অনামিকাকে যারা ভালবাসে, অনামিকার জন্যে যাদের দরদ মমতা, তারা কি ব্যস্ত হয়ে বলবে না, এ কী হলো? একটা গ্রাসও তো মুখে দিলে না? সারাদিন পরে-বাইরেও তত কোথাও কিছু খাও না তুমি, ছি, ছি, ইস, সবই যে পড়ে রইলো! এই জন্যেই বলেছিলাম, খাওয়াদাওয়ার পরে শুনো। তুমিও ব্যস্ত হলে, আমিও বলে ফেললাম। আমারই অন্যায়, পরে বললেই হতো। আচ্ছা অন্ততঃ দুধটুকু খেয়ে নাও—
অনামিকাকে এমন করে মায়ামমতা দেখাবার সুযোগ সংসার কবে পায়? ভাগ্যক্রমে আবার অনামিকার স্বাস্থ্যটাও অটুট, কাজেই ওদিকে সুবিধে নেই। অথচ যারা ভালবাসে তাদের তো ইচ্ছে করে কখনো দুটো মমতার কথা বলি। তাই ছোটবৌদি, যে ছোটবৌদির ঠিকরে উঠে ছাড়া কথা বলার অভ্যাস নেই, তিনিও নরম গলায় বলেন, জানতামই এ খবর শুনে তোমার মনটা খারাপ হয়ে যাবে, সত্যি নিজের কাকার মতোই ভালবাসতেন তোমায়, আর তুমিও সেই রকমই ভক্তিশ্রদ্ধা করতে, কিন্তু আক্ষেপের তো কিছুই নেই। যেতে তো একদিন হবেই মানুষকে।
অনামিকাকে জ্ঞান দিচ্ছেন ছোটবৌদি। বয়সে অনামিকার থেকে ছোট হলেও, দাদার স্ত্রী হিসেবে সম্পর্কটা মর্যাদার। দুধটা এক নিঃশ্বাসে খেয়ে ফেলে উঠে পড়লেন অনামিকা।
তারপর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, হ্যাঁ, তোমাকেও একটা খবর দেবার ছিল, সুখবর। শম্পার একটা চিঠি পেয়েছি আজ। ও চন্দননগরের সেজদির কাছে রয়েছে।
চন্দননগরের সেজদির বাড়িতে শম্পা রয়েছে এ খবরটা ছোটবৌদির কাছে আনকোরা কথা নয়, আকস্মিকও নয়, তবু সেটা দেখানো দরকার, পরিস্থিতি যখন সেইভাবেই সাজানো।
ছোটবৌদিকে তাই চমকে উঠতে হয়। বলে উঠতে হয়, তার মানে? সেজদির কাছে? আর আমরা মরে পড়ে আছি? তোমার ছোড়দা তো তলে তলে পৃথিবী ওটকাচ্ছেন?
অনামিকা শুধু বললেন, সেই তো।
যে খবরটির প্রত্যাশায় দিনরাত্রির সমস্ত মুহূর্তগুলি ছিল উন্মুখ হয়ে, যে খবরটির জন্যে সমস্ত মনটা যেন উথলে ওঠবার অপেক্ষায় উদ্বেলিত হয়েছিল, সেই খবরটা কী একটা ব্যর্থ লগ্নেই এসে পৌঁছলো!
