ওহে মহিলা, ভুল হচ্ছে, উদ্দালক বলে ওঠে। বাঙালদেশের মেয়ে নয়, তৎদেশে মানুষ!
নে বাবা, তোদের খাওয়া আজ মাথায় উঠল দেখছি। দাদা বৌদি কেমন আছেন তা পর্যন্ত শোনা হল না এখনো। বল্ শুনি কেমন আছেন ওঁরা। কেমন আছে ছেলেমেয়েরা?
সুনন্দা যেন আগলে বেড়ায় সীমাকে। ওর যেন মনে হয় সীমা আবার হারিয়ে যাবে।
২. বসবার ঘরে
ব্রজনাথবাবু ডেকে পাঠান সীমাকে। বাইরে বসবার ঘরে। সুনন্দাকে জানিয়েছেন নাম পদবী বদলাতে সই স্বাক্ষর দরকার, দরকার দরখাস্ত করবার।
নামটা থাক না। সীমা মুখ নীচু করে বলে, ডাকের নামটা তো রইলই মা তোমার, ওটা তো তোলা, পোশাকী, ওতে আর কী ক্ষতি?
আমি যে তোকে একেবারে ধুয়ে মুছে নতুন করে নিতে চাই টুলু!
সীমা হেসেছিল একটু। আমার এই কুড়ি বছরের জীবনটাকে কি একেবারে ধুয়ে মুছে উড়িয়ে দিতে পারবে মা? জ্ঞান হয়ে অবধি নিজেকে সীমা বলে ভাবার অভ্যাস হয়ে গেছে, হঠাৎ নতুন কোনও নামকে সত্যি আমার ভাবতে
সুনন্দা অবুঝ নয়। সুনন্দা এ কথার যৌক্তিকতা বুঝেছে। সত্যিই তো, সুনন্দা মুছে ফেলতে চাইলেও ও ওর সেই অনেক ঘাটের জল আর অনেক আগুনে পোড়-খাওয়া জীবনটাকে মন থেকে মুছে ফেলবে কেমন করে? শ্বশুরবাড়িতে আসা মেয়ের বাপের বাড়ির স্মৃতির মত থাকবেই খানিকটা। আস্তে আস্তে ঝাপসা হবে।
ব্রজনাথবাবু বলেছেন, যাদের কাছে ছিল, তারা নাকি একবার দেখবার জন্যে নির্বেদ প্রকাশ করছে।
সুনন্দা বলেছিল–বেশ তো, আনুন না তাদের একদিন। না হয় নেমন্তন্ন করেই আসুন। আমারও তো উচিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। অপকর্ম যে করেছিল, সে তো মরেই গেছে। এরা তো কোনও দোষে দোষী নয়? বরং নিজেদের দুরবস্থার মধ্যেও একটা পরের মেয়েকে ঠাই দিয়েছিল। এরা ভাল, এরা সৎ। হা হা, আনুন তাদের একদিন।
ব্রজনাথ মাথা নেড়েছিলেন–আসবে না। হতদরিদ্র অবস্থা হলে কি হয়, খুব মানী। নিজেদের ছেঁড়া জামা কাপড় পরে বড়লোকের বাড়িতে আসবে না। শুধু বলছিল সীমা যদি একদিন
এ কথারও যৌক্তিকতা অস্বীকার করতে পারে নি সুনন্দা। সত্যি, বড়লোকের থেকে গরীবের আত্মাভিমান বেশী, এ তো চিরকালের জানা কথা। তাই বলেছিল–বেশ, একদিন যাবেখন। আপনিই আনবেন ঘুরিয়ে।
হ্যাঁ হ্যাঁ, সে তো নিশ্চয়। আপনার ড্রাইভারও যে তাদের অবস্থাটা দেখে এ তাদের ইচ্ছে। নয়। তাই ভাবছি ট্যাক্সি করে–
ট্যাক্সি করে? ওমা, তাই বা কেন? ড্রাইভার না যায় দুলুই নিয়ে যাবে। কথার উপসংহারের ছেদ টানে সুনন্দা। তারপর আবার বলে ওঠে, যাক, ওই যে কি, পদবী বদলাতে টুলুকে আপনার দরকার হবে বলছিলেন–
হ্যাঁ হ্যাঁ। বিশেষ দরকার। নাম পদবী দুই-ই তো পালটাতে হবে।
না না, বলছিলাম ওই নামটা বদলাবার দরকার নেই, শুধু পদবী।
নামটা থাকবে! ব্রজনাথ হাঁ করেন। সুনন্দাই তো নতুন নামের পক্ষে ছিল।
সুনন্দা বলে, থাক, থাকুক। টুলুর নইলে মনে কষ্ট হবে। মনে মনে যতই যা হোক, ও তো সেই রাক্ষুসীকেই মা বলে জানত, তার দেওয়া নাম। সেন্টিমেন্ট বলে কথা আছে একটা।
বেশ, আপনার যা ইচ্ছে। মেয়েদের পদবী বদলানোটা কিছুই না, বিয়ে হলে বদলায়ই তো। নামটা বদলানোরই অসুবিধে ছিল। যাক, সে যখন দরকার নেই
.
