কিরে দুলু এলি? চোখে জল আর মুখে হাসি নিয়ে মুখ ফিরিয়ে দেখে সুনন্দা। বলে, দেখ, ভগবান কী নিধি মিলিয়ে দিয়েছেন।
সীমা আস্তে সুনন্দার বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। সরে যায়। উদ্দালক একটু হেসে বলে, একেবারে নাটকীয়। আর আমি এসে পড়লাম ভয়ানক এক নাট্য মুহূর্তে।
.
আবার দেখা হয় খাবার টেবিলে। উদ্দালক আগে-ভাগেই এসে বসেছে। চেয়ারে বসে চেয়ারের পিঠটাকে পিঠ দিয়ে ঠেলছে। পা নাচাচ্ছে। স্থির হয়ে থাকতে পারে না সে একতিলও। সুনন্দা এখনো এসে হাজির হয় নি। উদ্দালকের প্রিয় তরকারি নারকেল কুমড়ো রান্না হচ্ছে নিরামিষ ঘরে। সুনন্দা তার তদারকিতে ব্যস্ত। বামুনঠাকুরের স্বাধীনতার ওপর ছেড়ে দিয়ে এলে স্রেফ নষ্ট।
সীমা চেয়ারে বসে নি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অকারণ টেবিলের সাজসরঞ্জাম নিয়ে নাড়াচাড়া করছে।
টেবিলে খেতে প্রথম দু-একদিন খুব অসুবিধে হয়েছিল, কিন্তু সে অসুবিধে কাটিয়ে উঠতে দেরি হয় নি তার। হয়ও না। বিলাসিতার অভ্যাস একদিনেই আরম্ভ করা হয়। তবু স্থির করেছে সীমা আজ উদ্দালকের সঙ্গে বসবে না। কি জানি, যদি হঠাৎ তার কোন অপটুতা উদ্দালকের চোখে পড়ে যায়।
ছেলেটার মুখটায় যেন একটা ব্যঙ্গ হাসি মাখানো। ছবিতেও ছিল। কিন্তু ছবিটা তত খারাপ লাগে নি। ছবির হাসি সহ্য করা যায়, জলজ্যান্ত মানুষটাকে সহ্য করা শক্ত।
কেন ওর ওই ব্যঙ্গ হাসি? সীমার উপস্থিতি কি ওকে ঈর্ষান্বিত করছে? ভাবছে সর্বেসর্বা ছিলাম, এ আবার কি উৎপাত! তাই সীমার লোভ, সীমার হ্যাংলামি, সীমার দুঃসাহসিক স্পর্ধাকে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গের ছুরি দিয়ে বিঁধতে চাইছে? ব্রজনাথ তো মহা সর্বনেশে লোক! কই, এই ছেলেটার কথা তো বলেন নি সীমার কাছে?
না, সত্যিই বলেন নি। সীমার কাছে না, সীমার মা-র কাছেও না। তারা জেনেছে, বাড়িতে কেবলমাত্র বিধবা মহিলাটিই থাকেন।
যতীন সব জানে। যতীনের সঙ্গে আড়ালে চুপি চুপি কথা। এই ছেলেটার খবর জানলে সীমা বিদ্রোহ করত। বিধবা ধনবতীর কবরিত মাতৃস্নেহকে কবর থেকে তুলে কাজে লাগাতে আসত না।
উদ্দালকের চেয়ারটা পড়তে পড়তে রয়ে গেল।
হচ্ছিল! বলে ফেলল সীমা। মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল।
উদ্দালক নিজেকে সোজা করে নিয়ে মৃদু হেসে বলে, যাক, শ্ৰীমতী নিধির তাহলে কণ্ঠস্বর আছে। আমি তো ভাবছিলাম, বিধি যদি বা পিসিমার নিধিকে এতদিনে এনে জুটিয়ে দিলেন, সেটি আবার মূকবধির।
সীমার মুখটা লাল হয়ে ওঠে। সীমা জানে না উদ্দালকের প্রকৃতিই ওই, ও হেসে ঠাট্টা করে ভিন্ন কথা বলে না। জানে না তাই যে ভুল ব্রজনাথ করেন, সেই ভুল সীমাও করে। ভাবে অহঙ্কারী, উন্নাসিক।
উদ্দালক আবার বলে, তারপর, শ্রীমতী নিধি, আপনার আজকের গতিবিধির প্রোগ্রাম কি? আগে থেকেই ঠিক-ঠাক হয়ে আছে? না
সীমা রুষ্ট মুখে বলে, সেটা আপনার পিসিমাকেই জিগ্যেস করবেন।
উদ্দালক যেন আকাশ থেকে পড়ে, আপনি মানে? আমি হচ্ছি সবেধন নীলমণি একটি দাদা, আমায় আপনি! অচল অচল।
সীমা আরও রুষ্ট মুখে বলে, আপনিও আমাকে আপনি বলেছেন।
আহা হা, সেটা তো কৌতুকার্থে—
গরীবদের প্রতি বোধহয় আপনার কৌতুক ব্যঙ্গ এসব খুব প্রবল?
