সীমা কি একটা বলতে উদ্যত হচ্ছিল, এই সময় সুনন্দা এসে দাঁড়াল উদ্দালকের স্পেশাল ডিশ নিয়ে।
এই তোর নারকেল কুমড়ো। ও কিরে, টুলু তুই বসিস নি? হারে দুলু কি হল? বললাম বোনটিকে নিয়ে খেতে বোস ততক্ষণ, আমি আসছি। ভাত শুকোচ্ছে এদিকে, হাত গুটিয়ে বসে আছিস!
উদ্দালক উদাস উদাস ভঙ্গী করে বলল, আর হাত! নেহাৎ গুটিয়ে বসে আছি তাই, নইলে হাতাহাতি হয়ে যেতে পারত।
হাতাহাতি!
তা না তো কি! তবে নেহাৎ নাকি তোমার এই গুণধর ভাইপোটির মেজাজ ওই ফ্রিজিডেয়ারের জলের মত, তাই কিছু একখানা হয়ে যায় নি। উঃ, তোমার এই কন্যাটির যা মেজাজ!
সুনন্দা হেসে ফেলে। সুনন্দা এখন বিগলিত। সুনন্দার ভিতরকার দ্বন্দ্বের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। সুনন্দা সীমাকে টুলু বলে গ্রহণ করতে পেরেছে তাই সুনন্দা খোলা মনের হাসি হেসে ওঠে।
হল শুরু? কুঁদুলে ছেলে! বুঝলি টুলু, তোর এই দাদাটির একটি মাত্র কাজ আছে সংসারে, সবাইকে ক্ষেপিয়ে বেড়ানো। আমাকেও ক্ষ্যাপাচ্ছে, পুরুতমশাইকেও ক্ষ্যাপাচ্ছে, ডাক্তারবাবুকেও ক্ষ্যাপাচ্ছে; চাকর ঠাকুর বুড়ী তারুর মা কারুর রেহাই নেই ওর কাছে। আর এমন সব দুষ্টুমি বুদ্ধি খেলেও মাথায়!
উদ্দালক বলে, তা বলে পিসিমা অরিজিন্যাল ক্ষ্যাপাকে ক্ষ্যাপাবার সাহস আমার নেই। আমার তো ধারণা হচ্ছে ওর হেডঅফিসে রীতিমত গণ্ডগোল।
দুলু, বাক্যি থামাবি? ভাত ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। আয় টুলু বোস। সুনন্দার কণ্ঠে সুধা, চোখে বিগলিত স্নেহ।
কিন্তু টুলু এগিয়ে আসে না। নীচু অথচ স্পষ্ট গলায় বলে, আমি একটু পরে খাব মা।
ওমা সে কি কথা-সুনন্দার কণ্ঠে উদ্বেগ–পরে আবার কখন খাবি কার সঙ্গে? এই কদিন একা একা খেয়ে সারা হচ্ছিস। লজ্জা কি মা? ও তো তোর দাদা হয়। শুনতেই মামাতো ভাই, দেখিস নিজের দাদার থেকে অনেক বেশী। একঘণ্টায় আপনার করে নিতে পারে মানুষকে
সহসা এক ঝলক বিদ্যুৎ খেলে যায় সীমার চোখে। হাসি গোপন করে বলে, ছাই পারেন। ঝগড়াটে!
ওরে দুষ্টু মেয়ে, তুইও তো দেখছি কম যাস না। ইতিমধ্যেই ভাবটাব হয়ে গেছে? চালাকি হচ্ছে আমার সঙ্গে? নে বোস এখন। খেতে বসে দুজনে ঝগড়ার কমপিটিশান চালা।
হারব, স্রেফ হেরে যাব পিসিমা। এতদিনের অহমিকা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে আমার। এতসব উচ্চাঙ্গের কথার্বাতা জানেন তোমার শ্রীমতী নিধি, যে আমি উত্তর খুঁজে পাই না, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি।
হুঁ, তুমি যে আমার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবার মত ছেলে! সুনন্দা হেসে বলে, আমার দেখছি এখন চাকরি হল তোদের ঝগড়া থামানো। তোরা-সহসা চোখ ভরে জল এসে যায় সুনন্দার, তোরা দুটি ভাইবোন হাসবি খেলবি ঝগড়া করবি, বাড়ি আমার সত্যিকার মানুষের বাড়ির মতন হয়ে উঠবে। শুধু তিনিই বুকভরা হাহাকার নিয়ে চলে গেলেন। কিছুই দেখতে পেলেন না।
ঘরের হালকা আবহাওয়া সহসা ভারী হয়ে উঠে। সীমা একটা চেয়ারের পিঠে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকে, সুনন্দা পিছন ফিরে চোখের জল মোছে, আর উদ্দালক ঈষৎ অপ্রতিভ ভাবে এদিক ওদিক তাকিয়ে, আর কিছু না পেরে জলের গ্লাসটাই মুখে তুলে ধরে।
কিন্তু বেশীক্ষণ এ আবহাওয়া থাকে না। উদ্দালকই থাকতে দেয় না। হঠাৎ বলে ওঠে, পিসিমা, তোমার নিধির পোশাকী নামটা কি বল তো?
