না।
না! না মানে?
না মানে-স্পট পরিষ্কার না। জ্বরফর ছেড়ে গেছে। তবু এখনো ওই বিচ্ছিরি জিনিসটা নিয়ে তাড়া করতে আসছ কেন শুনতে চাই।
আশ্চর্য! তোমার মতন বেহায়া তো আর দেখিনি! দু’দুবার পাল্টে পড়েছ কিনা!
দুবার পড়েছি বলেই যে বরাবরই পড়ব তার মানে নেই! আমি বেশ সুস্থবোধ করছি, কাল চলে যাবো।
শম্পা গভীরভাবে বলে, খুব ভালো কথা, তা বাসাটা যোগাড় হয়ে গেছে?
বাসা? বাঃ, সেটা আবার কখন করলাম?
তাহলে? কালই যাচ্ছ–
কী আশ্চর্য! আমার ঘরটা কি চলে গেছে নাকি? এ মাসের পুরো ভাড়া দেওয়া আছে।
ওঃ, তাহলে তো ভালোই, শম্পা যেন ভারী আশ্বস্ত হয়ে গেল এইভাবে বলে, মেসের মধ্যে মহিলা থাকায় আপত্তি করবে না তো তোমার ম্যানেজার?
‘মহিলা!’ সত্যবান আকাশ থেকে পড়ে, তুমিও যাবে নাকি?
শম্পাও আরো ও আকাশ থেকে পড়ে, ওমা! যাব না কোথায় থাকবো?
সত্যবান অবশ্যই বিপন্ন বিব্রত।
সত্যবান তাই সামলানোর গলায় বলে, আহা এখন কটা দিন তো এখানেই থাকতে পারো, তারপর
কী-তারপর?
তারপর বাসা-টাসা ঠিক করে—
শম্পা জোরে জোরে বলে, ওঃ, ওই আশায় বসে থাকবো আমি? তাহলেই হয়েছে। তোমার ভরসায় বসে থাকলে, রাধাও নাচবে না, সাত মণ তেলও পুড়বে না।
আমার উপর যখন এতই অবিশ্বাস, তখন আর আমাকে জ্বালাচ্ছো কেন? সত্যবান বলে ওঠে, কেটে পড়ো না বাবা!
তা তো বটেই, তাহলে তো বেঁচে যাও। কিন্তু সে বাঁচার আশা ত্যাগ করো। কুমীরে কামড় দিলে বাঘেও ছাড়িয়ে নিতে পারে না, বুঝলে?
বাঃ, নিজের প্রতি কি অসীম শ্রদ্ধা! সত্যবান বলে।
শম্পা গম্ভীরভাবে বলে, নিশ্চয়। শ্রদ্ধা আছে বলেই সত্যভাষণ করছি। যাক–এখন নাও এটা এগিয়ে দেয় যন্ত্রটা সত্যবানের দিকে।
সত্যবান আর প্রতিবাদ করতে ভরসা পায় না। হাত বাড়িয়ে থার্মোমিটারটা নিয়ে দেখে ফেরত দেয়।
শম্পা সেটাকে আলোর মুখে ধরে, জ্বরের পারার অবস্থান লক্ষ্য করে হৃষ্টচিত্তে বলে, যাক বাবা, এযাত্রা তবু আমার মুখটা রাখলে-
মুখ রাখলাম! সত্যবানের বোধ হয় কথাটা বুঝতে দেরি হয়, সত্যবান তাই কপাল কুঁচকোয়, মুখ রাখা মানে?
না, এই লোকটাকে বোধ হয় ইহজীবনেও মানুষ করে উঠতে পারা যাবে না! বলি ওই জ্বরের দাপটে টেসে গেলে, মুখটা থাকতো আমার? সেইটুকুর জন্যেই ধন্যবাদ জানাতে হচ্ছে তোমাকে।
বাঃ! তোমার মুখ থাকার জন্যেই শুধু আমার বেঁচে ওঠার সার্থকতা?
তবে না তো কি? এরপর যতবার ইচ্ছে মরো, কোনো আপত্তি নেই। শুধু এই যাত্রাটা যে কাটিয়ে দিলে তাতেই মাথাটা কিনলে।
এর পর যতবার ইচ্ছে মরতে পারি?
