আশ্চর্য! টাকা বস্তুটা এমনই প্রভাবময়। টাকাবানের প্রতি হিংসে আসে, বিদ্বেষ আসে, কিন্তু কিছুতেই অগ্রাহ্য আসে না।
তা ধীরা চলে গেলে ওরা জটলা করে ঠিক করেছিল সীমা যখন আসবে, দেখতে যাবে। অবিশ্যি লেখাপড়া নিয়েই বেশি বেশি থাকত সীমা, এই পদ্ম মিনা রাধা ঊষাদের মত শুধু ঘরসংসারী কাজ আর পাড়াবেড়ানো নিয়ে থাকত না। তবু একরকম বন্ধু বৈ কি। ওদের জন্যে সীমা এখানে একটা ইস্কুল বসাবার অনেক চেষ্টা করেছে, হয়ে না ওঠায় ওদের সেলাই ইস্কুলে ভর্তি হতে পরামর্শ দিয়েছে, আরও কত সূত্রে কথা বলেছে, মিশেছে।
ওরা দেখবে না সীমার কখানা হাত বেরুলো?
.
এমনও হওয়া অসম্ভব নয়, সীমা সবাইকে মনে রেখে সকলের নামে নামে একখানা করে শাড়ী আনবে। খুব দামী না হোক, মাঝারি মত। বাচ্ছাদের জন্যে লজেঞ্চুস চকোলেট আনতে পারে। নয়তো এও হতে পারে আশে পাশে যে বাচ্ছাগুলো বড় ঘোরে। তাদের হাতে হাতে টাকা দেবে কিছু খাস বলে।
.
সারাদিন এইসব জল্পনার শেষে, এসে দাঁড়িয়েছিল ওরা।
কিন্তু সীমা যেন ওদের বড় যত্নে আঁকা একখানা সুন্দর ছবির উপর কালির পোঁচ টেনে দিয়ে গেল। সীমা যেন ওদের সাজানো খেলাঘরে একখানা থান ইট বসিয়ে দিয়ে গেল।
.
সীমা চলে যেতেই বেড়ার এদিকে চলে এল ওরা। মুচকি হেসে বলে, কিরে রীতা, দিদি কি দিল?
রীতা ঠোঁট উল্টে উত্তর দেয়, ওই যে ওখানে পড়ে আছে।
তবু ভাল। আমাদের তো মনে হল চিনতেই পারল না তোদের দিদি। না একটু হাসি গল্প, না একটু খানিক বসা। বড় মানুষের পুষ্যি হলে বুঝি এমনিই হয়? রীতা দিদির উপর রাগে জ্বলছিল। অনেক আশায় নিরাশ করেছে দিদি।
গিন্নীর সেই তিন আলমারি শাড়ীর থেকে লুকিয়ে দুচারখানা শাড়ী দিদি রীতার জন্যে নিয়ে আসবে, এটা যেন নিশ্চিত ছিল। তার বদলে কিনা একখানা সাধারণ ধনেখালি ডুরে!
যখন লেখাপড়া করত, তখন যে খুব বলা হত, দেখ রীতা, মেয়ে বলেই যে বড় হয়ে গেলেই বিয়ে করতে হবে আর ঘরসংসার করতে হবে, তার কোন মানে নেই। মেয়েকেও ছেলের মত হতে হবে। দেখিস আমি কক্ষণো বিয়ে করব না। চাকরী করব, বাবার কষ্ট ঘোচাব সংসারের অবস্থা ফেরাব।
রীতার অবশ্য তাতে খুব সায় ছিল, তবে রীতার বিয়েটা হওয়া দরকার। রীতা ঘরসংসার ছাড়া কিছু ভাবতে পারে না। কিন্তু সে যাক, চাকরী না করেই তো দিদি রাজ ঐশ্বর্যের মালিক হয়ে গেল, তা এই কি প্রতিজ্ঞা রক্ষার নমুনা? দশটা টাকা দিয়ে গেল না মার হাতে? অথচ রীতা ভেবে রেখেছিল হয়তো একশো দুশো টাকা রীতাকেই দিয়ে যাবে হাতে গুঁজে, চোখের জল ফেলে।
ছি ছি ছি!
