মনের অগোচর কিছু নেই, স্বয়ংবরা শম্পার পছন্দর খুব তারিফ করতে পারছিলেন না অনামিকা। তবু মনের মধ্যে একটি প্রত্যয় ছিল শম্পা সম্পর্কে। তাই ওর সঙ্গে মমতার সঙ্গেই কথা বলছিলেন।
কি লিখেছে তুমি জানো?
না। এমনি বন্ধ খামই দিয়েছেন।
দিয়েছেন! অনামিকার একটু হাসি পেল।
এই সমীহ নিয়েই কি ওরা ঘর করবে? বাদশাজাদি ও কাফ্রী ক্রীতদাসের মত?
রাত হয়ে গিয়েছিল যথেষ্ট, ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি বেশ ভালই চলছিল, হঠাৎ আবার তখনকার মতই থামতে হলো। আবার শোভাযাত্রা।
না, এখন আর রক্তের বদলে রক্ত চাইছে না শোভাযাত্রীরা। আলোর রোশনাইয়ে চোখ ঝলসে দিয়ে ব্যাগপাইপ বাজাতে বাজাতে যাচ্ছে।
বর যাচ্ছে বিয়ে করতে!
অনামিকার মুখে একটু হাসি ফুটে উঠলো। আজকের যাত্রাটা মন্দ নয়। যাত্রাকালে খুনের বদলে লাল খুন, ফেরার কালে বাজনা-বাদ্যি-আলো-বাতি।
তবে পথ আটকাচ্ছে দুটোতেই।
এই হচ্ছে কলকাতার চরিত্র।
ও এক চোখে হাসে, এক চোখে কাঁদে। এক হাতে ছুরি শানায়, অন্য হাতে বাঁশী বাজায়।
.
বাড়ির কাছাকাছি আসার আগেই সত্যবান বললো, আমি নেমে যাই!
কিন্তু চিঠিটা তো আমি এখনো পড়িনি। পড়ে দেখি যদি কিছু জবাব দেবার থাকে।
না না, সে আপনি চিঠিতেই দেবেন। আমি তো এখন আর যাচ্ছি না।
অনামিকা এবার সরাসরি প্রশ্ন করেন, তোমাদের বিয়েটা হয়ে গেছে?
ও মাথা নিচু করে, না।
তাহলে এভাবে এতদিন একত্রে ঘুরছো যে?
অনামিকার কণ্ঠ কঠোর।
আসামী মুখ তুলে তাকিয়ে বলে, আপনি কি বলেন, বিয়ে হওয়া উচিত?
আমার বলার উপর কিছু নির্ভর করছে না। সেজপিসি তোমাদের এ বিষয়ে কিছু বলেননি?
না।
সত্যবান হঠাৎ কিঞ্চিৎ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, উনি এক আশ্চর্য মানুষ। অদ্ভুত ভালো। আমি এ রকম উঁচুদরের মানুষ জীবনে দেখিনি। কোথা থেকেই বা দেখবো। গ্রামঘরের ছেলে, কুলিমজুরের কাজ করি–অবশ্য ওর মুখে আপনার কথাও শুনেছি–মানে শম্পা দেবীর মুখে–
অনামিকা হেসে ফেলেন, যাক, আমি তোমাদের সেজপিসিকে হিংসে করব না, তবে আমার মতে বিয়েটা তাড়াতাড়ি করে ফেলাই ভালো।
উনিও তাই বলেন-মানে, শম্পা দেবী। আমি ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে
কেন? তোমার মনস্থির নেই?
সত্যবান ম্লানমুখে বলে, সত্যিই বলেছেন। আমার ভয় করে। সত্যিই তো আমি যোগ্য নই।
নিজের যোগ্যতার বিচার সব সময় নিজে করা যায় না বাপু। অনিবার্যকে মেনে নিতেই হয়। মেয়েটা যখন বাড়ি থেকে চলে গিয়ে তোমাকে ধরেই ঝুলে পড়েছে, তোমার আর করার কিছু নেই। কিন্তু একটু বসে যাবে না?
