সব ভাবছি মাসিমা, মাথার মধ্যে আগুন জ্বলছে। ইঃ, আমরা যদি ঠিক এর আগেরটায় পার হয়ে যেতে পারতাম। পুলিনবাবুই এইভাবে ডোবালেন?
পুলিনবাবু।
চিনবেন না। একটা ছেলে যেন কাঠে কাঠ বুকে কথা বলছে, আমাদের সাধারণ সম্পাদকের শালা, গাড়িটা দেবেন বলেছিলেন, তাই আর ট্যাক্সি-চ্যাক্সি করা হলো না। দিলেন, একেবারে লাস্ট মোমেন্টে। ওদিকে মেয়র এসে বসে আছেন।
অনামিকা মৃদু হেসে বলেন, তিনি কি আর সভানেত্রীর জন্যে বসে থাকবেন? এতক্ষণে ভাষণ শেষ করে চলে গেছেন।
তাই সস্তব। ওর তো আর আপনাদের মতন অগাধ সময়-মানে ইয়ে, ওর তো অনেক কাজ
অনামিকা মাল বার করে কপাল মুছতে মুছতে বলেন, সে তো নিশ্চয়।
ছেলেটা বলে, তবে আর কি, আপনাকে দিয়ে একটা প্রস্তাব তার কাছে পেশ করবার কথা ছিল তো–
ওঃ তাই বুঝি? কিসের প্রস্তাব?
ওই আর কি, জমি-টমির ব্যাপারে, শুনবেন গিয়ে। তাই ভাবছি আপনাকে নিয়ে গিয়ে ফেলতে না পারলে, নেপালদা আমাদের চামড়া ছাড়িয়ে নেবে।
অনামিকা এই মধুর ভাষার আঘাতে প্রায় চমকে উঠে বলেন, তোমাদের কী দোষ?
ওদের মধ্যে দ্বিতীয়জন উদাস গলায় বলে, সেকথা আর কে বুঝবে বলুন? বলবে তোমাদের তিনটের সময় পাঠিয়েছিলাম
তিনটের সময়? বল কী?
ওরা পরস্পরে মুখ-চাওয়াচাওয়ি করে বলে, ব্যাপারটা মানে উনি পাঠিয়েছিলেন পুলিনবাবুর বাড়িতে, পুলিনবাবু গাড়ি ছাড়লেন সাড়ে পাঁচটার সময়, তারপর আবার গরমে মাথা ঘুরে এ আবার শরবৎ খেতে নামলো। আর আপনার বাড়িটিও সোজা দূরে নয়!
অনামিকা আর কথা বললেন না, মৃদু হাসলেন। কার থেকে দূরে আর কার কাছাকাছি। হওয়া উচিত ছিল, সে প্রশ্ন করলেন না।
.
অবশেষে কোনো এক সময় পথ মুক্ত হলো, সামনের গাড়ি সরলো, গাড়ি নবীনগরের দিকে এগোলো।
ওরা যখন সভানেত্রীকে নিয়ে পৌঁছলো, তখন সমাপ্তি-সঙ্গীত গাওয়া হচ্ছে। সভানেত্রীর প্রতি আর কেউ বিশেষ দৃষ্টিপাত করলোনা, সম্পাদক মই থমথমে মুখে ওঁকে হলের পিছন দরজা দিয়ে নিয়ে মঞ্চে তুললেন একবার। ঘোষণা করলেন, অনিবার্য কারণে সভানেত্রী ঠিক সময়ে পৌঁছতে পারেননি, এখন এসে পৌঁছুলেন।
সেই অনিবাৰ্যটা যে কার তরফের, সেটা ব্যক্ত হলো না।
গান চলতে লাগলো।
হলের মালিকের লোক তাড়া দিচ্ছে, সভানেত্রীর ভাষণ হবার সময় নেই, তবু তিনি যে সত্যিই তিনি, এইটুকু জানাতে মাইকের সামনে এসে দাঁড়াতেই হলো।
তার আগে অনামিকা প্রশ্ন করলেন, মানে শুধু একটু কথা বলার জন্যই বললেন, প্রধান অতিথি এসেছিলেন?
