হলো না, সেটা অনামিকাও মনে মনে স্বীকার না করে পারেন না। সেজদির ওপর দুরন্তু একটা অভিমানে তারও তো মনটা কঠিন হয়ে উঠেছিল। তবু সায় দেওয়ার একটা দায়িত্ব আছে। সেটা যেন গলা মিলিয়ে নিন্দে করার মতো মনে হলো অনামিকার। তাই আস্তে বললেন, মেয়েটা তো বড়ো জবরদস্তওলা কিনা!
ছোটবৌদি এতক্ষণে নিজস্ব ভঙ্গীতে ঠিকরে উঠতে সুযোগ পান।
বলে ওঠেন, বললে তুমি রাগ করবে ভাই, বাইরে তোমার কত নামডাক, কতো মান্য সম্ভ্রম, তোমার বুদ্ধি নিয়ে কথা বলা আমার মতো মুখ্যুর সাজে না, তবু না বলে পারছি না–পিসির আস্কারাতেই মেয়ে অতত দুধর্ষ হয়েছে।
এ অভিযোগ আজ নতুন নয়, সুযোগ পেলেই একথা বলে থাকেন ছোটবৌদি, বলে আসছেন চিরকাল, আজ তো একটা মোক্ষম সুযোগ পেয়েছেন, তাই চুপ করে বসে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই নামডাকগুলো মান্যগণ্য অনামিকা দেবীর।
ছোটবোদি আবারও শুরু করেন, এখন আবার আরো পৃষ্ঠবল বাড়লো। যে পিসিকে জন্মে চোখে দেখেনি, আবার তার সোহাগও জুটলো৷ তলে তলে চিঠিচাপাটি চলত নিশ্চয়, নইলে মেয়ের এতো দুঃসাহসই বা আসে কোথা থেকে, আর চট করে ওখানে গিয়েই বা ওঠে কেন? যাক, তোমাদের সব কি দেব, আমারই কপাল! নিজের মেয়েকে কখনো নিজের করে পেলাম না। তাই নিজের ইচ্ছেমত গড়তে পেলাম না।
হঠাৎ ধৈর্যচ্যুতি ঘটে যায়। যা নামিকার প্রকৃতিবিরুদ্ধ। তাই হয়ে যায়। হঠাং বলে বসে অনামিকা, মেয়েকে নিজের করে পেয়ে, নিজের ইচ্ছেমতো গড়ার নমুনাও তো দেখছি–
বলে ফেলেই নিজেকে নিজে ধিক্কার দিলেন অনামিকা, ছি ছি, এ তিনি কী করে বসলেন এই হঠাৎ অধৈর্য হয়ে পড়া মন্তব্যটির জন্যে ভবিষ্যতে কতো ধৈর্যশক্তি সংগ্রহ করতে হবে ছোটবৌদি কি একথা অপূর্ব-অলকার কানে না তুলে ছাড়বে?
তারপর? আর তো কিছু না, মারবে না কেউ অনামিকাকে, কিন্তু ওই শব্দ! শত শত শব্দের তীরের জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে অনামিকাকে।
যদিও নিজে ছোটবৌদি অহরহই এমন মন্তব্য করে থাকেন, তার ভাশুরপো-বৌ অলকা যে ফ্যাশান দেখাতে গিয়ে মেয়ের পরকাল ঝরঝর করেছে, একথা কারণে অকারণেই বলেন। আর হয়তো বা অকারণেও নয়! অলকার ওই মেয়ে, ডাকনাম যার অনেক রকম, ভালো নাম সত্যভামা, সে মেয়েটা সম্পর্কে অনেক রকম কথাই কানে এসেছে। প্রবোধচন্দ্রের এই পবিত্র কুলে, কালের ওই কন্যাটির দ্বারা নাকি বেশ কিছু কালি লেপিত হয়েছে, তবে মা বাপ তার সহায়, সে কালি তলে তলে মুছে ফেলা হয়েছে। আধুনিক সভ্যতা তো অসতর্কতার অভিশাপ বহন করে বেড়াতে বাধ্য করায় না।