ও, না না। আপনাদের ওই বাড়ির কাছাকাছি যাওয়া নিষেধ।
ও নেমে পড়ে। তাড়াতাড়ি এগিয়ে যায়।
অনামিকা আর একটু এগিয়ে এসে নামেন, ভাড়া মিটোন। আস্তে আস্তে বাড়ি ঢোকেন, তিনতলায় ওঠেন।
নিজে নিজেই ভারী অবাক লাগছে।
ওই ধরনের একটা ছেলেকে পাশে বসিয়ে গল্প করতে করতে আসছেন, আগে কখনো এমন ঘটেনি। অথচ বিতৃষ্ণা আসছিল না। তাছাড়া কেমন একটু স্নেহ-স্নেহ মমতা-মমতাই লাগছে। আহা বেচারী, ভয় পেতেই পারে।
কিন্তু শম্পার এ খেয়ালই কি টিকবে? আবার শম্পা নতুন হৃদয় খুঁজতে বসবে না তো?
চিঠিখানা হাতের মধ্যে থেকে ব্যাগে পুরেছিলেন, তবু যেন হাতটায় কিসের স্পর্শ লেগে রয়েছে। ভিতরে কী তোলপাড়ই চলছে! তবু শান্ত মূর্তির অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছেন, সারাজীবন ধরে যা রপ্ত করেছেন।
চিঠিটা কি পড়ে ফেলতে পারতেন না এতক্ষণ? রাস্তায় কি আলো ছিল না? কিন্তু পড়েননি। নিজেকে সংবরণ করেছেন এতক্ষণ।
কারণ চট করে ওই পরম পাওয়াটি ফুরিয়ে ফেলার ইচ্ছে হচ্ছিল না। ধীরেসুস্থে নিজের ঘরে বসে আস্তে আস্তে ওর আবরণ উন্মোচন করবেন, আস্তে আস্তে উপভোগ করবেন। তাই
অনুমান পর্যন্ত করতে চেষ্টা করছেন না কী লেখা আছে চিঠিতে! কী থাকতে পারে?
হয়তো ডাকে আসা চিঠি হলে এ ধৈর্য রাখতে পারতেন না, ভয় হতো কোথাও কোনোখানে বিপদের মধ্যে পড়েনি তো মেয়েটা।
কিন্তু ধৈর্য ধরতে পারছেন, কারণ চিঠিটা এসেছে একটা ভরসার হাত ধরে।
.
অক্ষরগুলো যেন পুরনো বন্ধুর মুখ নিয়ে হাসিতে ঝলসে উঠলো।
পিসিগো, একটা আস্তানার অভাবে বিয়ে করতে পারছি না, বল তো এমন হাড়দুঃখী
ত্রিজগতে আর আছে? যাক গে, এখন অগতির গতি তোমাকেই জানাচ্ছি, চটপট যাহোক একটা
কিছু ব্যবস্থা করে ফেলো। আর শোনো-একটা চাকরিও খুব তাড়াতাড়ি দরকার। মানে সামনের মাস
থেকেই জয়েন করতে চাই। জানো তো সবই, তাছাড়া দেখলেই বাকিটা বুঝতে পারবে (মানে
পত্রবাহকই তো সেই অবতার)। চালাতে পারবে না বলে রেজিস্ট্রি অফিসের ছায়া পর্যন্ত মাড়াতে
যেতে রাজী হচ্ছে না। বোঝ আমার জ্বালা!
বুঝে নিয়ে চটপট ওই দুটো ঠিক করে ফেলে খবর দাও, নইলে মুখ থাকবে না।
সেজপিসির বাড়িতেই রয়েছি এযাবৎ, বোঝ কী রকম বীরাঙ্গনা! বাপের ওপর তেজ দেখিয়ে
বাপের বোনর বাড়িতে গিয়ে ঠেলে উঠলাম! আবার একা নয়, সবান্ধবে! পিসি তাকে খাইয়ে শুইয়ে
ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ-পথ্য করিয়ে আবার চরতে ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু ছাড়া গরু পাছে হারিয়ে যায়
এই ভয়ে মরছি। তাড়াতাড়ি খোঁয়াড়ে পুরে ফেলা দরকার। তাই ওই খোয়াড়টাই আগে দ্যাখো,
বুঝলে? অবিশ্যি সঙ্গে সঙ্গে চাকরিটাও। নিজের স্বার্থেই কর বাবা, নচেৎ যতদিন না জুটবে, তোমার
ঘাড়ই তো ভাঙবো। শাখামৃগের মতো এ শাখা থেকে ও শাখা, এ পিসির ঘাড় থেকে ও পিসির
ঘাড়ে।
