জমিদারের গোমস্তা গেরস্ত যতীন সেন আজ সরকারের ভোল নিয়ে খাচ্ছে আর জবর দখলি জমিতে বাস করছে-তার বৌ কি আর কাজল পরা চোখ তুলে মিহি হাসি হাসবে?
ওদের একটা জীবন ছিল। সে জীবনটা ওরা হারিয়ে ফেলেছে, ভুলে গেছে ওরা, আর একটা নতুন জাত তৈরি হয়েছে। হ্যাঁ নতুন জাত। সেই জাতের মাথার মধ্যে আর কোন কিছু নেই। আছে শুধু প্যাঁচ। কোন্খানে কতটা প্যাঁচ দিলে কি আদায় হতে পারে এ চিন্তা ছাড়া আর কোনও চিন্তা নেই যতীন সেনদের।
সেই চিন্তাই করছিল যতীন। তুমি ব্ৰজ উকিল পাঁচ কসছ বসে বসে, ভাবছ যতীন যেন অবোধ অজ্ঞান। তোমার ভিক্ষামুষ্ঠিটুকুই তার পরম পাওয়া। কেন? বলি কেন? তোমার বুদ্ধি আছে আর তার নেই? তুমি বেড়াও ডালে ডালে তো সে বেড়ায় পাতায় পাতায়। সে ও
দিদি এসেছে! দিদি এসেছে! তুমুল কলকল উঠল গুটি তিন চার কণ্ঠ থেকে।
না বাড়ির গাড়ি নয়। রায় কোম্পানির কর্তীর সেই বিরাট গাড়িখানা এ পাড়ার রাস্তাতেই ঢুকবে না। ট্যাক্সিই। মোড়ের মাথা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ব্রজনাথ ছেড়ে দিয়ে গেছেন। সীমার তাই ইচ্ছে।
দিদি দিদি। আমাদের জন্যে কি এনেছ?
সীমা মাদুরের ওপর বসে পড়ে। আর সহসা যেন একটা সূক্ষ্ম ঈর্ষার জ্বালা অনুভব করে। দাওয়াটায় দিব্যি একখানা মাদুর পাতা হয়েছে। সীমার আমলে এ সব হয় নি। দু-খানা বই খাতা নিয়ে বিছিয়ে বসবার জায়গা পায় নি কোনদিন।
আবার তখনি লজ্জায় লাল হয়ে গেল, ছি ছি, এই টুকুতে এই ভাবছে সীমা? কেন তবে চলে গেল সীমা এদের ছেড়ে? এদের দাওয়ায় মাদুর পড়বে, এদের বিছানায় চাদর পড়বে, এদের পেটে ভাত পড়বে, তাই না।
কই দিদি দেখাচ্ছ না?
সীমা সঙ্গে করে আনা সুটকেসটা খোলে। জামা কাপড় তেল সাবান বিস্কুট মিষ্টি! জনে জনে সকলের নাম করে।
ভাগাড়ে চিল পড়ার মত কাণ্ড ওঠে একটা। এত সব কেন কিনেছে সীমা? সীমা কি দীর্ঘ দিনের অন্নঋণ শোধ করতে চায়?
ধীরা জামাগুলি তুলে তুলে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, এত সব ভাল ভাল জামা কেন আনা বাপু, এই দামে দুটো তিনটে হত।
সীমা মৃদু গলায় বলে, আবার হবে।
ওমা, তা মাপটাপগুলো তো ঠিক হয়েছে, ধীরা বলে, চোখের আড়ালে থেকেও হয়েছে তো ঠিকঠাক।
সীমা কিছু বলে না। শুধু ধীরার দিকে একবার চোখ তুলে তাকায়। লাল লাল ভারী ভারী চোখে।
ধীরা লজ্জিত হয়ে তাড়াতাড়ি উঠে যায়। বলে, যাই মিষ্টি আনি। তিলের নাড় করেছি তোর জন্যে।
তিলের নাড়ু! তবু ভাল। যতীন সেনের সংসার যে একদিনের বাজার খরচ বাঁচিয়ে সীমার জন্যে রাজভোগ আনিয়ে রাখে নি, এতেই কৃতজ্ঞ সীমা।
যতীন বলে, মাগী কিছু বুঝতে-টুঝতে পারছে না তো?
