বাবা আমি যাই।
যাবে। যাবে। আর যে এখানে তিষ্ঠোতে পারছ না তা বুঝতেই পারছি। তা সঙ্গে কিছু এনেছ?
না। সব খরচ করে ফেলেছি।
কি, ওই সব জামা জুতো সাবান এসেন্স কিনে? কেন? অত সবের দরকার কি ছিল? নজর তিন দিনেই লম্বা হয়ে গিয়েছে দেখতে পাচ্ছি। সেই যে বলে না ফোঁটা চন্ননের ব্যাটা চন্দন বিলাস, এ দেখছি তাই। বলে টাকার জন্যে মরে যাচ্ছি আমি। হাঁ করে আছি কবে তুই আসবি, টাকার গোছা আনবি। নইলে ঘরের মেয়েকে কেউ পরকে বিলিয়ে দেয়? অনেক দুঃখেই
সীমা উঠে দাঁড়াল। বিষতিক্ত একটু হাসি হেসে বলে, বিলিয়ে দেওয়া কথাটার অন্য মানে বাবা। অভিধানে দেখা। কিন্তু আমার কাছে অনেক বেশি আশা করলে চলবে কেন? আমার হাতে তো আর ওদের লোহার সিন্ধুকের চাবি নেই? তোমার আশ মিটবে এত টাকা আমি কোথায় পাব? আমায় হাত খরচ করতে যা দেন
লোহার সিন্ধুকের চাবি বাগাবে। সেইজন্যেই তো পাঠানো হয়েছে তোমায়। গাঁজাখোর গোঁয়ারের মত চেঁচিয়ে ওঠে যতীন। শুধু তুমি রাজকন্যে হয়ে আরাম খাবে, এইটুকুর জন্যে এই রিস নিয়েছি আমি? এই বলে দিচ্ছি যে কোনও কৌশলে টাকা কিছু হাতাবে
কথা দিতে পারছি না বাবা। সীমা শান্ত ভঙ্গীতে উঠে দাঁড়ায়, কিন্তু কথার শেষটা কি ভঙ্গীর সঙ্গে খাপ খেল? শেষ কথা বলে, কিন্তু এই ভেবে অবাক হয়ে যাচ্ছি কি দাম ধার্য করা হয়েছিল তোমার সবচেয়ে সেরা মেয়ের? কটা টাকায় বেচেছিলে তাকে ব্রজ উকিলের কাছে? যে, সেই মেয়ে-বেচা টাকা এখুনি ফুরিয়ে গেল? তার থেকে দরিদ্রদশার এক কণাও ঘুচল না? এবার তবে আবার কোনও নতুন গল্প ফাঁদো। আরও একটা মেয়ে তো রয়েছে তোমার। বড় হয়ে ওঠা মেয়ে। এবার তাকে বেচে–রাগে ছুটে বেরিয়ে যায় সীমা। বোধকরি চোখের জল ঢাকতেই অত ছুট।
.
অনেকক্ষণ গালে হাত দিয়ে বসে রইল ধীরা। তারপর নিশ্বাস ফেলে বলল, পয়সার গরম এমনি জিনিস। ভাইবোনগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে দেখল না, একবার মা বলে গলাটা ধরল না। আর আমি
যতীন ঘৃণা আর তাচ্ছিল্যের সংমিশ্রণে গঠিত একটা শব্দ করে বলে, মেয়েমানুষ যে! নেমকহারামের জাত।
অন্য দিন হলে এই মেয়েমানুষ শব্দটা নিয়ে খণ্ডপ্রলয় বেধে যেত ধীরার সঙ্গে। আজ আর কিছু হল না। চুপ করে রইল ধীরা। যেন এতদিন সীমা ওর কাছে ছিল, আজই প্রথম হারিয়েছে তাকে। আজই প্রথম বিচ্ছেদ।
রীতা বলল, পদ্মদি মিনাদি রাধা ঊষা সবাই বেড়ার ওধারে ভীড় করে দাঁড়িয়ে রইল, কারুর দিকে তাকাল না দিদি। গট গট করে চলে গেল।
হুঁ।
যতীন নাকের পথে একটা দাবদাহকে বুক থেকে নামিয়ে বলে, যা বুঝেছি প্যাজ পয়জার দুই-ই হল! ঘরের চেঁকিই বিভীষণ হয়ে উঠল। এর থেকে যে সিনেমায় নামাতে চেয়েছিলাম, সে একশো গুণ ভাল ছিল। জটিল কুটিল পথ ধরতে গেলেই এই হয়। তখন মনে হত সংসারের অবস্থা ফেরাতে মেয়ে আমার বুঝি প্রাণ দিতে পারে, ইজ্জত দিতে পারে। উবে গেল সে মায়া মমতা! সনৎ দাসের মেয়ে দুটো তো দেখছি ওর চেয়ে ঢের ভাল। ইজ্জত বিকোচ্ছে, কিন্তু মা বাপ ভাই বোনকে বুকে করে আগলে রেখেছে। সংসারের অবস্থা ফিরে গেছে সনৎ দাসের।
.