চারিদিক থেকেই ছি ছি ধ্বনি উঠছিল।
এই ছিছিক্কারের মধ্যে ব্রজনাথ এসে দাঁড়ালেন।
বলা বাহুল্য মোটেই সসম্ভ্রম সম্বর্ধনা পেলেন না।
যতীন সেন বলে ওঠে, কোন ঘোটলোকের বাড়ি মেয়েটাকে ভর্তি করলেন মশাই? এই কদিনেই তো মেয়ে বাপের নাম ভুলে গেল! এ করব, তা করব অনেক তো আশ্বাস দিয়েছিলেন, নমুনা তো দেখছি চমৎকার। মেয়ে আমার এলেন শূন্য হাত ঢনঢনিয়ে, মা বলে দশটা টাকা হাতে দেবার ক্ষ্যামতা হল না। বলি মেয়েকে যে আমি আপনার হাতে সঁপে দিয়েছি সে কি অমনি? ….এর থেকে পাবলিক থিয়েটারে প্লে করতে দিলে তো আমার ছিল ভাল।
ধীরা ওঘর থেকে শব্দভেদী বাণ ছোঁড়ে। বেশ ভালই ছোঁড়ে।
ব্রজ উকিল রাগেন না, হেঁ হেঁ করেন।
এসব যে একটু আধটু শুনতে হবে সে কথা ব্রজ উকিলের জানা। যেখানে শুধু অর্থলোভে এতবড় কাণ্ডটায় সায় দিতে পারে মানুষ, সেখানে সে লোভের পুরণ যে সহজে হবার নয় সে কথা ঘুঘু ব্রজনাথ না বুঝবেন কেন?
কিন্তু সে যাক, আসামী কই? কোথায় সীমা? এসেই কি পাড়া বেড়াতে গেছে নাকি?
পুরানো বান্ধবীদের জন্যে কাতর হয়েছিল বোধ হয়? অবিশ্যি হতে পারে। কিন্তু তাকে যে ব্রজ উকিল বলে নিয়ে এসেছেন দেরী না করতে।
ডাক ডাক, কোথায় গিয়ে বসে আছেব্রজনাথ তাড়া দেন।
আর সঙ্গে সঙ্গে তাড়া দিয়ে ওঠে যতীন সেন। ডাকব? কোন চুলো থেকে? সে কি এখনো এই আঁস্তাকুড়ে আছে নাকি? তিনটে বৈ চারটে কথা বলেনি, ঠিকরে বেরিয়ে গেল। আমায় কেবল মারতে বাকি রেখেছে
তা রাখুক। বাকী না রাখলেও আপত্তি ছিল না ব্রজনাথের, নিজেরই তার দুঘা বসিয়ে দিতে ইচ্ছে হচ্ছিল ওই মেয়ে চামারটাকে। কিন্তু আসল কথায় যে মাথায় হাত পড়েছে।
চলে গেছে! একা গেছে!
এল ব্রজনাথের সঙ্গে, ফিরবে একা, সুনন্দা কি বলবে!
আবার বলছে রাগারাগি করে চলে গেছে। গিয়ে রাগের মাথায় যদি ফাঁস করে দেয়।
উঃ কী আপদ! এই হুঁড়ি হারামজাদীগুলো কি এতও নেমকহারাম!
ছিলি ছাই গাদায় উঠেছিস সিংহাসনে, তার জন্যে চির কৃতজ্ঞ থাকবি তো–যে লোকটা হাত ধরে সেখানে উঠিয়েছিল তার কাছে! তা নয়, যেন ছুরি শানিয়ে বসে আছে খোঁচা মারবার জন্যে।
তবু একটা ভাল যে গিন্নীর ওই পাজী ভাইপোটার সঙ্গে তেমন ভাব হচ্ছে না। হবে কি করে, পাজীটা মুখে যতই উদারতা দেখাক, মনে তো বুঝছে আমার বাড়া ভাতে ছাই পড়ল।
আর মেয়েটাও বুঝছে ওই ভাইপোটার চোখ বিপজ্জনক। একা মহিলাকে অভিভূত করে রাখা যায়। কিন্তু ছোঁড়াটা ধুরন্ধর।
ভাব হয়নি সেটা ভাল। কিন্তু এসব কি! মেয়েটা এত অসভ্য!
তখন তো একেবারে সাদা কাগজে সই মারলি, আমায় যা করতে বলবেন করতে রাজী আছি, বলুন কি করতে হবে? হারানো মেয়ের অভিনয়? বেশ! এমনিতেই তো বাবা চেষ্টা করে বেড়াচ্ছিলেন যাতে পর্দায় নামাতে পারি। শুধু একটা শর্ত। এই সংসারটাকে টেনে তুলবেন আপনি। আমাকে দিয়ে যদি তার ব্যবস্থা হয়, মরতেও প্রস্তুত আছি আমি।
