শম্পা উঠে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলে, দ্যাখো, আর একবার যদি ও কথা উচ্চারণ করো, ঠেলে ওই জলের মধ্যে ফেলে দেবো। কেউ রক্ষে করতে আসবে না। যা শুনলেই মাথার মধ্যে আগুন জ্বলে যায়, কেবল সেই কথা। পিসিকে যে চিঠিটা দেব, তার উত্তর আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করব, তারপর সোজা গিয়ে উঠবে তোমার মেসে, এই হচ্ছে আমার শেষ কথা। রেজিস্ট্রিটা একবার হলে হয়, তারপর দেখো কী দুর্গতি করি আমি তোমার।
সত্যবান হঠাৎ একটু ঘুরে দাঁড়িয়ে ওর কাঁধের ওপর একটা হাত রেখে বলে, আমার কিন্তু কী মনে হচ্ছে জানো? এত সুখ বোধ হয় সইবে না আমার কপালে। মনে হচ্ছে এই বুঝি শেষ, আর বোধ হয় কখনো আমরা দুজনে একসঙ্গে বসে কথা বলবো না।
বেপরোয়া শম্পার সাহসী বুকটাও হঠাৎ যেন কেঁপে ওঠে, ওরও যেন মনে হয় সত্যিই বুঝি তাই। কিন্তু মুখে হারে না ও, বলে ওঠে, হাতফসকে পালাবার তালে যা ইচ্ছে বানিয়ে বলো না, আমার কিছু এসে যাচ্ছে না। আমি পিসিকে হুকুম করেছি–অবিলম্বে আমাদের জন্যে একটা ক্ষুদ্র ফ্ল্যাট ঠিক করে রাখতে, আমার জন্যে একটা চাকরি যোগাড় করে রাখতে, আর আমাদের বিয়ের সাক্ষী হতে। ব্যাস!
সত্যবান হেসে ফেলে বলে, সাক্ষী হওয়াটা না হয় হলো। কিন্তু বাকি দুটো? সে দুটো তো গাছের ফল নয় যে ছিঁড়ে এনে তোমার হাতে তুলে দেবেন।
গাছের ফল নয় বলেই তো পিসিকে ভার দিচ্ছি। গাছের ফল হলে তো যে কোনো বন্ধুবান্ধবকেই বলতে পারতাম।
বেশ বাবা, তোমার ব্যাপার তুমিই বুঝবে। আমার ওপর হুকুম হয়েছে করবো।
ঠিক আছে। এসো মা গঙ্গাকে নমস্কার করো।
হাত জোড় করে শম্পা।
সত্যবানও অগত্যা।
তারপর দুজনেই নেমে আসে সেই ভগ্নদশাগ্রস্ত মন্দিরচত্বর থেকে।
কিছুক্ষণ অখণ্ড নিস্তব্ধতার মধ্যে যেন হারিয়ে যায় ওরা। শুধু ওদের পায়ের চাপে গুঁড়িয়ে পড়া শুকনো পাতার মৃদু আর্তনাদ ধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
হঠাৎ একসময় সত্যবান বলে ওঠে, আমার ধারণা ছিল না তুমি এসব মানোটানো
শম্পা যেন অন্য জগতের কোথাও চলে গিয়েছিল, ওর কথায় চমকে উঠে বলে, কী সব?
এই মা গঙ্গা-টঙ্গা, নমস্কার-টমস্কার–
আমারই কি ধারণা ছিল ছাই। শম্পা কেমন একরকম হেসে বলে, নিজের থেকে অচেনা আর কেউ নেই।
খানিকক্ষণ নিস্তব্ধতায় কাটে, আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকে ওরা, একসময় শম্পা বলে ওঠে, বিয়ের পর আবার এখানে আসবো আমরা। সেজপিসির কাছে।
সত্যবান কোনো উত্তর দেয় না।
বিয়েটাই সত্যি হবে, এমন কথা নিশ্চয় করে যেন ভাবতেই পারছে না ও, সামনেটা তাকালেই কেমন ঝাপসা ঝাপসা লাগে। এই যে সুন্দরী সুকুমারী বিদুষী আধুনিকা নারীটি এখন তার পাশে পাশে চলেছে, সত্যিই কি সে চিরজীবন তার পাশে পাশে থাকবে? একসঙ্গে চলবে পায়ে পা মিলিয়ে?