তবে ইদানীং যা করাচ্ছে অলকা মেয়েকে দিয়ে, সেটা প্রবোধের কুলে কলঙ্ক লেপন করলেও অলকা সগৌরবেই প্রকাশ করছে। কিছুদিন এয়ার হোস্টেসের চাকরি নিয়ে অনেক ঝলমলানি দেখিয়ে এখন সত্যভামা আর এক ঝলমলে জগতের দরজা চিনে ঢুকে গিয়েছে। চিনিয়েছে ওর এক দূর সম্পর্কের মাসির মেয়ে, কিন্তু এখন নাকি সত্যভামা তাকে ছাড়িয়ে অনেক দূরে এগিয়ে গেছে।
সত্যভামা নাকি ক্যাবারে নাচছে হোটেলে হোটেলে। অলকাই সগর্বে বলে বেড়ায়, এক জায়গায় বাঁধা চাকরিতে ওকে নাকি তিষ্ঠোতে দেয় না লোকে, নানা হোটেল থেকে ডাকাডাকি করে টেনে নিয়ে যায়। গুণ থাকলেই গুণগ্রাহীরা তার সন্ধান পায় এটাও যেমন স্বাভাবিক, গুণীকে টানাটানি করাও তেমনি স্বাভাবিক। অতএব ধরে নেওয়া যেতে পারে অলকা এসব বানিয়ে বলে না।
অবশ্য প্রথম যখন সত্যভামার এয়ার-হোস্টেসের চাকরির খবরটা প্রবোধচন্দ্রের ভিটের সংসারভূমিতে এসে আছড়ে পড়েছিল, তখন মস্ত একটা ধূমকুণ্ডলী উঠে অনেকটা আলোড়ন তুলেছিল!
অনামিকা পর্যন্ত অলকাকে ডেকে জিজ্ঞেস না করে পারেননি, কথাটা কি সত্যি অলকা?
অনামিকা বিস্ময় প্রকাশ করেননি, বিস্ময় প্রকাশ করলো অলকা। বললো, সত্যি না হবার কী আছে পিসিমা? মেয়েরা তো আজকাল কত ধরনেরই চাকরি করছে। আর এ তো বিশেষ করে মেয়েদেরই চাকরি।
ওর ওই বিস্ময়টাই যে ওর বল, তা বুঝতে পেরে অনামিকা আর কথা বাড়াননি। শুধু কথার সতোর মুখ মুড়তেই বোধ হয় বলেছিলেন, তা বটে। তবে কষ্টের চাকরি। খাওয়া শোওয়ার টাইমের ঠিক নেই। নাইটডিউটি-ফিউটি দিতে হবে হয়তো–
সে তো হবেই। অলকা মুখটি মাজাঘষা মসৃণ করে উত্তর দিয়েছে, কন্ট্রাক্টে তো সেকথা আছেই। কিন্তু সে সমস্যা তো জগতের সব চেয়ে পবিত্র পেশার নার্সদেরও আছে।
অনামিকা আর কথা বলেননি, কিন্তু বলেছিলেন অনামিকার ছোড়দা। অলকাকে ডেকে নয়, অপূর্বকে ডেকে।
নিজেকে বংশমর্যাদার ধারকবাহক হিসেবে ধরে নিয়ে প্রবোধচন্দ্রের পরিত্যক্ত মশালটি তুলে ধরে তীব্র প্রশ্ন করেছিলেন, বাড়িতে এসব কী হচ্ছে অপূর্ব? তোমরা কি ভেবেছো বুকে বসে দাড়ি ওপড়াবে? বাড়িতে বসে যা খুশি করবে?
অপূর্ব খুব শান্ত গলায় বলেছিল, হঠাৎ কী নিয়ে এমন উত্তেজিত হচ্ছো ছোটকাকা বুঝতে পারছি না তো!
ছোটকাকা আরো উত্তেজিত হবেন, এতে আশ্চর্য নেই। সেটা হয়েই তিনি বলে ওঠেন, ন্যাকা সেজে না অপূর্ব! মেয়েকে এয়ার হোস্টেসের চাকরি করতে পাঠিয়েছো, একথা কী অস্বীকার করবে?
কেন? অস্বীকার করতে যাবো কেন? অপূর্ব বলেছিল, মেয়েকে তো আমি চুরিডাকাতি করতে পাঠাইনি! চাকরি করতেই পাঠিয়েছি। তাতে আপত্তি করলে–
