বলবে না তুমি অবিশ্যি, তবে বলতে পারতে, বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার সময় তো একবার
বলেও গেলি না, আর ডুব মেরে বসে আছিস তো আছিসই, এখন কোন্ লজ্জায় এতো জোর খাটাতে
এলি? অন্য কেউ হলে বলতো নির্ঘাত!
কিন্তু অন্য কেউ হলে কি জোরটা খাটাতে বসতাম? তুমি বলেই তাই। আচ্ছা পিসি,
সেজপিসি আর তুমি-ঠাকুর্দার এই দুটো মেয়ে পালিতা কন্যা-টন্যা নয় তো? কুড়নো টুড়নো?
নইলে ধমনীতে রাজরক্তের চিহ্ন দেখি না কেন? যাক, দেখা হলে অনেক গল্প হবে। এখন দেখার
যোগাড়টা যাতে হয় তাড়াতাড়ি করো। বাসাটায় একটু বারান্দা যেন থাকে বাপু, আর পার তো
দুটো বেতের মোড়া কিনে রেখো।…কী? ভাবছো তো, আহা যোগাড় করেছেন তো একটি নিধি!
চাষা কুলি, তার জন্যে আবাব বেতের মোড়ার চিন্তা! কী করবো বল? যেমন কপাল! ও ছাড়া তো
জুটলোও না আর। তবে চুপি চুপি বলি পিসি, মালটা খাঁটি। নির্ভেজাল। …তোমার ভাই-ভাজের
খবর কী? কন্যাহারা চিত্ত নিয়ে দুজনে পরস্পরের দোষ দিয়ে অহরহ ঝগড়া করছেন? এবার
তাহলে কলম রাখছি।
আর একবার কথা দুটো মনে করিয়ে দিচ্ছি। ভালবাসা নিও।
ইতি
সেই পাজি মেয়েটা
অনামিকার মনে হলো অনেকদিনের অনাবৃষ্টির পর বড় সুন্দর বড় একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেল।
নেমে এলেন।
আহ্লাদে মনটা কানায় কানায় ভরে উঠেছে। কী আনন্দ, কী মুক্তি।
অবিশ্যি এমন দুটি কাজের ভার দিয়ে বসেছে, যা গন্ধমাদন-তুল্য। তবু ভারী হাল্কা লাগছে।
কিন্তু এখন কী করা যায়?
ছোড়দা-ছোটবৌদিকে জানাবেন না?
আহা, তাই কী উচিত? বেচারীরা কী অবস্থায় রয়েছে।
তাছাড়া ছোড়দার কাছে কথা দেওয়া আছে। খবর এলেই জানাবো।
কথা দেওয়ার কথা আলাদা।
তবে শম্পার মা-বাপ খুব একটা খারাপ অবস্থায় নেই। যদিও খারাপের ভান করছেন।
আসলে কিন্তু মেয়ের খবর তারা অনেকদিনই পেয়েছেন। পারুলের ছেলে মোহনলাল জানিয়ে দিয়েছিল তার মামার বাড়িতে।
মামাদের সঙ্গে সাতজন্মে যোগাযোগ নেই। তাতে কি? এরকম এমার্জেন্সি কেস-এ সেসব মান-অভিমান মনে রাখা চলে না।
অবশ্য মামার বাড়িতে খবর দেবার উদ্দেশাটা ঠিক মামার দুশ্চিন্তা দূর করার জন্যে নয়, ভেবেছিল খবর পেলেই মামা মেয়েকে ঘাড় ধরে নিয়ে চলে আসবে, আর সেই অসভ্য বাঁদরটাকে পুলিসে ধরিয়ে দেবে।
বুদ্ধিমান মামা সেদিক দিয়ে যায়নি।
পারুলের কাছে আছে। এর পর আর কি আছে?
কিন্তু অনামিকা তা জানতেন না।
অনামিকা তাই ভাবতে ভাবতে নামলেন, কী ভাবে কথাটা উত্থাপন করবেন? ওরা যদি বলে, কই চিঠিটা দেখি?
