অনামিকা দেবী বোধ হয় বলেছিলেন, আপনারা সর্বদা এত চেষ্টা করছেন, সামান্য একটা প্রবন্ধের দ্বারা কি তার থেকে বেশী হবে?
মহিলা আবেগ-কশিত গলায় খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, হলে আপনার কথাতেই হবে। আপনাকে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা যে কী ভালবাসে
অনামিকা কি তখন মনে মনে একটু হেসেছিলেন? ভেবেছিলেন কি জ্ঞানচৈতন্য দেবার চেষ্টা করি না বলেই হয়তো একটু ভালোবাসে। সে চেষ্টা শুরু করলে
কিন্তু সে হাসিটা তো প্রকাশ করা যায় না।
সাহিত্যিকের দায়িত্ব নাকি ভয়ানক গভীর; সমাজের ওঠা-পড়ার অদৃশ্য সূত্রটি নাকি তাদেরই হাতে। তবে শুধু তো নিভাননী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকাই নয়, এ ধ্বনি তা সর্ব সোচ্চার। অথচ–অতো কথায় পরও অনামিকা দেবী কিনা সেই গুরুদায়িত্বের কণিকাটুকু পালনের কথাও শ্রেফ ভুলে বসে আছেন?
দেখলেন ওঁদের চল্লিশপুর্তির উৎসবের আর মাত্র ষোল দিন বাকি, আজই অতএব দিতে পারলে ভালো হয়। ছাপবার সময়টুকু পাওয়া চাই ওদের।
বাকি সবগুলোই হয়তো আজকালই চেয়ে বসবে। কী করে যে ভুলে বসে আছেন অনামিকা দেবী!
দেওয়া উচিত।
উপন্যাসের প্লটটা সরিয়ে রাখতেই হলো। হয়তো আরো অনেক দিনই রাখতে হবে। এগুলো শেষ হতে হতে আরো কিছু কিছু এসে জমবে তো।
অথচ অহরহ একটা অভিযোগ উঠছে আজকের দিনের কবি-সাহিত্যিকদের বিরুদ্ধে, কেউ নাকি আর মননশীল লেখা লিখছেন না। সবই নাকি দায়সারা, এবং টাকার জন্যে। আগেকার লেখকরা লিখতেন প্রাণ দিয়ে মন দিয়ে, সমগ্র চেতনা দিয়ে, আর এযুগের লেখকরা লেখেন শুধু আঙুলের ডগা দিয়ে!..হা, ওই ধরনেরই একটা কথা সেদিন কোন্ একটা কলেজের সাহিত্য আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে বসে বসে শুনতে হয়েছিল অনামিকা দেবীকে, ছাত্রসভায় সদস্যদের আবেগ-উত্তপ্ত অভিযোগ ভাষণ।
দোষ স্বীকার করতেই হয়েছিল নতমস্তকে, নইলে কি বলতে বসবেন, আর কোন যুগে এযুগের মতো সাহিত্যকে সবাই ভাঙিয়ে খাচ্ছে? সমাজের আপাদমস্তক তাকিয়ে দেখো, সাহিত্যিকই আজ সকলের হাতিয়ার। আর তাদের হাতে রাখতে কত রকমের জালবিস্তার। টাকার টোপ, সম্মানের টোপ, পুরস্কারের টোপ, ক্ষমতার টোপ ছড়িয়ে রাখা আছে সমাজ সরোবারের ঘাটে ঘাটে। তা ছাড়া এই অনুরোধের বন্যা!
তবে কোন নিরালা নিশ্চিন্ততায় বসে রচিত হবে মননশীল সাহিত্য? ভরসা শুধু নতুনদের।
যাদের ভাঙিয়ে খাবার জন্যে এখনো সহস্র হাত প্রসারিত হয়নি। কিন্তু সে আর ক’দিন? যেই একবার সুযোগ-সন্ধানীদের চোখে পড়ে যাবে, ওর কলম বলি, ওঁর মধ্যে সম্ভাবনা–তবুনি তো হয়ে যাবে তার সম্ভাবনার পরিসমাপ্তি। তার সেই বলিষ্ঠ কলমকে কোন্ কোন কাজে লাগানো যায়, সেটাই হবে চিন্তণীয় বস্তু।
যদি আজ-কাল, পরশু-তরশু, তার পরদিন শুধু লেখাটা লিখতে পেতাম! জীবনের সব মূল্য হারিয়েও বেঁচে থাকার চেষ্টাটা যার অব্যাহতি, সেই ব্যাধিগ্রস্ত ঐেঢ় শিবের খাদ্যগীরের কাহিনীটা!
