ভালো, খুব ভালো একাই যাওয়ার সঙ্কল স্থির তাহলে?
তাছাড়া যে আর কী হতে পারে বুঝছি না তো!
তুমি কোনদিনই কিছু বুঝবে না। যা বুঝছি চিরটাকাল সব কিছু আমাকেই বুঝতে হবে। যেমন আমার কপালের গেরো। নিজের হাতে নিজে বিষ খেয়ে মরেছি!
‘শম্পা!’ সত্যবান গম্ভীর গলায় বলে, এই যা বললে, এটাই ঠিক। সমস্তক্ষণ ঠিক ওই কথাই ভাবছি আমি। ঝোঁকের মাথায় আমার সঙ্গে ঝুলে পড়া তোমার পক্ষে বিষ খাওয়ারই শামিল।
শম্পা হাতের বাদামের খোলাগুলো গঙ্গায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গভীরতর গম্ভীর গলায় বলে, উপায় কি? অবস্থাটা তো ওইরকম। ওই খোলাগুলোকে আর তুলে আনতে পারবে?
ওটা তো তুলনা মাত্তর।
কোনটা কি সে বোধ থাকলে তো? যাক ঠিক আছে, যা করবার আমিই করবো। নিজের ব্যবস্থা নিজেকেই করে নিতে হবে। বেশ, এখন আমি তোমার সঙ্গে যাচ্ছি না, তুমি দেখ গে গিয়ে তোমার সেই মহামূল্য চাকরিটি আছে কিনা, তারপর দেখা যাক, আমার বি. এ. পাসের ডিগ্রীটা কোনো কাজে লাগানো যায় না। কিন্তু সেটা পরের কথা। এখন কলকাতায় গিয়ে একটা কাজ তোমায় করাতে হবে। আমি একটা চিঠি লিখে রাখবো, সেটা নিয়ে পিসির হাতে পৌঁছে দিয়ে বলবে
বাঃ, তুমি যে বলেছিলে তোমাদের বাড়ার ছায়া অবধি যেন আমি কখনো না মারাই
সে হুকুম এখনো বলবৎ! বাড়ির বাইরে কোথাও দেখা করে– মানে হরদমই তো বাইরে বেরোতে হয় পিসিকে, তেমনি কোনোখানে–
সত্যবান হাতের খোসাগুলো ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে ফেলে বলে ওঠে, বাঃ, সেটা কী করে সম্ভব হবে? তিনি কখনো আমায় দেখেননি, আমিও কখনো তাকে দেখিনি, চিনবো কেমন করে?
তিনি তোমায় দেখেননি কখনো, এটা ঠিক–, শম্পা প্রবলভাবে মাথা ঝাঁকায়, তুমি এমন একটা দ্রষ্টব্য বস্তু নও যে দেশশুদ্ধ লোক তোমায় দেখে বসে আছে। কিন্তু আমার পিসি? রাতদিন কাগজে ছবি বেরোচ্ছে! নাকি তাও দেখোনি কোনোদিন?
আস্তে আস্তে বেলা পড়ে আসছিল, গঙ্গার অপর পারে নেমে আসছে ছায়া, সত্যবানই সেই দিকে তাকিয়ে আস্তে বলে, জানোই তো আমি কাঠখোট্টা কুলীমজুর মানুষ, সাহিত্য-টাহিত্যর কী খবর জানবো? কম বয়সে যা কিছু পড়েছি-টড়েছি, তারপর আর কি? উচ্চ শিক্ষার উচ্চ আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে পেটের ধান্ধায় ঘুরছি। তবে হ্যাঁ, এখন ওই আকাশটার দিকে তাকিয়ে, কতকাল আগে পড়া সেই একটা পদ্য মনে পড়ছিল–মেঘের পরে মেঘ জমেছে রঙের পর রঙ, মন্দিরেতে কাসরঘণ্টা বাজলো ঢং ঢং। দেখ তাকিয়ে, ঠিক সেই রকমই কিনা? চারিদিকে মন্দিরে-ঐন্দিরে আরতি শুরু হয়ে গেছে কাসরঘণ্টা বাজছে, আর রঙ-টঙ তো–তুমিই ভাল বুঝবে। সত্যবান মৃদু হেসে কথা শেষ করে।
শম্পাও ওর কথা শুনে তাকিয়ে দেখে, শম্পার মুখটা এই পড়ন্ত বেলার আলোয় ঝকঝকে দেখায়। শম্পা সেই ঝকঝকে মুখটা সত্যবানের দিকে ফিরিয়ে বলে, তুমিও কিছু কম বোঝো না। বেলাশেষের আকাশ দেখে যখন রবীন্দ্রনাথের কবিতা মনে পড়ে যায় তোমার। এই আকাশকে আবার একসময় উনি চিতার সঙ্গেও তুলনা করেছেন, ওই যেথা জ্বলে সন্ধ্যার তুলে দিনের চিতা! পড়েছ?