আলোচনা ক্রমশই উদ্দাম হয়ে ওঠে।
ঘৃণা আর ধিক্কারের ভাষা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। কলোনির আরও অনেকে এসে জড় হয়। পদ্ম মীনা রাধা ঊষা। যারা এতক্ষণ বেড়ার ওধারে থেকে নাটক অবলোকন করছিল।
তারা অবশ্য প্রকৃত রহস্য জানে না।
তারা জানে সীমাকে না কি কোন এক বড়লোকের বিধবা পুষ্যি নিয়েছেন। তাই কপাল ফিরে গেছে সীমার। এখন সীমা সোনা চিবোচ্ছে রূপো মাড়াচ্ছে। আর স্রেফ হাত খরচার জন্যে যা পাবে, তাতে যতীন সেনের অবস্থা ফিরিয়ে দিতে পারবে।
প্রশ্ন উঠেছিল বটে জগতে এত লোক থাকতে যতীন সেনের মেয়েকেই বা হঠাৎ পুষ্যি নেবার ইচ্ছে হল কেন সেই বড়লোকের বিধবার? আর তাই যদি হল সব চেয়ে বড় মেয়েটা কেন? আরও তো ছেলে মেয়ে আছে যতীনের। ধাড়ি শালিখ কি পোষ মানে?
এর আর নতুন কোনও উত্তর নেই, একটাই উত্তর। বহু নামে এক বরাত! অদৃষ্ট! কপাল।
পাতা চাপা কপাল সীমার।
সামান্য একটু বাতাসে সে পাতা উড়ে গিয়ে কপাল খুলে গেছে!
সেই খোলা কপাল সীমাকে দেখতে এসেছিল ওরা। তার আগে বলাবলি করেছে অনেক কিছু। খুব কি সেজেগুজে আসবে সীমা? এক গা গহনা পরে? বড়লোকের পুষ্যি কন্যে হয়েছে যখন।
তা হয়তো আসবে না। লজ্জা করবে।
ছোট ছোট ভাই বোনের গায়ে জামা জোটে না। মার পরনে ছেঁড়া শাড়ী। অবিশ্যি বেশিদিন আর থাকবে না এরকম। সীমাই দুঃখু ঘোচাবে এদের। চাইকি সেই ধর্ম-মাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আর দুএকটা ভাই বোনেরও গতি করে নেবে। নেবে না কেন, তাদের যখন লক্ষ্মীর ভঁড়ার।
যতীন সেন না কি এই কলোনি থেকে উঠে যাবে। যা যাওয়াই স্বাভাবিক। বড়লোক হয়ে যাওয়া সীমা কি আর বাপ মাকে ফেলে রাখবে এখানে? তা ছাড়া নিজেই বা সে এই পচা গলিতে ঢুকবে কেন আর? বড়লোকদের তো অমন দশ বিশ খানা ভাড়াটে বাড়িও থাকে, তারই একখানা বিনি ভাড়ায় পাইয়ে দেবে বাপকে! পাতা চাপা কপাল একা সীমারই নয়। যতীন সেনেরও।
এমনি অনেক আলোচনা অনেক কল্পনা চলেছে ওদের, সীমা চলে গিয়ে অবধি। যতীন সেনের প্রতি তীব্র একটা ঈর্ষায় গা জ্বালা করেছে। তবু দেখবার সাধ ষোলো আনা।
তাই আজ যখন ধীরা পাবলিক কলে জল নেবার সময় টিপে টিপে খবরটা ছেড়েছিল, আর বলেছিল সীমার জন্যে খাবার করে রাখতে হবে, দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবার সময় আজ আর নেই ওর, অতএব সবাই তফাৎ যাও, সত্যিই সবাই তফাতে সরে গিয়েছিল ধীরাকে আগে সেরে নিতে দিয়ে।
