গাড়ির খোলা জানলা দিয়ে বাতাসের বদলে আসছে মাটি থেকে উঠে আসা একটা চাপা উত্তাপ। যতক্ষণ গাড়ি থেমে থাকবে, এই অবস্থাই চলবে। উত্তাপ বাড়তেই থাকবে।
কিন্তু উপায় কি?
গাড়িকে পিছিয়ে নিয়ে অন্য রাস্তায় গিয়ে পড়বার কথাও এখন আর ভাবা যায় না। পিছনে কম করে অন্তত খান-তিরিশ গাড়ি তালখেজুরের মতো গায়ে গায়ে লেপটে দাঁড়িয়ে পড়ে আছে। ট্যাক্সি, প্রাইভেট কার, লরি, রিকশা, ঠ্যালাগাড়ি। তবু বাস-ট্রাম নয় এই ভালো।
এই অভিজ্ঞতা নতুন নয়।
বাড়ি থেকে একটু দূরপথে পাড়ি দিতে হলে, নিত্যই পথে দু’একবার ওরকম অজগরের মুখে পড়তেই হয়। থেমে যেতে হয়। ওদের পথ তো অবারিত রাখতেই হবে, ওরা তো আর শনের পথ ছেড়ে দিতে থেমে যাবে না!
লাল খুন জিনিসটা কি তা জানেন না অনামিকা। আজকের দিনের কত কিছুই জানেন না তিনি। জানেন ‘খুন’ শব্দটাই ভয়ঙ্কর একটা লালের ইশারাবাহী।
কোন্ খুনের বদলে এই লাল খুনের ঘোষণা, সেটা ধরতে পারা যাচ্ছে না, কারণ ওদের বাকি কথাগুলো দ্রুত, অস্পষ্ট।
গর্জিত সমুদ্রের ঢেউ থেকে জলের যে বলয়রেখা শ্রবণযন্ত্রের উপর আছড়ে বক্ষে ড়ে এসে পড়ছে তা হচ্ছে–’রক্ত চাই’ আর নিপাত যাও।
কিন্তু কে কোথায় নিপাত যাবার অভিশাপে জর্জরিত হচ্ছে, তা শোনবার গরজ কারো নেই। সত্যিই যদি তেমন কেউ রাতারাতি নিপাতিত হয়, আগামী সকালের কাগজেই তো দেখা যাবে। এখন যে যার গন্তব্যস্থানে যেতে পারছে না, সেটাই হচ্ছে সব চেয়ে বড় কথা।
আর বোধ করি এই তিরিশ-চল্লিশখানা গাড়ির মধ্যে অনামিকা দেবীর গাড়িখানা আটকে পড়ে থাকাই হচ্ছে সব চেয়ে ভয়ানক কথা।
সাড়ে ছ’টায় সভা শুরু হবার কথা, অথচ এখানেই সাড়ে ছ’টা বাজলো। এখন পাকা চারটি মাইল যেতে হবে।
একেই তো যে ভদ্রলোক তার গাড়িখানি ওদের জয়ন্তী উৎসবের জন্যে ঘণ্টা দুইয়ের জন্যেউৎসর্গ করেছেন, তিনিই দেরি করে ফেলেছেন পাঠাতে, তার উপর আবার যে ছেলে দুটি সভানেত্রীকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে বলে এসেছিল, তাদের মধ্যে একজনের গরমে মাথা ঘুরে গিয়েছিল বলে রাস্তায় নেমে কোকোকোলা খেতে দেরি হয়ে গিয়েছিল।
ভেবেছিল মেক আপ করে নেবে, হঠাং এই বিপত্তি।
যম জানে প্রধান কর্মকর্তা নেপালদা কী করছেন এখন। এতক্ষণ তো পৌঁছে যাবার কথা তাদের সভানেত্রীকে নিয়ে। কী আর করছেন? মাথার চুল ছিঁড়ছেন নিশ্চয়।
চীফ গেস্ট বলেছিলেন ঠিক সময়ে সভা শুরু করতে হবে, আর তার ভাষণটি দিয়েই চলে যেতে হবে তাকে। কারণ মাত্র পঁয়ত্রিশ মিনিট সময় তিনি এই সবুজ শোভা সংঘ’কে দিতে পারেন, তার পরই দু-দুটো সভা রয়েছে তাঁর।
পৌর প্রধানকে প্রধান অতিথি করতে চাইলে এ ছাড়া আর কি হবে? আর কি হতে পারে? তাঁকে যে সবাই চায়।