সুনন্দা চোখে জল মুখে হাসি নিয়ে বলে, তা আমায় জিগ্যেস করছিস কেন, যার নাম তাকেই জিগ্যেস কর?
কি জানি, হয়তো ওই সূত্রেই আবার লাঠালাঠি হয়ে যেতে পারে।
ওমা, নাম জিগ্যেস করার মধ্যে লাঠালাঠির সূত্র কোথায় রে?
কী বলা যায়! খলের ছলের অভাব থাকে না জানোই তো।
আড়ে আড়ে তাকায় উদ্দালক সীমার দিকে। হয়ত বলে বসবেন, কেন নাম জেনে কী দরকার? নাম নিয়ে কি হবে? নামেতে কী আসে যায়?
সুনন্দা একটু অস্বস্তি বোধ করে। কি জানি মেয়েটা উদ্দালকের এই কৌতুকে কি ভাবছে। কিভাবে নিচ্ছে এই বেপরোয়া কথাবার্তা। তাই তাড়াতাড়ি বলে, নাঃ বাপু তুই-ই একের নম্বর ঝগড়াটে। দেখ দিকি ও বেচারা কেমনতর হয়ে যাচ্ছে তোর এই সব কথা শুনে।
সীমা কিন্তু এ করুণা গায়ে পেতে নেয় না। গম্ভীর ভাবে বলে, কেমনতর হবার কিছু নেই। তবে ওঁর প্রকৃতিটা অনুধাবন করছি।
প্রকৃতি মানে?
মানে নেই। স্রেফ অর্থহীন, উদ্দালক বলে, কিন্তু তোমার এই জংলি মেয়েটাকে মানুষ করে তুলতে হবে তো?
ওমা, আমি কোথায় যাব গো! তুই যে আমার টুলুকে জংলি টংলি যা খুশি তাই বলছিস!
বলব না? ভীষণ খুশি লাগছে যে! তাইতো যা খুশি বলতে ইচ্ছে করছে। উঃ ভাবছি, ইহ সংসারেও মাঝে মাঝে গল্প উপন্যাসের কাহিনী ঘটে। কি বল পিসিমা? এখন বলুন তো ভদ্রমহিলা আপনার এতাবৎকালের ইতিহাস। স্মৃতির সমুদ্র মন্থন করে দেখুন দিকি মনে পড়ে কিনা প্রথম যখন আপনি চুরি হলেন, তখন
সুনন্দা ঈষৎ বিচলিত স্বরে বলে, ওসব গল্প এখন রাখ দুলু, খেতে বোস বাবা। টুলু বোস মা। হারে নারকেল কুমড়ি খাস তো? আমার দুলু তো
একটা এলোমেলো প্রসঙ্গ এনে সুনন্দা সীমার পুরানো জীবনের প্রসঙ্গ চাপা দিতে চেষ্টা করে। ব্রজনাথবাবু বলেছেন, এখন ওসব কথা না তুলতে। কারণ নানাকষ্টে মানুষ হয়েছে সীমা। সে সব কথা উঠলে বেচারা লজ্জা পাবে।
কিন্তু সীমা বুঝি নিজের ভার নিজেই হাতে তুলে নিচ্ছে। তাই সুনন্দার প্রশ্নে মৃদু হেসে বলে, বাঙালদেশের মেয়ে নারকেল কুমড়ি ভালবাসব না?