সম্পাদক বেজার মুখে বললেন, না, জরুরী কাজে আটকা পড়ে গেছেন-ফোন করে জানালেন।
হল ছেড়ে দিতে হলেও, অনামিকা ছাড়ান পেলেন না। লাইব্রেরীর ঘরে গিয়ে বসতে হলো ওকে। চা-সন্দেশ না খাইয়ে তো ছাড়বে না! তাছাড়া লাইব্রেরীর জন্মপত্রিকা দেখান থেকে তার এই তেইশ বছরের জীবনের ইতিহাস সমস্ত শোনানোও তো দরকার। অনামিকার সঙ্গে পৌরপ্রধানের আলাপ হয়েছে, উনি যদি অর্থাৎ এতটা পেট্রল খরচ করে এনে কোনো কাজে লাগাতে না পারলে-
রাস্তায় বিঘ্নের কথা উঠলো।
স্থানীয় এক ভদ্রলোক উদাত্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন, ওদের দোষ কি বলুন? ওদের সামনে আশা নেই, ভরসা নেই, ভবিষ্যৎ নেই-বেকারত্বের যন্ত্রণায় সর্বদাই খুন চেপে আছে ওদের মাথায়–জানেন, বাংলা দেশে আজ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা কতো? চাকরি নেই একটা–
সাধারণতঃ এ ধরনের কথায় তর্ক করেন না অনামিকা, করা সাজেও না, এ কথার প্রতিবাদ করা মানেই তো সহানুভূতিহীন, অমানবিকতা, কিন্তু আজ বড় কষ্ট গেছে, বৃথা কষ্ট, তাই হঠাৎ বলে ফেললেন, খুন যে কার কখন চাপে, তার হিসেব কি রাখা যায়? চাকরি নেই বলে কি কিছুই করার নেই?
কী করবে?
উনি প্রায় ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, ব্যবসা? মূলধন দেবে কে?
অনামিকা তর্কেই নামলেন, কারণ ভদ্রলোকের ভঙ্গী দেখে মনে করা যেতে পারে, এই বিপুলসংখ্যক বেকারের জন্য অনামিকাও বুঝি অনেকাংশে দায়ী।
অনামিকা বললেন, কেউ কাউকে কিছু দেয় না, বুঝলেন? সে প্রত্যাশা করাই অন্যায়। নিজের জীবনের মূলধন নিজেই সংগ্রহ করতে হয়।
হয় বললেই হয়! ভদ্রলোক প্রায় খিঁচিয়েই ওঠেন, একটা যুক্তিগ্রাহ্য কথা বলুন!
অনামিকা গম্ভীর হেসে বলেন, আমার কাছে একটাই যুক্তিগ্রাহ্য কথা আছে, আমাদের এই বাংলা দেশে অবাংলা প্রদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ বেকার এসে হাজির হয়, বছরে কে কোটি টাকা উপার্জন করে, তারা সকলেই দেশ থেকে রাশি রাশি মূলধন নিয়ে আসে এ বিশ্বাস আমার নেই। অথচ তারা যে ওই টাকাটা লোটে এটা অস্বীকার করতে পারেন না। এই বাংলা দেশ থেকেই লোটে। কী করে হয় এটা?
ভদ্রলোক এক মুহূর্ত চুপ করে থাকেন, তারপর আবার পূর্ণোদ্যমে বলেন, ওদের কথা বাদ দিন। ওরা একবেলা ছাতু খেয়ে, একবেলা একটু লঙ্কার আচার দিয়ে আটার রুটি খেয়ে কাটিয়ে বেবসা-বেবসা করে বেড়াতে পারে। আমাদের ঘরের ছেলেরা তো আর তা পারবে না!
কিন্তু কেন পারবে না?
ভদ্রলোক তীব্রকণ্ঠে বলেন, এ আর আমি কি বলবো বলুন? বাঙালীর কালচার আলাদা, রুচি আলাদা, শিক্ষাদীক্ষা আলাদা
তবে আর কি করা! হাসলেন অনামিকা।
ঠিক এই সময় একটি ছেলে এসে বলে ওঠে, একটা লোক আপনাকে খুঁজছে।
আমাকে? চমকে উঠলেন অনামিকা, কী রকম ছেলে?
মানে আর কি এমনি। খুব কালো, একটু ইয়ে ক্লাসের মতো।
