ওদিকে কিন্তু সুনন্দা অন্য ব্যবস্থা করেছে ইত্যবসরে! উদ্দালককে নির্দেশ দিয়েছে টুলুকে তার পুরনো আস্তানায় একবার ঘুরিয়ে আনতে। বলেছে–সেখানে যেন বেশিক্ষণ থাকে না। সেই তো শুনেছি বস্তি, গলি, নোংরা আর নেহাৎ-ই হা-ঘরে মতন–তুই বরং তারপর ওকে একটু গড়ের মাঠে কি লেকে কোথাও
উদ্দালক গিয়ে সে কথাই বলে–শ্ৰীমতী নিধি আজ বিকেলে একটু প্রস্তুত থাকবেন। আপনার মাতৃদেবীর আদেশ হয়েছে আপনাকে হয় লেকে নয় গড়ের মাঠে চরিয়ে আনতে। এখন যে মাঠের ঘাসে আপনার অভিরুচি।
–দেখুন, ভাল হবে না বলছি।
–যতক্ষণ আপনি আজ্ঞে ততক্ষণ ভাল হবার কোন আশা নেই। মান্য ভক্তি করে দাদা বলবে। গড় করবে তবে
সীমা তীক্ষ্ণ একটু হেসে বলে, দাদা বলতে আমার দায় পড়েছে। দাদা আপনাকে আমি জীবনেও বলব না।
–আচ্ছা, কেন বলত? উদ্দালক ঈষৎ অবাক হয়ে বলে–লক্ষ্য করে দেখছি প্রথমাবধিই তোমার আমাকে দাদা বলায় আপত্তি। কেন বলত? দাদা তো লোকে যাকে তাকেই বলে। বলে–পাড়াতুতো দাদায় দেশ ভরা। আর এ তো সত্যিকার জলজ্যান্ত মামাতো ভাই
সীমার মুখটা কি পাংশু হয়ে ওঠে হঠাৎ? কিন্তু কেন? সুনন্দাকে তো নিতান্ত সহজেই মা বলতে পারছে আজকাল। তবে উদ্দালকের বেলাতেই বা ওই নিতান্ত সহজ দাদা ডাকটা কিছুতেই মুখে আসে না কেন? কেন, শুনলেই মনটা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে? পণ করে বসে থাকে বলব না বলব না। বড় ভাইয়ের স্নেহ নিয়ে তো এগিয়ে আসছে উদ্দালক। সীমা কেন ছোট বোনের হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করতে পারছে না তা?
আপনাকে আমার ভাবনা ভাবতে হবে না। আমার যেখানে যাবার নিজেই যাব।
–তোমার ভাবনা ভাবতে আমার দায় পড়েছে। দায় পড়েছে কথাটার ওপর জোর দেয় উদ্দালক সীমার অনুকরণে। আবার বলে–আমি ভাবছি আমার পূজনীয়া পিসিমার কন্যার কথা। বিকেলে প্রস্তুত থেকো। তোমার সেই আগের বাড়িতে নিয়ে যেতে বলেছেন। ড্রাইভার বুঝি ছুটি নিয়েছে–
সীমা ওর কথায় কান না দিয়ে বলে–আপনি গাড়ি চালাতে পারেন?
গাড়ি? গাড়ি চালাতে পারব না? গাড়ি চালানো আবার একটা কাজ নাকি? শিখতে চাও? বল তো শিখিয়ে দিতে পারি।
-মাইনে দেবার ক্ষমতা নেই, চাই বললে চলবে কেন? বিনা মূল্যে কিছু নিতে পারা যায়?