একটা নিঃশ্বাস ফেলে নিভাননী বালিকা বিদ্যালয়ের বালিকাঁদের জ্ঞানদানের খসড়াটা তৈরী করতে করতে কয়েকটা নাম লিখে রাখলেন একটুকরো কাগজে। শুনতে মিষ্টি অথচ অসাধারণ, কেউ কোনোদিন মেয়েদের তেমন নাম রাখেনি এমন দুরূহ, মহাভারতের অপ্রচলিত অধ্যায় থেকে, অজানা কোনো নায়িকার এমনি গোটাকয়েক।
কোনোটাই হয়তো রাখবে না, নিজেরাই নিজেদের পছন্দে রাখবে, তবু অনামিকার–কর্তব্যটা তো পালন করা হলো।
কিন্তু কলম নামিয়ে রেখে ভাবতে বসলেন কেন অনামিকা?
কার কথা? সেই মেয়েটার কথা কি?
যার কথা বাড়িতে আর কেউ উচ্চারণ করছে না। না, সেই বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া মেয়েটার নাম বাড়িতে আর উচ্চারিত হয় না। তাকে খুঁজে পাবার জন্যে তলায় তলায় যে আপ্রাণ চেষ্টা চলছিল সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে।
সংসারে যেন একটা কৃষ্ণ যবনিকা পড়ে গেছে সেই নামটার ওপর। সেই প্রাণচঞ্চল বেপরোয়া দুঃসাহসী মেয়েটার মৃত্যু ঘটে গেছে।
অথচ-খুব গভীরে একটা নিঃশ্বাস পড়লো অনামিকার, অথচ ওকে যদি অন্তত ওর মাও বুঝতে পারতো! পারেনি। ছোট্ট থেকে ও যে অভিভাবকদের ইচ্ছের ছাঁচে ঢালাই না হয়ে নিজের গড়নে গড়ে উঠেছে, এই অপরাধেই তিরস্কৃত হয়েছে। ওর কাছে সত্যের যে একটা মূর্তি আছে, সেই মূর্তিটার দিকে কেউ তাকিয়ে দেখেনি, সেটাকে উচ্ছৃঙ্খলতা বলে গণ্য করেছে।
অথচ অনামিকা? বাড়িতে আরো কতো ছেলেমেয়ে, তবু বরাবর তার নারীচিত্তের সহজাত বাৎসল্যের ব্যাকুলতাটুকু ওই উদ্ধত অবিনয়ী বেপরোয়া মেয়েটাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে।
২০. পিসির ঘাড়ে আর কতোদিন
তোমার পিসির ঘাড়ে আর কতোদিন থাকা হবে?
বললো সত্যবান দাস নামের ছেলেটা, শম্পা যাকে একটু বদলে নিয়ে বলে জান্ধুবান
সেই শব্দটাই ব্যবহার করলো শম্পা, থার্মোমিটারটা ঝাড়তে ঝাড়তে অকাতর কণ্ঠে বললো, তা হাতের কাছে যখন তোমার কোনো মাসি পিসির ঘাড় পাচ্ছি না, তখন উপায় কি?
আমার মাসি-পিসি? তারা ঘাড় পাতবে? সত্যবান হেসে ওঠে, ওই ভদ্রমহিলার মতো এমন বোকাসোকা মহিলা দুনিয়ায় আর আছে নাকি?
আছে, আরোও একটি আছে শম্পা বলে গম্ভীরভাবে, আপাতত একটা জাম্বুবানকে ঘাড়ে করে যার জীবন মহানিশা হয়ে উঠেছে
সত্যি শম্পা
আচ্ছা আচ্ছা, ভদ্রতা সৌজন্য আক্ষেপ ইত্যাদি ইত্যাদি পরে হবে, এখন টেম্পারেচারটা দেখে নেওয়া হোক একবার!