আর এমন হাস্যকরভাবে পরিসমাপ্তি। এত উদ্বেগ, এতো উৎকণ্ঠা, এতো দুশ্চিন্তার পর এই! বাপের ওপর রাগ করে পিসির বাড়ি গিয়ে বসে আছেন মেয়ে! কী লজ্জা! কী লজ্জা! সত্যি যেন লজ্জাই করলো অনামিকার ওই হাস্যকর খবরটা দিতে। এর থেকে অনেক ভালো ছিলো শম্পা যদি একটা বিপদের মধ্যে গিয়ে পড়ে অনেক কষ্ট পাওয়ার খবর জানাত।
মনের অগোচর পাপ নেই, সত্যিই মনে হচ্ছিল অনামিকার-শম্পা কেন কোনোখান থেকে বিপন্ন হয়ে একটা চিঠি দিলো না! অথবা শম্পা কেন সগৌরবে খবর পাঠাতে পারলো না, পিসি! বিয়েটা মিটিয়ে ফেলেছি, এখন ভাবলাম তোমাদের সেই শুভ খবরটি জানানো দরকার। তোমাকে জানালেই সবাই জানবে।
তা নয়, এমন দীন-হীন একটা খবর পাঠিয়েছে যে অনামিকার সেটা পরিবেশন করতে লজ্জা করলো।
তবু ঠিক পরিবেশনের মূহুর্তে ওই খবরের ওপর যদি আর একটা হিমশীতল খবর এসে না পড়তো! এখন কার কথা ভাবতে বসবেন অনামিকা? যাঁর কাছে আকণ্ঠ ঋণের বোঝা, অথচ জীবনের কোনোদিনই শোধ করা যায়নি, অথবা যা শোধ করা যায় না, শুধু আপন চিত্তের মধ্যে নিমগ্ন হয়ে স্মরণ করতে হয় মাথা নত করে, তার কথা? না ওই যে মেয়েটা দু’হাত বাড়িয়ে ছুটে আসতে চাইছে এক গভীর বিশ্বাসের নিশ্চিন্ততায়, তার কথা?
শম্পা জানে, সে যত দোষই করুক, যতো উৎপাতই ঘটাক, অনামিকার হৃদয়কোটরে তার অক্ষয় সিংহাসন পাতা।
ছোটবৌদি এবার স্বক্ষেত্রে নামেন, কিন্তু এও বলি ভাই, সেজদির কি উচিত ছিল না তলে তলে খবরটা আমাদের দেওয়া? আমরা কোন প্রাণে রয়েছি সেটা তিনি টের পাচ্ছিলেন না?
অনামিকার দাঁড়াতে ইচ্ছে করছিল না। ইচ্ছে হচ্ছিল এই আলো আর শব্দের জগৎ থেকে সরে গিয়ে একটু অন্ধকারের মধ্যে আশ্রয় নিতে, কিন্তু সে ইচ্ছে মিটবে কি করে? খাল কেটে, কুমীর তো নিজেই আনলেন!
অনামিকা কি বুঝতে পারেননি শম্পার খবরটা দেবার সঙ্গে সঙ্গেই এই শব্দের কুমীরটা তাঁকে গ্রাস করতে আসবে, সহজে ছাড়িয়ে নিয়ে পালাতে পারবেন না?
বুঝতে পেরেছিলেন বৈকি, হয়তো সেই জন্যেই একটু ইতস্ততঃ করেছিলেন, ভেবেছিলেন আপাতত ভুলে যাওয়ার ভান করলে কী হয়? যদি আগামীকাল সকালে বলা যায়, দেখো বাড়ি আসতে-না-আসতেই ওই খবরটা পেয়ে শম্পার চিঠিটার কথা হঠাং ভুলে গিয়েছিলাম! তাহলে?
কিন্তু তাহলে কি আরো বহু শব্দের কাঁকের মুখে পড়তে হতো না? হিসেব হতো না অনামিকার কাছে কার মূল্য বেশী? যে হারিয়ে গেল, না যে হারিয়ে গিয়ে ফিরে এলো!
ভবিষ্যতের সেই শব্দের ঝাঁকের ভয়ে অনামিকা ইতস্ততঃ করেও এখনই খালটা কাটলেন। তাছাড়া মমতাবোধও কি কিছু কাজ করেনি? মনে হয়নি খবর পেয়ে বাঁচবে মানুষটা?
কিন্তু বেঁচে গেলেই কি বর্তে যাবে মানুষ? অন্যের উচিত অনুচিতের হিসেব নিতে বসবে না?
অনামিকা নিষ্প্রাণ গলায় বলেন, খুবই ঠিক। বোধ হয় শম্পাটা খুব করে বারণ করে দিয়েছিল।
বাঃ, বেশ বললে ভাই
ছোটবৌদির ক্ষণপূর্বের মমতাবোধটুকুর আর পরিচয় পাওয়া যায় না, তিনি রীতিমত ক্রুদ্ধ এবং ক্ষুব্ধ গলায় বলেন, তোমাদের বোনে বোনে এক অন্য বিধাতার গড়া বাবা! ও যদি বারণ করেই থাকে, করবেই তো, যে মেয়ে বাপের ওপর তেজ করে বাড়ি ছাড়ে, সে আর খবর দিতে বারণ করবে না? কিন্তু সেটাই একটা ধর্তব্যের কথা হলো?