উদ্দালক সহসা একটু গম্ভীর হয়ে যায়। বলে,–পারবে না কেন? ইচ্ছে থাকলেই পারা যায়। কিন্তু সে ইচ্ছে তোমার নেই।
সীমা মুখ তুলে একটুক্ষণ চেয়ে থাকে। তারপর বলে–আর এমন যদি হয়, ক্ষমতাই নেই।
মাঝে মাঝে তাই মনে হয়, উদ্দালক বলে মনে হয়, জীবনে কখনো বুঝি তুমি স্নেহ ভালবাসা শ্রদ্ধা সম্মান কিছুই পাও নি। তাই তার স্টকই নেই তোমার মধ্যে।
উদ্দালক চলে যায়। উদ্দালক আহত হয়েছে।
ওর মত ছেলেও আহত হয়? তা হয় বৈকি। কতগুলো দিন কেটে গেল, কত আগ্রহ করে ভাইয়ের ভালবাসা নিয়ে এগিয়ে এল সীমার হৃদয়ের কাছে, কিন্তু সীমা তার প্রতিদান দিতে পারছে না। সে ভালবাসা প্রতিহত হয়ে ফিরে যাচ্ছে।
কিন্তু সীমা কি করবে? সীমার নিজেরও যে শাসন নেই। সীমার জিভ দুধের জন্যে উন্মুখ নয়, সে চায় লবণ স্বাদ। কিন্তু সমুদ্রে কি সে স্বাদের সাধ মেটে? মেটে না। তাই উদ্দালকের স্নেহ সমুদ্র কাজে লাগছে না।
.
যতীন সেনের বাড়িটা আজকে একটু ভব্য মূর্তি ধারণ করেছে।
দাওয়াটা ঝাড়া মোছা, তার উপর একখানা নতুন মাদুর বিছানো। ঘরের ভিতরের চৌকির উপরকার বিছানাটা বহুকালের নিরাবরণতার গ্লানি থেকে মুক্ত হয়েছে একখানা কোরা মার্কিনের চাদর মুড়ি দিতে পেয়ে।
ছোট ছেলেমেয়ে তিনটের গায়েও নতুন গেঞ্জি, কোমরে জাঙিয়া। হ্যাঁ, সোজাসুজি একই পোশাক এনে দিয়েছে যতীন, ছেলেমেয়ে বলে আলাদা বিভাগ রাখে নি।
কি দরকার। আলাদা টালাদা করতে গেলেই তো একজনেরটা ভিজে থাকলে আর একজনেরটা পরার অসুবিধে। মেয়েটা গেঞ্জি পরতে পারে। ছেলেরা তো ফ্রক পরতে চাইবে না।
অপেক্ষাকৃত বড় মেয়েটা তার সবচেয়ে ভাল শাড়িটাই পরে বসে আছে।
যতীনের পরনে ফুটোহীন লুঙ্গী।
যতীনের বৌয়ের অঙ্গে শুধু ফরসা শাড়িই ওঠে নি, একটা জামাও উঠেছে। আধ-ছেঁড়া একটা ব্লাউস। একজনের পরিত্যক্ত। সে আর কোনদিন ওইটার ওপর দাবী জানাতে আসবে না নিশ্চয়। সে এখন বড় লোক হয়েছে। দারুণ বড় লোক।
মোটমাট যতীনের বাড়িটা আজ উৎসবের চেহারা ধারণ করেছে, যতীনদের বাড়ির সদস্যদের মনেও একটা আবেশময়, সম্ভাবনাময় উৎসবের ছোঁয়াচ।
যতীনের বৌ ধীরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলে,হ্যাগো, তিলের নাড় খাবে সীমা?
-খাবে না কেন? যতীন বলে–তুমি নিজেই তো বললে-খুব ভালবাসে।
-সে তো তখন বাসতো। তাই বাধীরার চোখে জল আসেজুটতো কই? কিন্তু এখন কত রাজা উজিরী জিনিস খাচ্ছে, আর কি মুখে রুচবে তিল আর ভেলিগুড়?
যতীন মুখটা বিস্বাদ করে বলে মানুষের মেয়ে হলে রুচবে। অমানুষের মেয়ে হলে রুচবে না।
বাপের হিসেব ধরতে হলে তো রুচবেই না। বলে ঠিকরে উঠে দাঁড়াল ধীরা, নামের মর্যাদা না রেখেই। না, নামের মর্যাদা রাখার ক্ষমতা আর নেই ধীরার। অনেক দিন হারিয়েছে।
অথচ ছিল। যখন সেই এক নিভৃত পল্লীর কাকচক্ষু পুকুরের ধারে নতুন বানানো ছোট্ট গোলাপী রঙের বাড়িটিতে মাথায় ঘোমটা টেনে টেনে বেড়াতো। তখন ছিল সেই ক্ষমতা শেয়ালদা স্টেশনের পরিবেশ তার ঘোমটা খুলে দিয়েছে। শুধু মাথারই নয় মনেরও।
