপে ওঠা পিঠটায় একটু হাত রেখে বলে,–সত্যি ঘটনা যাই হোক টুলু, তোমায় হাত জোড় করে মিনতি করছি যা বলেছ তা এখন ভুলে যাও। পিসিমার কাছে চট করে কিছু বলে বোসো না। বড় বেশি আঘাত পাবেন। বহুদিন ধরে ক্ষয় হয়ে যাওয়া মানুষটা হঠাৎ এই নতুন আঘাতের ধাক্কা সহ্য করতে পারবেন না। আমার এ মিনতিটা রাখো।
তুই শব্দটা আর যেন সহজে মুখে আসে না। টুলু সেই সহজের মুখটায় পাথর চাপিয়ে দিল।
সুনন্দার ঠাকুর ঘর বন্ধ করার শব্দ পাওয়া গেল। এইবার এখানে এসে পড়বেন।
উদ্দালক তাড়াতাড়ি খাটের বাজু থেকে নেমে পড়ে, ব্যস্ত চাপা গলায় বলে–এই লক্ষ্মীমেয়ে, দোহাই তোমার উঠে পড়। অভিনয়ের ক্ষমতাটা আরও কিছুটা ভাল করে দেখিয়ে দাও……
–আমি পারব না।
–ভগবানের দিব্যি টুলু, দোহাই তোমার।
সীমা উঠে পড়ে তীব্র ভৎর্সনাময় অথচ বেদনালাঞ্ছিত দুটি চোখ তুলে একবার উদ্দালকের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধগলায় বলে–বেশ! তবে যেদিন এই মিথ্যা-জাল বাইরের ঝোড়ো হাওয়ায় ছিঁড়ে পড়বে, সেদিন আর আমার কোনও হাত থাকবে না। সেদিন ওঁকে বাঁচাবার দায়িত্ব কে নেবে, আপনিই বুঝবেন।
জল উপছে পড়ে সেই দুই চোখে। আগুন উঁকি দেয় তার কোণে।
উদ্দালক সেই বিচিত্র দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আস্তে বলে–উনি নয় টুলু, মা।
.
ব্রজ উকিল কি সত্যই অভিমানে রায়বাড়ি ত্যাগ করলেন? মনের দুঃখে বিবাগী হয়ে গেলেন?