নিচে এলেন।
খাবার ঘরের সামনে ছোটবৌদি দাঁড়িয়ে।
অনামিকাকে দেখেই বলে উঠলেন, এসেই ওপরে উঠে গেলে, একটা কথা বলার ছিল চকিত হলেন অনামিকা।
ব্যাপারটা কি? কি কথা বলার জনো উনি অমন মুখিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন? সত্যবানকে কেউ দেখেছে নাকি? অনামিকার সঙ্গে এক গাড়িতে আসতে? হয়ত তাই।
তার মানে কাঠগড়ায় তুলবেন ইনি ওঁর ননদিনীকে। অনামিকা শান্ত হাসি হেসে বললেন, কী বলো?’
বৌদি বললেন, আচ্ছা এখন থাক, খেয়ে নাও আগে।
বৌদির গলার সুরে যেন ঈষৎ করুণা।
যেন যা বলবেন, খাইয়ে-দাইয়ে বলবেন।
অর্থাৎ বক্তব্যটা অন্য ধরনের। কিংবা ফাঁসিই দেবেন, তাই তার আগে
খেয়ে নেবার কী আছে? কী হয়েছে? হঠাৎ কী হলো? বললেন অনামিকা দাঁড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু কী হয়েছে, কী হলো, তা কি অনামিকার ধারণার ধারে কাছে ছিল?
অথচ একেবারে না থাকার কথা নয়। আশী বছর বয়েস হয়েছিল সনৎকাকার।
কিন্তু সেটাই কি সান্ত্বনার শেষ কথা? বয়েস হয়েছিল, অতএব পৃথিবীর ক্ষতির ইতিহাসের খাতায় আর তার নাম উঠবে না? তার চলে যাওয়ার দিকে উদাসীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে পৃথিবী?
পৃথিবীর হিসেবে তাই বটে। তাই অনামিকার কানের মধ্যে একটা ঘর্ঘর শব্দ যেন বলেই চলেছে, অবিশ্যি দুঃখের কিছু নেই, বয়েস হয়েছিল!
বয়েস হয়েছিল? অতএব তার আর পৃথিবীর কাছে কোনো পাওনা নেই। তার জন্যে যদি কোথাও কোনোখানে হাহাকার ওঠে, সেটা হাস্যকর আতিশয্য।
সোনা পুরনো হয়ে গেলে তার মূল্য কমে যায় না, অথচ ভালবাসার পাত্র পুরানো হয়ে গেলে তার মূল্য কমে যায়। কারণ সে আর প্রয়োজনে লাগছে না। বিচার করে দেখো, শোকের মূল কথা প্রয়োজনীয় বস্তু হারানো। যে যতো প্রয়োজনীয় তার জন্যে ততো শোক।
যে পৃথিবীর আর কোনো প্রয়োজনে লাগছে না, লাগবে না, তাকে অম্লানচিত্তে বিদায় দিয়ে বলল, বয়েস হয়েছিল! বলো, মানুষ তো চিরদিনের নয়। আর যদি কিছুটা সৌজন্যের আবরণ দিতে চাও তো বলো, মৃত্যু অমোঘ, মৃত্যু অবধারিত, মৃত্যু অনিবার্য। মৃত্যুর মতো সত্য আর কি আছে?
অতএব যার ভিতরে ঋণের বোঝা, যার চিত্তে মূল্যহ্রাসের প্রশ্ন নেই, তাকে সকলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলতে হবে, তা তো সত্যি!
তার আর বলা সাজবে না, ঠিক এই মুহূর্তে খাবার থালার সামনে বসা শক্ত হচ্ছে আমার।
তাছাড়া অনামিকা জানেন, ওই অক্ষমতাটুকু প্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে মুঠো মুঠো সান্ত্বনার বাণী এসে হৃদয়ের গভীরতর অনুভূতিটির উপর হাতুড়ি বসাবে। সেই সঙ্গে আরো একবার স্মরণ করিয়ে দেবে লোকে, যার জন্যে তোমার এই অক্ষমতা তার বয়েস হয়েছিল।
তার থেকে অনেক ভালো খাবার পাত্রের সামনে নিঃশব্দে গিয়ে বসা, নীরবে যতোটুকু সম্ভব গলা দিয়ে নামানো। কিন্তু তাতেই কি পুরো মুক্তি পাওয়া যায়?
