এই সেরেছে–, শম্পা মা-কালীর মতো জিভ কাটে, একদম ভুলে মেরে দিয়েছি। জাম্বুবানটা বলছিল দারুণ খিদে পেয়েছে
এই দ্যাখো! আর তুই সে-কথা ভুলে মেরে দিয়ে পিসির চিঠি-রহস্য ভেদ করতে বসলি? চল্ চল্।
পারুল তাড়াতাড়ি কলম রেখে উঠে পড়ে।
পারুলের আত্মমগ্ন নিস্তরঙ্গ জীবনে এই মেয়েটা একটা উৎপাত, এই ছেলেমেয়ে দুটো একটা ভার, তবু পারুলের বিরক্তি আসে না কেন?
পারুলের ছেলেরা দেখলে কী বলতো?
ও বলছিলো কালই চলে যাবে–, শম্পা পিছু পিছু যেতে যেতে বলে, বলছে তোমার পিসির ঘাড়ে আর কতদিন থাকবো? আচ্ছা পিসি, এক্ষুণি ওকে একা ছাড়া যায়?
‘পাগল!’ পারুল উড়িয়ে দেওয়ার সুরে বলে, মাথা খারাপ?
তবে? তুমি এতো বুদ্ধিমতী, তুমিও যখন বলছে
আমি যেতে দিলে তো?
বাচলাম বাবা! শম্পা ছেলেমানুষের মতো আবার বলে ওঠে, কিন্তু বলো না গো পিসি, চিঠিটা তোমার ভাই-টাইকে লিখছো না তো?
পারুল সহসা গম্ভীর গলায় বলে, আমায় তুই সেই রকম বিশ্বাসঘাতক ভাবিস?
শম্পা ফট করে নিভে যায়। আস্তে বলে, না তা নয়, তারাও তো ভাবছেন-টাবছেন নিশ্চয়, সেই ভেবে যদি তুমি
নাঃ, আমি ওসব ভাবাটাবার ধার ধারি না, নিজে যা ভাবি তাই করি।
ইস পিসি! আমার মতন মনের জোর যদি আমার হতো। পারুল টোস্ট তাতাতে তাতাতে বলে, তোর মনের জোর আমার থেকেও বেশী।
শম্পা একটু চুপ করে থেকে নেভানেভা গলায় বলে, আগে তাই ভাবতাম, কিন্তু দেখছি–
কী দেখছিস?
দেখছি মন-কেমন-টেমন ব্যাপারটাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পিসির জন্যে এক-এক সময় এতো ইয়ে হয়। তখন নিজেকে ভীরু স্বার্থপর মনে হয়।
মানুষ মাত্রেই স্বার্থপর রে শম্পা, কেউ বুঝে-সুঝে, কেউ না বুঝেই। এই যে লোকে স্বার্থত্যাগী বলতে উদাহরণ দেয় সন্ন্যাসীদের, স্বার্থত্যাগী সন্ন্যাসী আসলে কি সত্যিই তাই? আমার তো মনে হয় ওনারাই সব থেকে স্বার্থপর
ধ্যাৎ?
ধ্যাৎ কি, সত্যি। অন্যের মুখ না চেয়ে, নিজের যেটি ভালো লাগছে, সেইটি করাই স্বার্থপরতা। কৃচ্ছসাধনে তার সুখ, তাই কৃচ্ছসাধন করছে। সংসারবন্ধন থেকে পালিয়ে প্রাণ বাচানোয় তার সুখ, তাই পালাচ্ছে। এতে নিঃস্বার্থতা কোথায়?
এই মরেছে! তুমি যে আমায় বসিয়ে দিলে গো।
চোখ খুলে যদি তাকাস পৃথিবীতে, দেখবি হরঘড়িই বসে পড়তে হবে।
তাই তো দেখছি। শম্পা অন্যমনষ্কের মতো বলে, আচ্ছা পিসি, আমি যেন কী বলতে এসেছিলাম তোমায়?
পারুক হেলে ফেলে, যা বলতে এসেছিলি তা তো এই প্লেটে সাজানো হচ্ছে।
ওহো-হো। দাও দাও। হায় রে, এতোক্ষণে ঘরবাড়িই খেয়ে ফেললো। দাও।
আমিই যাচ্ছি চল।
তুমি? হতভাগা ওতে আবার লজ্জা পায়!
