-পাগলের মত কথা বলবেন না।
নাঃ, সেই আপনি আজ্ঞে, দাদা না বলা! এর একটা হেস্তনেস্ত হওয়া দরকার। আর তার প্রধান সোপান হচ্ছে, টুলু তুই! টুলু তুই এমন বেয়াড়া আড়বুঝো মেয়ে কেন রে? আমাকে কিছুতেই দাদা বলবি না কি জন্যে? কিছুতেই আপনার ভাববি না কি জন্যে? তাহলে লোকে যা বলে, সেটাই সত্যি বলে ধরে নিতে হবে?
সীমা চমকে উঠে রুদ্ধকণ্ঠে বললে–কী বলে লোকে?
–বলে? তা বেশ ভালো ভালো উঁচুদরের কথাই বলে। বলে, তোর বাবার বিষয় সম্পত্তিতে আমি নাকি আগে থেকেই ভাগ বসিয়ে বসে আছি, তাই তুই আমায় দুচক্ষে দেখতে পারিস না। তুই নাকি দারুণ হিংসুটে
ভুল ভুল! সব মিথ্যে, সব বাজে।–বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ে সীমা।
উদ্দালক আবার পা দোলানো সুরু করে বলে, তা বেশ, সেটা যে মিথ্যে, বাজে, ভুল, সেটাই প্রমাণিত করছিস না কেন? কেন সহজ প্রসন্ন মনে আমাকে দাদা বলে গ্রহণ করতে পারছিস না? এতে পিসিমা মনে কত কষ্ট পান সেটা ভেবে দেখ? ভেবে দেখ বেচারী মহিলাটির সারাজীবনের ইতিহাস।….সেই কোন অতীত কালে একটি শিশুকে কোলে পেলেন, নেহাতই আধো ভাষায় মা ডাক শুনলেন, তারপর হারালেন সে সব। ভগবান নিল না, নিল কিনা মানুষ! কতবড় কষ্ট সেটা ভাব! এমনি ভাগ্য, তারপর আর কোনও শিশু এল না ওঁর কাছে, সেই মা ডাক আর শুনলেন না। এর মধ্যে স্বামী গেছেন, একা সংসারে চলার কষ্ট পাচ্ছেন, উকিল ম্যানেজার সবাই মিলে ঠকাবার তাল খুঁজছে–
–শুধু তারাই নয়,সীমা আবার উঠে বসে। বিদ্যুৎ গতিতে যেন।
তারপর বিদ্যুৎ গতিতেই বলে,–শুধু তারাই নয়, সবাই। পৃথিবী সুদ্ধ সবাই আপনার পিসিমাকে ঠকাবার তাল খুঁজে বেড়াচ্ছে, ঠকাচ্ছে।
উদ্দালক হেসে ফেলে বলে,–কথাটা অবশ্য খুব মিথ্যে বলনি। আত্মীয় বন্ধু, চাকর দাসী, যে সেখানে আছে, কেউ কিছুতেই সমর্থন করতে পারে না, একটি মাত্র বিধবা মহিলার এত টাকা থাকবে, রায় কোম্পানীর মত অতবড় একটা কোম্পানী থাকবে। কাজেই সে ভারটা যাতে সহজে লাঘব হয় তার চেষ্টা করবে না?…এই তো বেশী কথা কি, আমিই কি কম ঠকাচ্ছি, পিসিমা আমাকে পুষছেন, তাকে একটু দেখাশোনা করব বলে। অথচ ব্যাপারটা এই দাঁড়াচ্ছে তিনিই আমার দেখাশোনা করছেন। আমি শুধু অন্ন ধ্বংসাচ্ছি। এও একরকম ঠকানো বৈকি। তা ওটা পৃথিবীর ধর্ম। তবু মানুষের হৃদয়ের দিকেও তাকাতে হবে। ভাবতে হবে ওই প্রতারিত বঞ্চিত আর চিরদুঃখে নিমজ্জিত মানুষটা যখন এতকাল পরে সেই হারানো সন্তানকে ফিরে পেল, তখন–সে যাতে সেই পাওয়াটা সম্পূর্ণ পেতে পারে তার জন্যে সবাই মিলে চেষ্টা করি।
সীমা একটু অদ্ভুত হাসি হেসে বলে,আর যদি এমন হয় ওই ফিরে পাওয়াটাই একটা মস্তবড় প্রতারণা, তা হলে আর সর্ণের স্বাদ কে দিতে পারবে?