অবশ্য কেন যে চায়, তা তিনি ভালই জানেন, কিন্তু সে কথা তো প্রকাশ করা যায় না। তাকে তে কষল তিনি বলেই চায়, এটুকু শুনতেও ভালো বলতেও ভালো। তিনি বিনয়ে
ভেঙে পড়ে বলবেন, আমার মতো অযোগ্যকে কেন বলুন তো? আমি কবি নই, সাহিত্যিক নই-
ফাংশানটা হাওড়া নবীনগর সবুজ শোভা পাঠাগারের..পাঠাগারের বয়েসও নেহাৎ কম নয়। কিন্তু নিজস্ব একটি বাড়ি তাদের নেই, একটুকরো জমি মুফতে পেয়ে গেলে বাড়িটা হয়ে যায়। সেই না থাকার বেদনাটি মুছে ফেলতে যত্নবান হচ্ছে পাঠাগারে কর্মীরা। সেই যত্নের প্রধান সোপান পৌরপ্রধানের গলায় পুষ্পমাল্য অর্পণ।
তা সেই পৌরপ্রধান এসেই তো গেছেন নিশ্চয়। মনে হচ্ছে আর্টিস্টরাও এসে গেছেন কেউ কেউ। কারণ তাদেরও তো দু’দশ জায়গায় বায়না।
মাসটা কী দেখতে হবে তো?
বাংলা পঞ্জিকায় জ্যৈষ্ঠ মাস হলেও আসল ক্যালেণ্ডারে তো মে মাস! তার মানে রবীন্দ্র জয়ন্তীর মাস। আবার ওদিকে বাংলা হিসেবের সুবিধেয় নজরুল জয়ন্তীটাও পাওয়া যাচ্ছে। দুটো বড় বড় করণীয় ফাংশান যদি একটি আয়োজনের মধ্যে সামলে ফেলা যায়, কম সুবিধে?
উদ্যোক্তারা ওই সুবিধেটা লুফে নিচ্ছেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইয়ে আর নজরুলসঙ্গীত গাইয়ে, দু’দলকেই যোগাড় করে ফেলে একই খোঁয়াড়ে পুরে ফেলে কর্তব্যপালনের মহৎ আনন্দ অনুভব করছেন।
দুজনে কাছাকাছি তারিখে জন্মে সুবিধে করে দিয়েছেন ঢের। গাইয়ে দল দুটো লাগলেও, হল, প্যাণ্ডেল সভাপতি প্রধান অতিথি ফুলদানি ধূপদানি মাইক মঞ্চসজ্জা, এগুলো তো দু’ক্ষেপ লাগছে না? কম সুবিধে?
কিন্তু এ কী অসুবিধেয় ফেললো ওই শোভাযাত্রাকারীরা!
ছেলে দুটো গাড়িতে বসে হাত-পা আচড়াচ্ছে।
অনামিকা ঘামতে ঘামতে বলেন, কোনোরকমে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া যায় না?
পাগল হয়েছেন। সামনে পেছনে দেখুন না তাকিয়ে!
কিন্তু তোমরা তো বলেছিলে, মাত্র দু’ঘণ্টার জন্যে হলটা ভাড়া করেছ তোমরা, সাড়ে আটটার মধ্যে শেষ করতেই হবে, পরে ওখানে অন্য ফাংশান আছে, হল ছেড়ে দিতে হবে।
সে তো হবেই! দেরি করলে গলাধাক্কা দিয়ে বার করে দেবে!
আরে, কী যে বল? অনামিকা কষ্টের মধ্যেও হেসে ফেলেন।
ছেলে দুটো উদাস স্বরে বলে, আপনি জানেন না স্যার, সরি মাসিমা, ওরা কী ইয়ে লোক! সময় হয়ে গেলেই ফট করে আলোপাখা বন্ধ করে দেবে।
তাহলে তো দেখছি তোমাদের অনুষ্ঠান আজ আর হবেই না। এখানেই তো সওয়া-সাতটা বাজলো। ওদের দল তো দেখছি অফুরন্তু, আস্তে আস্তে হেঁটে আসছে। ওরা চলে যাবে, তারপর সামনের ওই গাড়িগুলো পার হবে–তারপর আরো তিন-চার মাইল
