খুব কালো! একটু ইয়ে ক্লাসের মতো!
অনামিকা এক মুহূর্তে আকাশপাতাল ভেবে নিলেন। বললেন, কী বলছে?
বলছে আপনার সঙ্গে একবার দেখা করবে
কারণ বলছে না কিছু?
বলেছে। বলেছে, আপনার কাছে কার একটা চিঠি পৌঁছে দিতে এসেছে।
কী চিঠি? কার চিঠি? সমস্ত মনটা আলোড়িত হয়ে উঠলো। আস্তে বললেন, আচ্ছা এখানেই য়ে এসো।
ঘরের মধ্যে একটা মৃদু গুঞ্জন উঠলো। এখানে কেন রে বাবা?
কে কী মতলবে খোঁজ করছে? দিনকাল খারাপ।
খোঁজ করলে ওঁর নিজের বাড়িতে করুক গে না, হঠাৎ এরকম জায়গায়?
অথচ সভানেত্রীকে মুখ ফুটে বলা যায় না, আপনি বাইরে বেরিয়ে গিয়ে দেখুন না। সকলেই তাই একটু শুধু ঠিক হয়ে বসেন।
লোকটা এসে দরজার কাছে দাঁড়ায়, বোধ করি সকলের উদ্দেশেই একটি নমস্কার করে, তারপর খুব সাবধানী গলায় বলে, আমাকে দেবার জন্য একটা চিঠি ছিল–
অনামিকা একবার ওর আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নেন, সঙ্গে সঙ্গে কে যেন বলে ওঠে, এ সেই!
না, কোনো দিন অনামিকা ওকে চোখে দেখেননি, তবু যেন চেনাই মনে হলো। চেয়ার থেকে উঠে একটু এগিয়ে এসে বললেন, কে দিয়েছে চিঠি?
প্যান্টের পকেট থেকে টেনে বার করে বাড়িয়ে ধরলো।
মুখ-আঁটা খাম!
কিন্তু খামের ওপরে লেখা অক্ষরগুলোর ওপরেই যে ভেসে উঠলো একখানা ঝকঝকে মুখ!
অনামিকা আস্তে বললেন, কোথায় আছে ও?
সবই লেখা আছে।
আচ্ছা তুমি একটু দাঁড়াও, চলে যেও না। ঘুরে দাঁড়ালেন অনামিকা। এদের বললেন, দেখুন একটু জরুরী দরকারে আমায় এক্ষুনি যেতে হবে, দয়া করে যদি গাড়িটা–
সে কি! আপনি তো চা-টা কিছুই খেলেন না?
থাক্, ইচ্ছে করছে না। গাড়িটা একটু
একটু!
তার মানে তাড়াতাড়ি?
কিন্তু সেটা হবে কোথা থেকে?
পুলিনবাবুর গাড়ি তো আর বসে নেই, সে তো সভানেত্রীকে পৌঁছে দিয়েই পুলিনবাবুর কাছে পৌঁছে গেছে।
অতএব?
অতএব ট্যাক্সি।
অতএব অনেকক্ষণ অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
চিঠিখানা হাতের মধ্যে জ্বলন্ত আগুনের মতো জ্বলছে।
কিন্তু এখানে কোথায় খুলবেন?
এ চিঠি কি এইখানে খুলে পড়বার?
যে ভদ্রলোক তর্ক ফেঁদেছিলেন, তিনি হতাশ হয়ে যান এবং বাইরে বেরিয়ে গিয়ে বুড়োদাকে বললেন, যত সব এড়ে তর্ক, বুঝলে বুড়োদা? এত বড় একটা সমস্যাকে উনি একেবারে এক কথায় নস্যাৎ করে দিতে চান! যেন বেকার সমস্যাটা একটা সমস্যাই নয়!
বলবেন না কেন ভায়া? বড়লোকের মেয়ে, বে-থা করেননি, বাপের অট্টালিকায় থাকেন, নিজে কলম পিষে মোটা মোটা টাকা উপায় করছেন, বেকারত্বের জ্বালাটা যে কী, বুঝবেন কোথা থেকে?
কিন্তু ওই নিগ্রো প্যাটার্নের ছোঁড়াটা কে বল তো? চিঠিটাই বা কার? হাতে নিয়েই মুখটা কেমন হয়ে গেল, দেখলে?