গরীব? গরীব আবার কে এখানে?
কে তা আপনিও জানেন, আমিও জানি।
কী সর্বনাশ! আমি তো জানি, এখন আমি আমার পিসিমা ঠাকুরানীর হারানিধি এবং রায় কোম্পানীর একেশ্বরী মালিকানী মিস রায়ের সঙ্গে কথা বলছি–
সীমা হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণস্বরে বলে, খুব হিংসে হচ্ছে, না?
হিংসে? সেটা আবার কী হল?
ওঃ জানেন না বুঝি? অবোধ শিশু! কিন্তু আমি জানতে পারছি
কি পারছ?
আমাকে দেখে রাগে হিংসেয় আপনার সর্বাঙ্গ জ্বলছে।
হঠাৎ তড়াক করে চেয়ার থেকে লাফিয়ে ওঠে উদ্দালক, সর্বাঙ্গে দুহাত চাপড়াতে চাপড়াতে বলে, কই?
সীমা অবাক। না বলে পারে না, কি কই?
আগুন! উঃ, এমন ভয় লাগিয়ে দিয়েছিলে! ভাবলাম অবোধ শিশু বৈ তো নয়, সর্বাঙ্গ জ্বলছে খেয়াল করছি না।
আমাকে এত ব্যঙ্গ বিদ্রূপ না করলেও চলবে আপনার। আমি চলে যাব।
চলে যাবে। মানে?
মানে আবার কি! কারও স্বার্থের হানি করে থাকার রুচি আমার নেই।
না, বোবা কালা নয়, শুধু হেডঅফিসে একটু গণ্ডগোল। হেসে ওঠে উদ্দালক, আহা বেচারী পিসিমা, যদি বা বিনা ব্যঞ্জন ভাতে একটু শাক চচ্চড়ি জুটলো, তো সে আবার নুনে পোড়া। শেষে একটা পাগল মেয়ে–
সীমা দৃঢ়স্বরে বলে, আচ্ছা বার করুন আপনার তূণে আর কি কি অস্ত্র আছে দেখি–
অস্ত্র? অস্ত্র মানে? এ যে একেবারে নির্ভেজাল সত্য। পাগল না হলে বড়ভাইকে কেউ খামোকা গালমন্দ করতে বসে?
বড়ভাই! শব্দটা মনের তার ছুঁয়ে গেল না–ঝঙ্কার তুলল না। সীমা বিরসমুখে বলে, ওসব আমার আসবে না।
কি আসবে না?
এই বড়ভাই টাই–
সর্বনাশ! তবে কি ছোটভাই বানিয়ে দিদি সাজতে চাও নাকি? চলবে না, চলবে না। আমিও তাহলে অধিকার কায়েম রাখতে তুই বলতে শুরু করব। বুঝলে হে শ্ৰীমতী নিধি! কমসে কম আমি তোমার থেকে তিনটি বছরের বড়।
সীমা ভুরু কুঁচকে বলে, আপনি বুঝি আমার ঠিকুজি কুষ্ঠী দেখে নিয়েছেন ইতিমধ্যে?
ইতিমধ্যে মানে? পূর্বেবহুপূর্বে, তব জন্মক্ষণে। পিসিমা এবং পিসিমার ভ্রাতার খাতায় মহাশয়ার জন্মের সাল তারিখ মাস বার ক্ষণ লগ্ন সব কিছু লেখা আছে, বুঝলেন? চালাকিটি চলবে না।