উদ্দালক ঈষৎ থতমত খেয়ে বলে–ফিরে পাওয়াটা প্রতারণা! তার মানে?
–কি? এত স্পষ্ট পরিষ্কার স্বীকারোক্তির পরও আপনি মানে খুঁজছেন?…হঠাৎ একটা নিষ্ঠুর। হাসি হেসে ওঠে সীমা,–ভারী আক্ষেপ আপনার, আপনাকে দাদা বলিনা বলে। তাই না? জানেন, আমি কী? ….কতবড় ঠগ জোচ্চোর! তবে আরও স্পষ্ট করে বলি শুনুন–এই রায় বংশের কেউ নই আমি। কোনদিনও ছিলাম না। স্রেফ নন্দীবাগান কলোনির যতীন সেনের মেয়ে।
কী? কী বলছ?
–ঠিক বলছি–আরও নিষ্ঠুর আর আত্ম-ধিক্কারের হাসি হেসে ওঠে সীমা–আরও শুনতে চান? শুনুন–শুনছেন যখন ভাল করেই শুনুন–আমার বাবা বেশ একটি মোটা টাকা নিয়ে আমাকে বেচেছেন, আপনাদের ধর্মপ্রাণ ব্রজ উকিলের কাছে। উকিল মশাই অবশ্য বিরাট এবং মহান একটি উদ্দেশ্য সাধনের জন্যেই এই পুণ্য কাজটি করেছেন।
.
বারে বারে হাসির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।
পুজোর ঘরে বসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সুনন্দা। ধীরে ধীরে হাত চালায়। ঠাকুরের ভোগ হবে, শয়ন হবে, সকালের আরতি পুজোর জন্যে আবার বাসনপত্র ধুয়ে মেজে রাখতে হবে, কাজ তো কম নয়। আর এ ঘরের সব কাজ সুনন্দা নিজের হাতেই করে।
মনটা শান্ত করে নিত্যকর্মে মন দিল সুনন্দা। হাসছে টুলু। তার মানে মনের মেঘ কেটে গেছে। যাবে, যেতেই হবে। দুলুর হাতে পড়লে মরা মানুষও হাসে। ওর কাছে আর টুলুর মনখারাপ, মাথাধরা এসব ধোপে টিকল না।…এবার থেকে যেখানেই যাক, দুলুর সঙ্গেই যেতে বলব। কিছুতেই ওই উকিলবাবুর সঙ্গে পাঠাব না।…স্বীকার করছি তিনি আমার মস্ত উপকারী। উনি যা করেছেন তার জন্যে চিরঋণী হয়ে থাকব আমি, শুধু এ জন্মে কেন, হয়ত শত জন্মেও ওঁর ঋণ শোধ করতে পারব না আমি। উনিই আমার হারানো মাণিক উদ্ধার করে এনে দিয়েছেন, তবু হে ঠাকুর, তোমার কাছে তো কিছু ঢাকা থাকে না, সবই দেখছ তুমি, সবই জানছ বুঝছ, তাই তোমার কাছে স্বীকার করছি ওঁকে আমার ভাল লাগে না। ওঁকে আমার ভয় করে। মনে হয় উনি যেন টুলুকে নিয়ে কী এক প্যাঁচ কষছেন, যেন দিয়ে আবার কেড়ে নেবেন! …লোকটা চিরদিনই আমার হিতৈষী, এই রায় কোম্পানী উনিই দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, তবু চিরদিনই দেখলে কেমন যেন বিতৃষ্ণা আসে। টুলুও যে ওঁকে দেখতে পারে, তাও নয়। তাই ভাবছি ওঁর সঙ্গে আর পাঠাব না টুলুকে।….দুলু আমার সোনার ছেলে, চাদে কলঙ্ক আছে তো দুলুতে নেই। ও নিয়ে যাবে ওর বোনকে। সেই ভালো।
চারদিক থেকে ভেবে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছে বাঁচে সুনন্দা। আরও বাঁচে আর একবার খুব সতেজ হাসির শব্দ শুনে।
