এই তার পরিণাম। দুদণ্ড এসে ঝগড়া করে চলে গেলি!
ছি ছি ছি! তবু ব্রজনাথের দায়িত্ব আছে। ছুটে ফিরে যান।
.
সীমা ফিরেছে? ব্যস্ত হয়ে এসে প্রশ্ন করেন।
দুর্ভাগ্য তার যে পড়লেন উদ্দালকেরই সামনে। উদ্দালক হাতে একটা বই লোফালুফি করতে করতে বলল, গেল আপনার সঙ্গে, আর আপনি এসে জিগ্যেস করছেন ফিরল কি না?
বরাত আমার তাই জিগ্যেস করছি। সেখানে ছেড়ে দিয়ে একটু ঘুরে আসতে গিয়েছিলাম। জানি গল্পগাছা করবে বসে বসে, করে নিক। মা বাপের–ইয়ে ওই যাদের মা না মাসী বলত তাদের সঙ্গে আর কি–আমি ঘুরে এসে নেব। তা গিয়ে শুনলাম একা গট গট করে চলে এসেছে।
কই এখানে তো আসেনি!
আসে নি তার মানে?
মানে আপনিই জানেন।
দেখ ছোকরা। তোমার ঔদ্ধত্য আমি অনেক সহ্য করেছি আর না–ব্রজ উকিল ক্ষেপে ওঠেন। সীমার অসভ্য আচরণ, যতীনের যাচ্ছেতাই, ধীরার গালমন্দ সর্বোপরি উদ্দালকের এই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ভাব ক্ষেপে ওঠার ইন্ধন জোগায়।
তোমার পিসি ঠাকরুণ, ওই মিসেস রায়কে বলব, হয় আমায় রেহাই দিন, নয় তোমাকে সরান।
সে কি, আপনাকে এক্ষুনি রেহাই দেবেন কি? উদ্দালক নিতান্ত ভাল মানুষের মত মুখে বলে, রায় কোম্পানীকে দেউলে করান, ব্যবসা লাটে তুলে বেনামীতে নীলামে ডেকে নিন, তবেই তো? এতদিন ধরে নৌকা বেয়ে কূলে এসে তরী ডোবাবেন?
কী বললে! কী বললে বেয়াদপ ছোকরা–রাগে থর থর করে কাঁপতে থাকেন ব্রজনাথ। সন্দেহ থাকে না তার–সর্বনাশী মেয়েটা সব ফাস করে দিয়েছে। চড়াগলায় বলে ওঠেন, নিশ্চয় সে এসেছে, ডাকো তাকে, কেন সে আমার সঙ্গে এরকম ব্যবহার করল শুনে যাই।
ডাকা যাবে না, উদ্দালক নিরীহ গলায় বলল, মাথা ধরেছে। ঘর অন্ধকার করে ঘুমোচ্ছে।
বেড়িয়ে ফিরে ঘর অন্ধকার করে ঘুমোচ্ছে?
সুনন্দা বিরক্তি-মেশা গলায় বলে নিশ্চয় মাথা-টাথা ধরেছে। এই রকম একটা কিছু হবে এ-ভয় আমার ছিল। তাই ইচ্ছে ছিল না আবার পুরনো জায়গায় যাওয়া আসা করে। যতই হোক এতকালের জায়গা, চেনা পরিচিত জগৎ! মন খারাপ তো হতেই পারে।….তা দরকার কি ডেকে কষ্ট নেওয়া, ছেঁড়া চুলে গেরো দেওয়া! আমার তো এখনো ঠাকুর ঘরের কাজ শেষ হয়নি। আরতি পুজো সবই বাকি। শোবার ঘরে ঢুকতে পারব না, কি না কি ছুঁয়ে মরব। দুলু, দ্যাখ দিকি একবার মেয়েটা পড়ে কাঁদছে কিনা।…কাঁদছে নির্ঘাৎ। দ্যাখ বাবা!