অনায়াসে।
উঃ,কী সাংঘাতিক মেয়ে। এখন ভাবছি তোমার সঙ্গে সটকে পড়ে খুব ভুল করেছি।
সেকথা আর বলতে-, শম্পা খুব সহানুভূতির গলায় বলে, একশবার। তোমার জন্যে দুঃখু হয় আমার।
ও, দয়ার অবতার একেবারে। কিন্তু সত্যি বলে দিচ্ছি, আর এভাবে পিসির ঘাড়ে পড়ে থাকা সম্ভব হচ্ছে না! এ কী, আমি একটা বুড়ো মদ্দ, একটু জ্বরের ছুতো করে কাজকর্ম ছেড়ে একজন অপরিচিতা মহিলার ঘাড়ের ওপর পড়ে আছি! ভাবলেই রাগ আসছে।
রাগ আসা ভালো। আমার দিদিমা বলে, রাগই পুরুষের লক্ষণ। তবু জানবো একটা পুরুষের গলা ধরেই ঝুলেছি। কিন্তু বিয়েটা কবে হবে?
বিয়ে!
হা, বিয়ে। যাকে শুদ্ধ বাংলায় বলে “বিবাহ”। যদিও আমার সেটা প্রহসন বলেই মনে হয়, তবু ওই প্রহসনটা না হলেও তো স্বস্তি নেই।
সত্যবান ওর মুখের দিকে একটু তাকিয়ে বলে, এখনো ভাববার সময় আছে শম্পা, ঝোঁকের মাথায় একটা কাজ করে বসে শেষে পস্তাবে।
সত্যবান সভ্য-ভব্য কথার ধার ধারে না, সত্যবান ওইভাবেই বলে, ছেড়ে দাও বাবা, আমিও বাঁচি, তুমিও বাঁচো।
শম্পা থার্মোমিটারকে দোলাতে দোলাতে বলে, তুমি বাঁচতে পারো, আমার কথা তুলছ কেন?
তুলছি তোমার দুর্গতির কথা ভেবে। কী যে আছে তোমার কপালে!
যা আছে তো ঠিকই হয়ে গেছে। স্রেফ একটি জাম্বুবান। তাও আমার এমনি কপাল, তাকেও হারাই হারাই করে মরতে হচ্ছে!
সত্যবান একটু কড়া গলায় বলে, সেই মরাটা মরতেই তো বারণ করা হচ্ছে।
পরামর্শের জন্যে ধন্যবাদ।
সত্যবান হতাশ গলায় বলে, কিছুতেই যদি তোমার সুমতি না করাতে পারি তো উপায় নেই। দুর্গতি তোমার কপালে নাচছে। আপাততঃ প্রথম দুর্গতি তো হচ্ছে অনশন। খেতে-টেতে পাবে না, সে-কথা প্রথমেই বলে রেখেছি, মনে আছে?
আছে।
তবে আর কী করা যাবে? দাও কোথায় কি খাবারটাবার আছে, দারুণ খিদে পেয়ে গেছে।
শম্পা সঙ্গে সঙ্গে পাক খেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে সিঁড়িতে উঠতে উঠতে চেঁচায়, পিসি, জ্বর বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কুম্ভকর্ণটা খাই-খাই শুরু করেছে।
পারুল একটা চিঠি লিখছিল, মুড়ে রেখে অন্যমনা গলায় বলে, কে কী শুরু করেছে?
ওই যে ওই হতভাগা–ইয়ে কাকে চিঠি লিখছো গো?
পারুল অন্যমনস্কতার রাজ্য থেকে নেমে এসে হালকা গলায় বলে, যাকেই লিখি না, তোকে বলতে যাবো কেন?
আহা তুমি তো আর ইয়ে, শম্পা একটু থেমেই ফট্ করে বলে বসে, তেমন কাউকে তো লিখছো না
তাই যে লিখছি না, কে বললো তোকে?
আহা!
শম্পা হেসে ফেলে, তা বলা যায় না বাবা, তুমি তো আবার কবিমানুষ, তা ছাড়া বয়েস হলেও বুড়ো-ফুড়ো হয়ে যাওনি
তবে? পারুল হেসে বলে, তা তুই যে দুমদাম করে উঠে এলি, সে কি এই কথাটা বলবার জন্যে?
