তোমার অবশ্য হাড়টা একটু সহজেই জ্বলে! বলে হাসলো সত্যবান।
শম্পা এ কথায় পুরোপুরিই দপ করে জ্বলে উঠলো, সহজে মানে? চল্লিশ মিনিট ধরে খুঁজে মরছি না একটু বসে পড়বার মতন জায়গা? পাচ্ছিলাম? উঃ, পৃথিবীতে এত লোক কেন বলতে পারো? অসহ্য!
চমৎকার! পৃথিবীতে তুমি ছাড়া আর লোক থাকবে না? বললে সত্যবান।
ওর থেকে সাজিয়ে-গুছিয়ে উচ্চাঙ্গের ভাষা দিয়ে কথা বলার ক্ষমতা ওর নেই তাই ওইটুকুই বলল। শম্পার বান্ধবীদের দাদারা বলে, এইটুকু প্রসঙ্গর উপর নির্ভর করেই অনেক কায়দার ভাষা আমদানি করে রীতিমত জমিয়ে ফেলতে পারতো। যা দেখতে দেখতে আর শুনতে শুনতে এত বড়োটি হয়েছে শম্পা। কিন্তু অনেক প্রেমে পড়ার পর আপাতত শম্পা এমন এক প্রেমের মধ্যে পড়ে বসে আছে, যে প্রেমের নায়ক একটা কারখানার কুলি বললেই হয়।
অতএব সে শুধু কথা কইতে পারে, কথা রচনা করতে জানে না।
তাই সে শুধু বলে ওঠে, বাঃ চমৎকার, তুমি ছাড়া আর লোক থাকবে না পৃথিবীতে?
শম্পা নিজের ভঙ্গীতে কাল, থাকবে না কেন, সম্ভবমতো থাকবে। এমন নারকীয় রকম বেশী লোক থাকবে কেন? এত লোক থাকা একরকম অশ্লীলতা।
অশ্লীলতা!
তাছাড়া আবার কি? দুটো মানুষে দুদণ্ডের জন্যে স্বস্তি করে একটু বসতে চাইলে ঘরে খিল বন্ধ করা ছাড়া গতি নেই, এটা অশ্লীলতা ছাড়া আর কী? বীভৎস বিশ্রী অশ্লীল!
অন্যরাও আমাদের দেখে এই কথাই ভাবে।
শুধু ভাবে নয়, বলেও। শম্পা বিরক্ত-তিক্ত হাসির সঙ্গে বলে শুনলে না তখন? সেই বুড়ী দুটো মন্তব্য করলো? উঃ, নেহাৎ তুমি প্রায় আমার মুখ চেপে ধরলে তাই উচিত জবাব দিয়ে আসতে পেলাম না, নইলে শিক্ষা দিয়ে দিতাম।
আহা বুড়ী দুটো নিশ্চয় তোমার ঠাকুমা-টাকুমার বয়সী।
হতে পারে। তাই বলে যা ইচ্ছে বলবার কোনো রাইট থাকতে পারে না। দু’দশদিন আগে জন্মেছে বলে মাথা কিনেছে নাকি? বলে কিনা, কী পাপ। কী পাপ! গঙ্গাতীরে বসে একটু জপ করবারও জো নেই! সর্বত্ত ছোড়া-ছুড়ির কেত্তন। এ দুটো আবার কোন্ চুলো থেকে এসে জুটলো?
সব কথা তুমি শুনতে পেয়েছিলে?
পাবো না মানে? আমাদের কান বাঁচিয়ে বলেছিল নাকি? বরং যাতে কানে ভালো করে প্রবেশ করে তার চেষ্টা ছিল।
আমি কিন্তু অতো সব কিছু শুনতে পাইনি।
তোমার কথা ছাড়া। মাথায় ঘিলু বলে কিছু থাকলে তো?
এটুকুর জন্যে ঘিলুর কোনো দরকার হয় নাকি?
হয় না তো কি! ঘিলু কম থাকলেই শ্রবণশক্তি কম হয়, বুঝলে?
বুঝলাম। সত্যবান হেসে ফেলে বলে, কিন্তু পরে আর এক বুড়ির মন্তব্য বোধ হয় তুমি শুনতে পাওনি। শুনলে নির্ঘাত তার ঘাড়ের মাংসে কামড় বসাতে।
বটে বটে, বটে নাকি?