পারুল মৃদু হেসে বলে, কেন, লজ্জা কিসের? মা-পিসিরা খেতে-টেতে দেয় না?
পিসি!
শম্পার গলাটা হঠাৎ বুজে আসে, আস্তে আস্তে বলে, তোমার বোনেরা, তোমাদের ভাইরা একেবারে দু’রকম!
তা সবাই কি এক রকম হয়? তুই তোর ভাইবোনদের মতো?
তা নয় কট। তবু, শম্পা একটু থেমে বলে, আচ্ছা পিসি, লোকেদের যদি ছেলেমেয়ে বিয়ে যায়, তারা কাগজে-টাগজে বিজ্ঞাপন দেয় তো?
পারুল ওর মুখের দিকে একটু তাকিয়ে দেখে, তারপর হালকা গলায় বলে, তা দেয়-টেয় তো দেখি।
কিন্তু শম্পার গলাটা যেন আরো ভারী-ভারী লাগে, আর যদি রাগ-ঝগড়া করে চলে যায়, এও তো লেখে, অমুক তুমি কোথায় আছে জানাও, আমরা অনুতপ্ত।
পারুল হেসে ফেলে, সেটা ছেলেকে বলে, মেয়েকে নয়!
ওঃ! কিন্তু কেন বল তো? মা-বাপের স্নেহটাও কি দু’তরফের জন্যে দু’রকম?
হয়তো তাই-ই–, পারুল অন্যমনা গলায় বলে, হয়তো তা নয়। কিন্তু মেয়ে হারিয়ে যাওয়ার খবর ঘোষণা করলে লোকলজ্জা যে! মেয়েদের হারিয়ে যাওয়ার একটাই মানে আছে কিনা–থাক ওসব কথা, ছেলেটার ক্ষিদে পেয়েছিল–
পারুল খাবারের থালা হাতে নিয়ে হালকা পায়ে দ্রুত নেমে যায়।
শম্পাও নামে। আস্তে আস্তে। শম্পার এই ভঙ্গীটা একেবারে অপরিচিত।
পঙ্গার একেবারে কিনারা ঘেষে একটা ভাঙা শিবমন্দির তার বিদীর্ণ-দেহ আর হেলে-পড়া মাথা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কালের স্বাক্ষর বহন করে। কতকাল আছে কে জানে! স্থানীয় অতি বৃদ্ধ ব্যক্তিরাও বলেন, শৈশবকাল থেকেই তাঁরা মন্দিরটার এই চেহারাই দেখে আসছেন, এমনি পরিত্যক্ত, এমনি অশ্বথ গাছ গজানো।
এদিকে কেউ বড় একটা আসে না। কারণ এ ধরনের পরিত্যক্ত মন্দিরের ধারেকাছে সাপখোপ থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
ডানপিটে ছেলেরা অবশ্য সাপের ভয় বাঘের ভয় কিছুই কেয়ার করে না, কিন্তু কাছাকাছির মধ্যে তেমন আকর্ষণীয় কোনো ফুলফলের গাছ নেই যা তাদের টেনে আনতে পারে। অতএব জায়গাটা নির্জন।
ওরা বিকেল থেকে একটু নির্জন ঠাঁই খুঁজে খুঁজে প্রায় হতাশ হবার মুখে হঠাৎ এই জায়গাটা আবিষ্কার করে ফেলে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো, যাক-এতক্ষণে পাওয়া গেল।
মন্দিরের পিছনের চাতালটা প্রায় গঙ্গার উপর ঝুলন্ত অবস্থায় বিরাজমান। তার সিমেন্টচটা সুরকি-ওঠা অঙ্গের মাঝখানে মাঝখানে খানিকটা খানিকটা অংশে পুরনো পালিশের কিছুটা চিহ্ন যেন যাই-যাই করেও দাঁড়িয়ে আছে। তেমনি একটুকরো জায়গা রুমাল দিয়ে ঝেড়ে নিয়ে বসে পড়লো ওরা।
শম্পা আর সত্যবান।
পড়ন্ত বেলায় গঙ্গার শোভা অপূর্ব, তার উপর এ জায়গায় তো প্রায় গঙ্গার ওপরেই। শম্পা বিগলিত কণ্ঠে বলে, মার্ভেলাস। তারপর দম নিয়ে বললো, এতক্ষণ জায়গা না পেয়ে রাগে হাড় জ্বলে যাচ্ছিলো বটে, এখন দেখছি ভালই হয়েছে।