সীমা চোখ তুলে বলে, ওঁর সম্পর্কে একটু ভালভাবে কথা বল বাবা।
ও বাবা! ইরি মধ্যেই খুব যে টান দেখছি। মেয়ে সন্তান এমনিই হয়, যতীন বলে, হুঁ, তা সেই মহিয়সী মহিলাটিই না হয় বলছি। সন্দেহ-টন্দেহ করছে না তো?
না।
করবে না জানতাম। তুই তো আমার কম ঘুঘু মেয়ে নয়। বলে কলোনিতে থিয়েটার করে ফাস্ট হলি সেবার। একটা ভাইপো আছে না?
আছে।
সে ছোঁড়া কেমন? ব্রজ উকিল তো বলে—
বাবা আমি যাই।
সে কি, এখুনি যাবি কি? তোর মা-র সঙ্গে দুটো গাল গল্প কর? ও যে একেবারে সীমা সীমা করে মরে যাচ্ছে
কেন! সীমা দাঁড়িয়ে ওঠে। তীব্রকণ্ঠে বলে, আমার জন্যে আবার মরবার কি আছে? আমি, কত সুখে আছি, রাজার হালে আছি। সোনার খাটে গা রূপোর খাটে পা। ছানা চিনি আমার মুখে রোচে না, চপ কাটলেট আমি চিবিয়ে ফেলে দিই–
যতীনের ছোট ছেলেটা আঁকড়ে ধরে সীমাকে। বলে, দিদি! ফেলে দিস?
সীমা ওর দিকে তাকায়। যেন মাতালের নেশা ভঙ্গ হয়। ওর গায়ে হাত রেখে বলে, পাগল হয়েছিস? তাই আবার পারে মানুষ? ঠাট্টা বুঝিস না?
বয়সে একটু বড় হয়ে যাওয়া বোন রীতা মুখটা সিঁটকে বলে, ঢং করে এ রকম একটা বাজে শাড়ি পরে এসেছিস কেন দিদি? ব্রজ উকিল তো গল্প করে গেল–গিন্নীর তিন আলমারি শাড়ি নাকি তোকেই দিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া প্রতিদিন শাড়ির ওপর শাড়ি আসছে।
সীমা ওর ওই বিদ্বেষ তিক্ত মুখটার দিকে তাকায়। বিষাক্ত একটা কথা মুখের আগায় আসে, সামলে নেয়। না, আর নেশায় বুদ্ধিভ্রংশ হবে না সে।
ছোট বোনের গায়ে হাত রেখে বলে, কেন শুনিস বুড়োর বাজে কথাগুলো। ওঁর ওসব। শাড়ি-টাড়ি পাবে ওই ভাইপোর বৌ। সে-ই সর্বেসর্বা!
ভাইপো-বৌ! ধীরা চমকে ওঠে, সে আবার কে? ভাইপো-বৌ আছে নাকি?
আহা ভাইপো যখন আছে, বৌও আসবেই একদিন!
তবে যে বুড়ো বলেছিল কেউ কোথাও নেই। শুধু মাগী একলা।
সীমা এত বিচলিত হচ্ছে কেন? সীমা কি এর আগে এই কলোনির লোকের কথাবার্তা শোনে নি?
ভদ্রলোক ভদ্রমহিলা সম্পর্কে এর চাইতে সমীহ সম্ভ্রমপূর্ণ বিশেষণ কবে ব্যবহার করেছে যতীন, ধীরা, ওদের ছেলে মেয়েরা?
সীমা কী হঠাৎ আকাশ থেকে পড়ল? তাই এখান থেকে এই বন্ধ বাতাস থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাবার জন্যে প্রাণ ছটফট করছে তার?
যতীন সেন স্ত্রীকে ধমকায়, থামো, যা জানো না, তা নিয়ে ভ্যান-ভ্যান করো না। ভাইপো বোনপো ভাগ্নে ভাগ্নী থাকবে না লোকের? তা নিয়ে চিন্তার কি আছে? তবে ব্রজ উকিল যে মনে করেছে সে একাই ঘুঘু তা যেন ভাবে না। আমিও যতীন সেন। তেমন দেখলে ওই উকিলের কাছা খুলে দিয়ে