ভাবতে গেলেই ভয়ানক একটা অবিশ্বাস্য অবাস্তবতার অন্ধকারে তলিয়ে যায় ভাবনাটা।
.
কিন্তু আরো একটা অন্ধকার গহ্বর যে অপেক্ষা করছিল সত্যবান নামের ছেলেটার জন্যে, তা কি জানতো ছেলেটা?
কলকাতায় ফিরে দেখলে যে আগুন অনেক দিন থেকে ভিতরে ভিতরে ধোয়াচ্ছিল, সে আগুন জ্বলে উঠেছে। ফ্যাক্টরীতে লক আউট, মালিকপক্ষ অনমনীয়। ওদিকে ইউনিয়নের পাতারাও ততোধিক অনমনীয়, অতএব আকাশ-ফাটানো চিৎকারে গলাফাটানো চলছে। ফ্যাক্টরীকে ঘিরে, সকাল সন্ধ্যে দুপুর।
সেই এক ধ্বনি, চলবে না, চলবে না।
সত্যবান দেখলো, ওকে দেখে ওর সহকর্মীরা মুখ বাকালো। শুধু ওর বন্ধু কানাই পাল বলে উঠলো, এতদিন কোথায় ঘাপটি মেরে ছিলে চাদু!
সত্যবান শুকনো গলায় বলে, ঘাপটি মারা আবার কি! অসুখ করেছিল।
অসুখ! আহা রে, লা লা চুক চুক! আর আমরা সবাই এখানে সুখের সমুদুরে ভাসছিলাম!
অবস্থা তো বেশ ঘোরালো দেখছি!
আরো কত দেখবি দাদু!
ফালতু কতকগুলো কথা হলো, তারপর ভাবতে ভাবতে চললো সত্যবান দাস, কেমন করে বাংলা সাহিত্যের সেই বিখ্যাত লেখিকা অনামিকা দেবীর সঙ্গে দেখা করা যায়।
মনটা বিষণ্ন লাগছে।
কানাই পালের গলায় যেন আগেকার সেই অন্তরঙ্গতার সুর শুনতে পেল না সত্যবান। এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির মাঝখানে তার জায়গাটা যেন হারিয়ে গেছে।
আশ্চর্য, এই রকমই কি হয় তাহলে?
হৃদয়ভূমির দখলী স্বত্বটুকু বজায় রাখতেও নিয়মিত খাজনা দিয়ে চলতে হয়?
তাহলে অনামিকা দেবীর সেই ভাইঝিটির হৃদয় থেকে
কিন্তু সত্যবানের মতো এমন একটা তুচ্ছ অকিঞ্চিৎকর হতভাগার জন্যে কি সত্যিই সেই অলৌকিক আশ্চর্য হৃদয়ে জমির বন্দোবস্ত হয়েছে?
রক্তের বদলে রক্ত চাই।
খুনের বদলে লাল খুন!
জুলুমবাজি বন্ধ করো
নিপাত যাও, নিপাত যাও?
গাড়িটা মোড় ঘুরতেই হঠাৎ যেন সমুদ্র গর্জে উঠলো। থেমে পড়লো গাড়ি।
রাস্তার এক ধার থেকে অন্য ধারে যাচ্ছে ওরা, একবার দম ফেলতে-না-ফেলতে আবার গর্জন করে উঠছে।
থেমেই থাকতে হলে গাড়িটাকে। কারণ ইতিমধ্যে সামনে গাড়ির এক বিরাট লাইন হয়ে গেছে।
যতক্ষণ না ওদের দীর্ঘ অজগর দেহ পথের শেষবাকে মিলিয়ে যাবে, ততক্ষণ অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
জ্যৈষ্ঠ মাসের বিকেল, আকাশ সারাদিন অগ্নিবৃষ্টি করেছে, পৃথিবী এখনো সেই দাহর জ্বালা ভিতরে নিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ছে। আকাশ হঠাৎ এখন গুম হয়ে গেছে।
নিশ্চল গাড়ির মধ্যে গরমে দম বন্ধ হয়ে আসছে। নিরুপায় হয়ে তাকিয়ে আছেন অনামিকা ওই দীর্ঘ অজগর দেহটার ডিস্ক।