কি জানি, মনে পড়ছে না।
না পড়ুক, পরে তোমায় সব পড়াবো। রবীন্দ্রনাথ না পড়লে–আচ্ছা পরের কথা পরে হবে, এখন তুমি আমার ঠাকুর্দার সেই বাড়িটির বাইরে কোথাও ঠাকুর্দার কন্যের সঙ্গে দেখা করবো করে চিঠিখানা দিয়ে বলবে, শম্পা বলে দিয়েছে, আপনি যে ওর খবর পেলেন এটা যেন কাউকে জানিয়ে ফেলবেন না।
ঠিক আছে। কিন্তু উনি যদি জিজ্ঞেস করেন, তুমি কে হে বাপু? তখন?
তখন? শম্পা হেসে উঠে বলে, তখন বোলো “আমি জাম্বুবান”! তাহলেই পরিচয় পেয়ে যাবেন।
ওঃ, এই নামেই আমার পরিচয় দিয়ে রেখেছে তাহলে?
তবে আবার কী? যার যা পরিচয়। শুনে অবশ্য পিসি বলেছিল, একটি জাম্বুবান ছাড়া আর কিছু জুটলো না তোর ভাগ্যে? তা আমি বললাম, জাম্বুবানদের ঘাড়টা খুব শক্ত হয়, তাই পর্বতের চূড়োটি চাপাতে ওটাই সুবিধে মনে হলো!
ভালই বলেছে। এখন দেখবো তোমার হুকুম পালন করে উঠতে পারি কিনা।
পারবে না মানে? তোমার ঘাড় পারবে।
আহা বুঝছে না, ওনারা হলেন হাই সার্কেলের মানুষ, বাড়ির বাইরে মানে তোমার গিয়ে মিটিঙে-টিটিঙে তো–সেখানে আমায় ওঁর কাছ পর্যন্ত পৌঁছতে দেবে কি? হয়তো আর্জি করলে বাইরে থেকেই খেদিয়ে দেবে।
আহা রে মরে যাই! খেদিয়ে দিলেই তুমি অমনি সখেদে ফিরে আসবে! ছলে বলে কৌশলে যেভাবেই হোক কার্যোদ্ধার করতে হয়, এটা হচ্ছে মহাভারতের শিক্ষা।
ঠিক আছে।..দ্যাখো একেবারে অন্ধকার হয়ে গেল।
গেল তার কি?
আর এখানে বসে থাকা উচিত নয়, সাপটাপ আসতে পারে।
তবে ওঠো–, শম্পা ঝঙ্কার দিয়ে বলে ওঠে, কপাল আমার যে, এই হতচ্ছাড়া লোকের সঙ্গে প্রেম করতে বসেছি আমি! এমন গঙ্গার ধার, এমন নির্জন জায়গা, এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আর তুমি কিনা সাপের চিন্তা করতে বসলে!
কী করবো বল? ওটাই চিন্তায় এসে গেল যে?
রাবিশ! যদি বা বাদামভাজার লোভটাভ দেখিয়ে ভুলিয়ে-ভালিয়ে এনে ফেললাম, তারপর কিনা শূন্যি।
অন্ধকার গম্ভীর হয়ে আসছিল, পরস্পরের মুখ দেখা যাচ্ছিল না, সত্যবানের গলাটাই শুধু অন্ধকারের মধ্যে গাঢ় হয়ে বেজে উঠলো, আমার সঙ্গে গাঁথলে তোমার সারা ভবিষ্যৎটাই তাই হবে শম্পা, ওই শূন্যি। দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি সেটা। তাই কেবলই তোমায় খোশামোদ করছি শম্পা, তুমি কেটে পড়ো। আমার মতো হতভাগার সঙ্গে নিজের অদৃষ্টকে জড়িও না।