সম্পা প্রায় লাঠির মতো সোজা হয়ে ওঠে, শুনি কথাটা?
শুনলে ক্ষেপে যাবে।
যাই যাব, বল তো শুনি। কথাটা আমার পক্ষে খুব আহ্লাদের নয়।
শম্পার প্রকৃতিতে ধৈর্যর বালাই নেই, তাই শম্পা ঝেঁজে ঝেকে ওঠে, তোমার পক্ষে আহ্লাদের না হলে, আমার পক্ষেও কিছু আহ্লাদের নয়, তবু শোনাই যাক।
শুনে লাভ কিছু নেই। ওদিকের ঘাটে সিঁড়ির কোণায় যে একটি সিঁদুর-টিদুর পরা বুড়ী বসেছিলেন, আমরা ওখানটায় ঢঁ মেরে সরে আসতেই বলে উঠলেন, আহা মরে যাই, বাছার পছন্দকে বলিহারি! একটা কাফ্রী ছোড়াকে জুটিয়ে–
সত্যবান হেসে উঠে বলে, শেষটা আর শুনতে পেলাম না।
শম্পা কড়া গলায় বলে, সেই বুড়ীকে আবার তুমি বসেছিলেন বলেছিলেন করে মান্য দিয়ে কথা বলছে? বুড়ীটা বলতে পারো না?
বলে লাভ? তেনার কানে তো পৌঁছচ্ছে না!
না পৌঁছক-শম্পা হাতের কাছ থেকে ঘাসের চাপড়া উপড়ে নিয়ে সেটাকে কুচি কুচি করতে করতে বলে, বুড়ীগুলো আমার দু’চক্ষের বিষ। একটু সভ্য করে কথা বলতেও জানে না। কেন “মেয়ে” বললে কী হয়? কী হয় “ছেলে” বললে? তা নয়-ছোঁড়াছুঁড়ি! শুনলে মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে!
ওদেরও আমরা বুড়ী বলছি। কেন মহিলা-টহিলা বললে কী হয়?
দায় পড়েছে মহিলা বলতে! ওরকম অসভ্যদের আমি বুড়ীই বলব।
ওঁরাও তোমাকে ছুড়ীই বলবেন। বলবেন, ছুঁড়ী একটা কাফ্রী ছোঁড়াকে জুটিয়ে
থাক থাক থামো। বাদাম খাও।
ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে এক ঠোঙা চিনেবাদাম বার করে ফেলে শম্পা। সত্যবানের হাতে কয়েকটা দিয়ে নিজে একটা ছাড়াতে ছাড়াতে বিরক্ত গলায় বলে, যখন কিনলাম এত গরম হাতে নেওয়া যাচ্ছিল না, আর জায়গা খুঁজতে খুঁজতে ঠাণ্ডাই হয়ে গেল।
অতএব বোঝা গেল এতক্ষণ ধরে মনের মতো জায়গা খুঁজে বেড়াবার কারণটা কি। মাত্র ওই বাদামের ঠোঙাটির সদ্ব্যবহার করা। যদিও সত্যবান বলেছিল, ধ্যেৎ এইমাত্র পিসির কাছ থেকে পেটটা পুরো ভর্তি করে বেরিয়ে এলাম, আবার এখন চিনেবাদাম কী?
কী তা তুমি বুঝবে না বুদ্ধ! বাদাম ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে খাওয়া আর খোলা ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলার মধ্যেই তো সমস্ত কিছু! ওটাই প্রেমের মাধ্যম!
তা হবে। সত্যবান হেসে উঠে বলে, তুমি অনেক-অনেকবার প্রেমে পড়েছে, তুমিই ভালো জানো।
তা সত্যি। তুমি যে একেবারে “র” মাল। বেচারা!
শম্পা ওর দিকে আর কয়েকটা বাদাম এগিয়ে দিয়ে বলে, আচ্ছা এইবার বলো তোমার কথা। সকাল থেকে তো শোনাচ্ছো একটা কথা আছে–
কথাটা অবশ্য নতুন কিছু নয়, যা বলছি প্রথম দিন থেকে। কাল আমি চলে যাই
শম্পা গম্ভীরভাবে বলে, বেশ। তারপর?
তারপর আবার কি? যেমন কাজ-টাজ করছিলাম—