নিতান্ত বিরক্ত মন নিয়েই ঠাকুর ঘরে ঢোকে সুনন্দা। এ মন নিয়ে পুজো হয় না। কিন্তু উপায় কি? তাড়াতাড়ি সেরে নিয়েই যেতে হবে মেয়েটার কাছে।
তবে পুজোর মন নিয়ে পুজোর ঘরে কবেই বা ঢুকতে পেয়েছে সুনন্দা!….ঢুকেছে কেবলই কান্নার মন নিয়ে। বিরহের কান্নার মন।
সে কান্না পুজোর ঠাকুরকে পাবার আকুলতায় চিরবিরহী আত্মার ক্রন্দন নয়, নিতান্তই একটা ছোট্ট পুতুল হারিয়ে ফেলার কান্না সে।
যখনই কোন কারণে মন উদ্বেল হয়ে উঠেছে, তখনই সুনন্দা কান্না লুকোতে ঠাকুর ঘরে ঢুকেছে। এই একটা পরম আশ্রয়ের আর আড়ালের জায়গা মানুষের। মানুষের দেওয়া আঘাতের বেদনাকে নিয়েও সেখানে গিয়ে উজাড় করে দেওয়া যায় নিজেকে। …আর কোন এক সময় হয়তো সেই আঘাতের বেদনাই বিরহ বেদনায় রূপান্তরিত হয়ে ওঠে।
কিন্তু আজ সুনন্দার মনে বেদনা নয়, বিরক্তি। এই মন নিয়ে বসে বসে নিজেকে উজাড় করে দেবার ইচ্ছে হবে না। কোনমতে হাতের কাজ সেরে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে আনতে কষ্ট হবে। তাই উদ্দালককে পাঠিয়ে দিয়ে ব্যস্ত হাতে আরতির যোগাড় করতে থাকে সুনন্দা।
.
এ ঘরে উদ্দালক এসে ঢোকে।
ফট করে আলোটা জ্বালতেই ধড়মড় করে উঠে বসে সীমা। বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকায়।
উদ্দালক খাটের বাজুটার উপর উঠে পা দোলাতে দোলাতে বলে–যাক তবু ভালো, চোখ শুকনো। জলের বদলে আগুন! অবশ্য প্রাণবধের ব্যাপারে দুটোই সমান কার্যক্ষম। দেখো বাপু নিধি, ভস্ম-টস্ম করে বোসো না।
সীমা চোখের সেই আগুনকে আরও তীব্র করে বলে ওঠে–আপনি এ ঘরে এসেছেন কেন? কে আপনাকে আসতে বলেছে?
–বলেছেন অবশ্য আমার বিবেচনাময়ী পিসিমা। মানে স্বয়ং গৃহকর্ত্রী।
–গৃহকর্ত্রী হলেই তিনি যাকে যা খুশি অর্ডার দিতে পারেন? কাউকে যদি কোনও একটি ঘরে দয়া করে থাকবার অনুমতি দিয়ে থাকেন তার সুবিধে, অসুবিধে পর্যন্ত দেখবেন না?
উদ্দালক ঈষৎ অবাক হয়ে বলে–তুমি হঠাৎ হঠাৎ রেগে আগুন হয়ে ওঠো কেন বল তো? গুরুজনের সম্মান রাখার প্রশ্নটাও যেন ভুলে যাও মনে হয়। মানে বোঝা যায় না। ঈশ্বর জানেন কোন ধরনের পরিবেশে বেড়ে উঠেছ তুমি। তবু লেখাপড়াও তো শিখেছ? এভাবে কেন নিজেকে এ বাড়ির থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে চাও? স্বাভাবিক বুদ্ধি, এবং বিদ্যেসাধ্যি এই দুটো মিলিয়ে একটা হিতাহিত জ্ঞানও তো থাকা উচিত।
–যা উচিত তা যদি সকলের মধ্যে না থাকে? সীমা তীব্রস্বরেই বলে,–সবাই যদি আপনার মত মহামহিম না হতে পারে? এখন যান, আমার ভীষণ মাথা ধরেছে!
উদ্দালক ঈষৎ গম্ভীর হয়ে বলে,–সে তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু রোগটা সারানোও তো দরকার?
–না, কোনও দরকার নেই। আপনি যান।
উঁহ উদ্দালক দৃঢ়স্বরে বলে–এত সহজে আমাকে হঠাতে পারবে, এ আশা ছাড়ো। পিসিমা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন তার আদরিণী হারানিধি নির্জনে পড়ে অশ্রুবিসর্জন করছেন কিনা দেখতে। আর আমি ঠিক করেছি, শুধু দেখতে নয়, সে অশ্রুর মূল উৎপাটন করতে। কেন তুমি মন খারাপ করবে? যাঁদের কাছে এতদিন থেকেছ, তাদের জন্যে মন কেমন করা খুবই স্বাভাবিক, না করলেই বরং হৃদয়হীন বলতাম। তাই বলছি–তাদের তো কাছাকাছি এনে রাখলেই ভাল হয়