দেখলাম। অথচ খাম খুলে দেখলেন না, সেটা দেখলে।
দেখেছি সবই। তার মানে জানাই ছিল চিঠি আসবে আর কী চিঠি আসবে।
কিছু ব্যাপার আছে, বুঝলে? চিঠিটা দেখেই যাবার জন্যে কি রকম উতলা হলেন দেখলে? বলা হলো জরুরী দরকার! আরে বাবা, চিঠিটা তুমি খুললে না-লোকটাও কিছু বললো না, অথচ জেনে গেলে জরুরী দরকার, এক্ষুনি যেতে হবে?
বললাম তো জানা ব্যাপার। কে জানে কোনো পার্টির ব্যাপার কিনা, ভেতরে ভেতরে কে যে কি করে, জানবার তো উপায় নেই!
ছোঁড়াটার চেহারা মোটেই ভদ্রলোকের মত নয়।
যাক, এখন মানে মানে পৌঁছে দাও।
সঙ্গে যাচ্ছে কে?
স্বপন এনেছে, স্বপনই যাবে।
ছোঁড়াটাকে তো দাঁড়াতে বললেন, যতদূর বুঝছি, ওকেও সঙ্গে নেবেন।
তবেই তো মুশকিল! স্বপনকে সঙ্গে দেওয়াটা ঠিক হবে? কি জানি কোন পার্টি-ফার্টির যতক্ষণ না ট্যাক্সি আসে, চলতে থাকে গোপন বৈঠক এবং নিশ্চিত বিশ্বাসে ঘোষণা হয়, মহিলাটির ওপরের আবরণ যাই থাক্, কোনো পার্টির সঙ্গে যোগসাজস আছেই।
.
সন্দেহটা নিশ্চিত বিশ্বাসে পরিণত হলো যখন অনামিকা দেবী বললেন, গাড়িটা যখন ঘরের গাড়ি নয়, ট্যাক্সি, তখন আর এ ছেলেরা কষ্ট করে অত দূর যাবে কেন, ফিরতে অসুবিধে হবে, এই ছেলেটি আমার চেনা ছেলে, ওই দিকেই যাবে, ওর সঙ্গেই বরং
এরা গূঢ় অর্থপূর্ণ হাসি হাসলেন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে, তারপর সবিনয়ে বললেন, সেটা কি ঠিক হবে? আমরা নিয়ে এলাম–
তাতে কি, আমি তো নিজেই বলছি, চিন্তার কিছু নেই।
গাড়িতে উঠলেন। কাফ্রীর মত দেখতে ছেলেটাকে ডাকলেন, তুমি উঠে এসো।
গাড়িতে স্টার্ট দেওয়ার পর ওঁরা বললেন, দাঁড়ান একটু দাঁড়ান, আপনার ইয়েটা পকেটে হাত দিলেন।
অনামিকা বললেন, ঠিক আছে, ঠিক আছে।
ওরা পকেটের হাত পকেট থেকে বার করে নিয়ে বললেন, না না, এ কী! আপনি নিজে কেন–
গাড়ি চলার শব্দে ওদের কথা মিলিয়ে গেল।
একটু সময় পার করে অনামিকা বললেন, তোমার নাম সত্যবান?
সত্যবান মাথা নিচু করে বললো, হ্যাঁ।
ওর সঙ্গে কোথায় দেখা হলো?
সে তো অনেক কথা
একটুখানি কথায় বুঝিয়ে দাও না?
সত্যবান হঠাৎ মাথাটা সোজা করে বসে।
স্পষ্ট গলায় বলে, রাগ করে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে উনি আমার মেসে উঠেছিলেন, তার পর আমাকে নিয়ে চন্দননগরে সেজপিসির বাড়ি
চন্দননগরে! সেজপিসির বাড়ি! অনামিকা প্রায় আর্তস্বরে বলে ওঠেন, ওইখানেই আছে শম্পা?
আজ্ঞে হ্যাঁ। আমিও ছিলাম। ফিরে আসার উপায় ছিল না, খুব অসুখ করে গিয়েছিল
.
আস্তে আস্তে শম্পার খবর জানা হয়।
অনামিকার হঠাৎ সেজদির উপর দারুণ একটা অভিমান হয়। কত কষ্ট পাচ্ছিল বকুল, সেটা কি খেয়ালে আসা উচিত ছিল না সেজদির?