টুলু এসে দাঁড়িয়েছে, একা। সুনন্দা চলে গেছে। বলেছে, দুলুকে বলিগে। ব্রজনাথ সীমাকে বলেন, না না, ও সব দুলু-ফুলুকে দরকার-টরকার নেই। ট্যাক্সিই ভাল, বুঝলে? তবে বেশিক্ষণ থাকা চলবে না।
সীমা মুখ তুলে নীচুস্বরে বলে, টাকা দিয়ে এসেছিলেন ওখানে?
নিশ্চয়! নিশ্চয়! কী বলছ তুমি মা! আমি কি এমনই অবিবেচক?
না আপনি মহৎ। সীমার ওষ্ঠে অতি সূক্ষ্ম অতি মিষ্ট একটু হাসি ফুটে ওঠে।
তা মহৎ বৈকি। ওঁরই চেষ্টায় তো একটা সন্তানহারা জননীর চিত্তের প্রদাহ শীতল হল! আর ওঁরই বদান্যতায় তো একটা দুঃস্থ পরিবার উপবাসের উত্তাপ থেকে অব্যাহতি পাচ্ছে।
যতীন সেনের মর্মান্তিক দুরবস্থা দেখে পর্যন্ত প্রাণটা ফেটে গেছে ব্রজনাথের। তাই না নিজের পকেট থেকে মুঠো মুঠো টাকা দিয়ে আসেন তাকে খরচ বলে। ভদ্রলোকের ছেলে, সাহায্য বললে আহত হবে।
মহৎ টহৎ কিছু না। মানুষের কর্তব্য যতটা সম্ভব করা যায়। যাক, মিসেস রায় তোমার ব্যবহারে সন্তুষ্ট তো?
কি করে বলব বলুন?
বাঃ সে কি! না না এটা তো ঠিক নয় মা। তুমি জানবে না? আমি তো তোমায় খুব বুদ্ধিমতী বলেই জানি। সর্বদা ওঁর সঙ্গে সঙ্গে থাকবে। ওঁর হৃদয়ের সব স্নেহটুকু–যা ওঁর হারানো মেয়ের জন্যে হৃদয়ে ভরা ছিল, তার সবটুকু নিংড়ে বার করে নেবে। ওই ইয়ার ছোকরাটি, ওই ভাইপোটি মহা ঘোড়েল বুঝলে? ওঁকে একেবারে কবলিত করে ফেলেছিল, ওঁর সব স্নেহ ভালবাসা কেড়ে নিয়েছিল। আর কিছুদিন দেরি হলেই সব লেখাপড়া করিয়ে নিত নিজের নামে।
যাক, নেয় নি তো? আবার সেই হাসির ব্যঞ্জনা ফুটে ওঠে সীমার মুখে, তাড়াতাড়ি বাঁধটা দিতে পেরেছেন।
তুমি আমায় ব্যঙ্গ করছ সীমা? ব্রজনাথ আহত হলেন। অভিমানী ব্রজনাথ।
কি আশ্চর্য! ব্যঙ্গ করব কি? আপনি আমাকে দুর্দশার পাতাল থেকে স্বর্গে এনে পৌঁছে দিয়েছেন, আমি আপনাকে–
কিছু না, কিছু না, আমি নিমিত্ত মাত্র। সবই নিজ নিজ অদৃষ্ট! নইলে মিসেস রায়ের তো আরো ভাইপো-ভাইঝি আছে, ওই ইয়ার ছোকরাটিই বা কেন! যাক, ওই কথাই রইল। আমি আসছি বিকেলে। ট্যাক্সিতেই যাব।
